ads

রূপক নাটক হিসেবে ‘রক্তকরবী’ নাটকের সার্থকতা আলোচনা করুন

রূপক নাটক হিসেবে ‘রক্তকরবী’ নাটকের সার্থকতা আলোচনা করুন।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বাংলা নাট্যসাহিত্যে রূপক-সাংকেতিক ধারার এক অনন্য রূপকার। তাঁর নাটকগুলোর মধ্যে ‘রক্তকরবী’ (১৯২৬) কেবল তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিই নয়, এটি বিশ্বসাহিত্যের দরবারেও এক অনন্য সংযোজন। রক্তকরবী একটি সার্থক রূপক ও সাংকেতিক নাটক, যেখানে আপাতদৃষ্টিতে একটি স্বর্ণখনির গল্প বলা হলেও এর আড়ালে লুকিয়ে আছে মানব সভ্যতার এক গভীর সংকট ও মুক্তির অমল আখ্যান। সহজ-সরল, প্রাঞ্জল ও প্রমিত চলিত বাংলা ভাষায় রূপক নাটক হিসেবে এই নাটকের সার্থকতা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

রূপক নাটকের ধারণা ও রক্তকরবী

রূপক নাটক (Allegorical Play) বলতে আমরা এমন এক ধরনের নাট্য আঙ্গিককে বুঝি, যার বাইরে একটি দৃশ্যমান সহজ সরল কাহিনি থাকে এবং তার সমান্তরালে ভেতরের স্তরে অন্য একটি গভীর ভাবার্থ বা দার্শনিক সত্য প্রকাশিত হয়। রূপক নাটকে পাত্র-পাত্রী বা চরিত্রগুলো অনেক সময় কোনো না কোনো বিশেষ ভাব, আদর্শ বা তত্ত্বের প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নাট্যকার যখন সার্থকভাবে এই বাইরের রূপ ও ভেতরের ভাবসত্যের মধ্যে একটি নিবিড় যোগসূত্র স্থাপন করতে পারেন, তখনই রূপক নাটক সার্থকতা লাভ করে। ‘রক্তকরবী’ নাটকের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ এই শিল্পকৌশলটি অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন। নাটকের যক্ষপুরী, রাজা, নন্দিনী, রঞ্জন, বিশু পাগল— প্রতিটি চরিত্র এবং অনুষঙ্গ এক একটি গভীরতর সত্যের দিকে নির্দেশ করে।

যক্ষপুরী: পুঁজিবাদী ও যান্ত্রিক সভ্যতার রূপক

নাটকের পটভূমি হলো যক্ষপুরী। যক্ষপুরী আসলে আধুনিক যন্ত্রসভ্যতা এবং ধনতান্ত্রিক শোষণের এক নির্মম প্রতীকী রূপ। এই পুরীর অধিবাসীরা মাটির বুক চিরে সোনা আহরণ করার কাজে দিনরাত নিয়োজিত। সোনা এখানে কেবল ধাতু নয়, তা মানুষের অন্ধ লোভ এবং জড়বস্তুর প্রতি আসক্তির প্রতীক। যন্ত্রের কবলে পড়ে মানুষ এখানে তার মানুষের পরিচয় হারিয়ে কেবল খোদাইকরে পরিণত হয়েছে। তাদের কোনো নাম নেই, তারা কেবল কিছু সংখ্যা বা নম্বর (যেমন ৬১-হ্ন, ৪৭-প ইত্যাদি)। যক্ষপুরী সম্পর্কে নাটকের শুরুতেই অধ্যাপক নন্দিনীকে উদ্দেশ্য করে যক্ষপুরীর স্বরূপ উন্মোচন করতে গিয়ে বলেছেন:

"এই যক্ষপুরে আমাদের যা-কিছু ধন সব ঐ ধুলোর নাড়ির ধন— সোনা।" (রক্তকরবী)

এই ধুলোর নাড়ির ধন অর্থাৎ সোনার মোহ মানুষকে তার অন্তরের ঐশ্বর্য থেকে বঞ্চিত করে এক যান্ত্রিক দাসত্বে বন্দি করেছে। রবীন্দ্রনাথ এই দৃশ্যপটের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছেন কীভাবে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা মানুষের প্রাণকে শুষে নিয়ে তাকে জড় বস্তুতে পরিণত করে। এই সর্বগ্রাসী লোভের করাল গ্রাস সম্পর্কে নন্দিনী অত্যন্ত তীব্র ভাষায় রাজার উদ্দেশ্যে বলেছে:

"পৃথিবী আপনার প্রাণের জিনিস আপনি খুশি হয়ে দেয়। কিন্তু যখন তার বুক চিরে মরা হাড়গুলোকে ঐশ্বর্য ব’লে ছিনিয়ে নিয়ে আস তখন অন্ধকার থেকে একটা কানা রাক্ষসের অভিসম্পাত নিয়ে আস। দেখছ না, এখানে সবাই কেমন রেগে আছে, কিম্বা সন্দেহ করছে, কিম্বা ভয় পাচ্ছে?" (রক্তকরবী)

এখানে মাটির তলাকার সোনাকে ‘মরা হাড়’ এবং ধনলিপ্সাকে ‘কানা রাক্ষসের অভিশাপ’ বলা হয়েছে। এটি যান্ত্রিক সভ্যতার পরিবেশ ধ্বংসকারী ও মানবতাবিরোধী লোভের এক অসামান্য রূপক প্রকাশ।

রাজা মকররাজ: ক্ষমতার দম্ভ ও বন্দিত্বের রূপক

যক্ষপুরীর নেপথ্যের চালিকাশক্তি হলেন রাজা মকররাজ। তিনি মানুষের সঙ্গে সরাসরি দেখা দেন না; একটি জটিল লোহার জালের জানালার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখেন। এই লৌহজাল আসলে রাজার নিজের তৈরি ক্ষমতার অহংকার, জড়বিজ্ঞান ও বিপুল সঞ্চয়ের এক জটিল দুর্গ। তিনি ক্ষমতার চূড়ায় বসেও অত্যন্ত একা, ক্লান্ত এবং অতৃপ্ত। জালের আড়াল থেকে তিনি বিশ্বজগৎকে জয় করতে চান, কিন্তু জীবনের সহজ আনন্দ থেকে তিনি নিজে বঞ্চিত। বিপুল জড়শক্তির অধিকারী হয়েও তিনি নন্দিনীর ভেতরের সহজ সৌন্দর্য ও প্রাণময়তাকে স্পর্শ করতে পারেন না। নন্দিনীর সঙ্গে কথোপকথনে রাজার এই দীর্ঘশ্বাস ও অক্ষমতা অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রকাশ পেয়েছে:

"নিজেকে গুপ্ত রেখে বিশ্বের বড়ো বড়ো মালখানার মোটা মোটা জিনিস চুরি করতে বসেছি। কিন্তু যে দান বিধাতার হাতের মুঠির মধ্যে ঢাকা, সেখানে তোমার চাঁপার কলির মতো আঙুলটি যতটুকু পৌঁছয়, আমার সমস্ত দেহের জোর তার কাছ দিয়ে যায় না।" (রক্তকরবী)

এখানে প্রকাশ পায় যে, পাশবিক বল বা বৈষয়িক ক্ষমতা দিয়ে জীবনের অতীন্দ্রিয় সত্য বা সৌন্দর্যকে জয় করা যায় না। রাজা নিজেই তাঁর ক্ষমতার খাঁচায় বন্দি এক করুণ চরিত্র।

নন্দিনী: অমল সৌন্দর্য ও সহজ প্রাণের রূপক

‘রক্তকরবী’ নাটকের কেন্দ্রবিন্দু হলো নন্দিনী। সে কোনো তত্ত্বের শুষ্ক প্রতিমূর্তি নয়, বরং সে রক্তমাংসের এক অপূর্ব নারী যে যক্ষপুরীর জড়তার বিরুদ্ধে এক জীবন্ত বিদ্রোহ। নন্দিনী হলো প্রকৃতির সহজ রূপ, সৌন্দর্য, প্রেম ও মুক্ত প্রাণের প্রতীক। যক্ষপুরীর শুষ্ক ও কঙ্কালসার পরিবেশে সে যেন এক পশলা বৃষ্টি বা বসন্তের হাওয়া। তার অঙ্গে শোভা পায় লাল করবী ফুলের মঞ্জরি, যা তার ভেতরের তীব্র প্রাণশক্তি ও প্রেমের পরিচায়ক। নন্দিনীর চোখে ও চুলে রাজা দেখতে পান জীবনের লীলা এবং মৃত্যুর অমোঘ আহ্বান। নন্দিনীর এই দ্বিমাত্রিক রূপকের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাজা বলেছেন:

"সামনে তোমার মুখে চোখে প্রাণের লীলা, আর পিছনে তোমার কালো চুলের ধারা মৃত্যুর নিস্তব্ধ ঝরনা।" (রক্তকরবী)

এখানে নন্দিনীর সৌন্দর্য কেবল চোখের আরাম নয়, তা মানুষের আত্মাকে জাগিয়ে তোলার এক পরম শক্তি। সে যেমন একদিকে মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়, অন্যদিকে শৃঙ্খল ভাঙার জন্য আত্মবিসর্জনের প্রেরণা যোগায়। নন্দিনী যক্ষপুরীর প্রতিটি মানুষের অন্তরে এক অবদমিত মুক্তির বাসনা জাগিয়ে তোলে। এমনকি সামান্য কিশোরও তার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে ফুল তুলে আনতে চায়:

"সমস্তদিন তো কেবল সোনার তাল খুঁড়ে আনি, তার মধ্যে একটু সময় চুরি করে তোর জন্যে ফুল খুঁজে আনতে পারলে বেঁচে যাই।" (রক্তকরবী)

রঞ্জন: অপরাজেয় যৌবন ও বিদ্রোহের প্রতীক

নাটকে রঞ্জন চরিত্রটি অনুপস্থিত থেকেও সমগ্র নাট্যকাহিনিতে এক অমোঘ শক্তি হিসেবে কাজ করে। রঞ্জন হলো যৌবনের উদ্যম, গতি এবং অপরাজেয় শক্তির প্রতীক। যক্ষপুরীর নিয়ম ও শৃঙ্খলাকে সে থোড়াই কেয়ার করে। সে সর্দারদের রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না, বরং যক্ষপুরীর খনিতে গান গেয়ে বেড়ায় এবং শ্রমিকদের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালায়। রঞ্জন আসলে নন্দিনীর প্রেমের সার্থক রূপ এবং যক্ষপুরীর নিগড় ভাঙার মূল কারিগর। রঞ্জন এবং নন্দিনী যখন একীভূত হয়, তখন যক্ষপুরীর শোষণের প্রাচীর ভেঙে পড়তে বাধ্য হয়। নাটকের শেষে রঞ্জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তাঁর যৌবনের জয়যাত্রা সূচিত হয়, যা যক্ষপুরীর জড়তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়।

বিশু পাগল, সর্দার ও গোঁসাই: শোষিত ও শোষকের রূপক

নাটকের অন্যান্য পার্শ্বচরিত্রগুলোও অত্যন্ত সূক্ষ্ম রূপক ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ। বিশু পাগল হলো লাঞ্ছিত অথচ সৃজনশীল মানবাত্মার প্রতীক। সে গান গায়, সত্য কথা বলে এবং শৃঙ্খলিত থেকেও অন্তরে মুক্তির আনন্দ উপভোগ করে। যক্ষপুরীর নির্মম চাবুকের দাগ তার পিঠে পড়লেও সে তার মনুষ্যত্ব হারায় না। সে শোষকদের ভেতরের পশুত্বকে চিনতে পেরেছে এবং নন্দিনীকে বলেছে:

"ভিতরে মস্ত একটা পশু রয়েছে-যে— মানুষের অপমানে ওদের মাথা হেঁট হয় না, ভিতরকার জানোয়ারটার লেজ ফুলতে থাকে, দুলতে থাকে।" (রক্তকরবী)

অন্যদিকে সর্দার চরিত্রগুলো হলো পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের শোষণকারী ও দমনকারী প্রশাসনিক যন্ত্রের প্রতীক। তারা হৃদয়হীন, যান্ত্রিক এবং নিষ্ঠুর। আর গোঁসাই হলেন ধর্মব্যবসায়ী শোষক শ্রেণির প্রতীক, যারা ধর্মের আফিম খাইয়ে শ্রমিকদের অবশ করে রাখে যাতে তারা বিদ্রোহ করতে না পারে। গোঁসাইয়ের এই কপটতাকে নন্দিনী অত্যন্ত তীব্র ভাষায় আঘাত করে বলেছে:

"মানুষের প্রাণ ছিঁড়ে নিয়ে তাকে নাম দিয়ে ভোলাবার ব্যবসা তোমার।" (রক্তকরবী)

ধর্ম ও প্রশাসনের এই অশুভ আঁতাত পুঁজিবাদী সমাজকে টিকিয়ে রাখার যে রূপক চিত্র তুলে ধরে, তা বর্তমান সময়েও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

রক্তকরবী ফুল: রক্তরাগ ও বিপ্লবের প্রতীক

নাটকে রক্তকরবী ফুল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকেত ও রূপক। লাল করবী ফুল একদিকে যেমন নন্দিনীর হৃদয়ের গভীর ভালোবাসার প্রতীক, অন্যদিকে তা রক্তপাতের মধ্য দিয়ে বিপ্লব ও নতুন সৃষ্টির বার্তা বহন করে। যক্ষপুরীর ধূসর প্রেক্ষাপটে লাল করবী ফুলগুলো যেন মানুষের অন্তরের চাপা পড়া আগুনের ফুলকি। নাটকের শেষে রঞ্জনের বুকের রক্ত, নন্দিনীর আত্মত্যাগ এবং লাল করবীর গুচ্ছ এক হয়ে যক্ষপুরীর বুকে অম্লান দীপ্তিতে জ্বলে ওঠে, যা মুক্তির রক্তিম সূর্যোদয়ের ইঙ্গিত দেয়।

রূপকের সার্থকতা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটকটি শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাদী লোভের ওপর মানুষের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক মুক্তির এক মহাকাব্যিক বিজয়গাথা। নাটকের শেষ দৃশ্যে আমরা দেখি, রাজা নিজেই নিজের ক্ষমতার লৌহজাল ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসেন এবং নন্দিনীর হাত ধরে নিজেরই তৈরি শোষণের দুর্গ ধ্বংস করতে অগ্রসর হন। রঞ্জন ও নন্দিনীর আত্মত্যাগের ভেতর দিয়ে যক্ষপুরীর জীর্ণ দেয়ালগুলো ভেঙে পড়ে।

পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল সমাজ ও রাজনীতির স্থূল সমালোচনা করতে এই নাটক লেখেননি; বরং মানবাত্মার চিরন্তন মুক্তি, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় মিলন এবং লোভের হাত থেকে ভালোবাসার জয়কে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। চরিত্রের নিখুঁত বিন্যাস, রূপক চিহ্নের সার্থক প্রয়োগ এবং কাব্যের সুষমামণ্ডিত সংলাপের কারণে ‘রক্তকরবী’ বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ রূপক নাটক হিসেবে অত্যন্ত সফল ও সার্থক।

S M A Hanif
BA (Hon's), MA
Bengali Language and Literature
রক্তকরবী বই

No comments

"আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখে জানান। আপনার যেকোনো পরামর্শ সাদরে গৃহীত।"

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.