মুক্তধারা কি কেবল রাজনৈতিক নাটক, নাকি মানবমুক্তির নাটক?
মুক্তধারা কি কেবল রাজনৈতিক নাটক, নাকি মানবমুক্তির নাটক?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১) বাংলা সাহিত্যের এক অপরাজেয় ও সর্বব্যাপী প্রতিভা। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস ও সংগীতের পাশাপাশি বাংলা নাট্যসাহিত্যে তাঁর অবদান এক কালজয়ী অধ্যায় রচনা করেছে। বিশেষত রূপক ও সাংকেতিক নাটক রচনায় তিনি যে শিল্পকুশলতা এবং দার্শনিক গভীরতা প্রদর্শন করেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে অত্যন্ত বিরল। তাঁর এমনই এক অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো ‘মুক্তধারা’ (১৯২২) নাটকটি। বাহ্যিক বিচারে এই নাটকটিতে উত্তরকূট ও শিবতরাই নামক দুটি প্রতিবেশী রাজ্যের রাজনৈতিক সংঘাত, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও অর্থনৈতিক শোষণের রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তবে নিবিড় সাহিত্যিক ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, রাজনীতি কেবল এই নাটকের বহিরাবরণ বা খোলস মাত্র। এর অন্তরে যে মূল সুরটি স্পন্দিত হয়েছে, তা হলো যন্ত্রশক্তির কৃত্রিম বন্ধন থেকে মানবাত্মার মুক্তি এবং প্রকৃতির সাথে মানুষের চিরন্তন নিবিড় আত্মিক ঐক্যের প্রতিষ্ঠা। সুতরাং, ‘মুক্তধারা’ কেবল কোনো সমকালীন বা ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সংঘাতের খতিয়ান নয়, এটি প্রকৃতপক্ষে মানবমুক্তির এক শাশ্বত আধ্যাত্মিক উপাখ্যান।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণ
‘মুক্তধারা’ নাটকের কাহিনির বুনন গড়ে উঠেছে উত্তরকূটের আগ্রাসী রাজশক্তি এবং তাদের অধীনস্থ পার্বত্য অঞ্চল শিবতরাইয়ের প্রজাদের মধ্যকার সংঘাতকে কেন্দ্র করে। উত্তরকূটের শাসক রণজিৎ শিবতরাইয়ের জনগণকে পদানত রাখতে চান। এই রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য তিনি বিভিন্ন সময় নানামুখী শোষণ ও কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। শিবতরাইয়ের উৎপাদিত পশম যাতে বাইরের মুক্ত বাজারে বিক্রি হতে না পারে, সেজন্য তিনি পিতামহদের আমল থেকে চলে আসা দুর্গম পাহাড়ি পথ ‘নন্দিসংকট’ বন্ধ করে রেখেছিলেন। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শিবতরাইয়ের মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে রাখা, যাতে তারা চিরকাল উত্তরকূটের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে।
রাজনীতির মূল কথা হলো ক্ষমতা ও আধিপত্য। উত্তরকূটের রাজশক্তি কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত বিস্তার করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা শিবতরাইয়ের মানুষের খাদ্য, বস্ত্র ও জীবনের অন্যতম প্রধান উৎস জলের ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। আর এই আগ্রাসী শোষণের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে প্রধান প্রকৌশলী যন্ত্ররাজ বিভূতির তৈরি দানবীয় লোহার বাঁধ। এই বাঁধের মাধ্যমে শিবতরাইয়ের মানুষের জীবনধারা তথা মুক্তধারা ঝরনার জলপ্রবাহকে আটকে দেওয়া হয়েছে। এই রাজনৈতিক কূটকৌশল সম্পর্কে উত্তরকূটের যুবরাজ অভিজিৎ যখন তাঁর অসন্তোষ প্রকাশ করেন, তখন রাজপ্রহরী উদ্ধব বলেন যে রাজা রণজিতের তো শিবতরাইয়ের প্রতি দয়া আছে। এর জবাবে অভিজিৎ রাজশক্তির ভণ্ডামি ফাঁস করে দিয়ে যে ঐতিহাসিক উক্তি করেন, তা রাজনৈতিক শোষণের স্বরূপটি চমৎকারভাবে তুলে ধরে:
"ডান হাতের কার্পণ্য দিয়ে পথ বন্ধ করে বাঁ হাতের বদান্যতায় বাঁচানো যায় না।" (উৎস: মুক্তধারা)
এই অসাধারণ উক্তিটি রাজনৈতিক শোষণের চিরন্তন চরিত্রকে প্রকাশ করে। কোনো সাম্রাজ্যবাদী বা অত্যাচারী শাসক যখন একদিকে একটি শোষিত অঞ্চলের মানুষের স্বাধীন জীবিকা ও আত্মনির্ভরতার সমস্ত স্বাভাবিক পথ বা সিংহদুয়ার রুদ্ধ করে দেয়, আর অন্যদিকে কৃত্রিম করুণা বা ত্রাণ বিলি করার ভান করে নিজেকে মহান প্রমাণ করতে চায়, তখন তা এক নিষ্ঠুর প্রহসনে পরিণত হয়। মানুষের জীবনের আসল দাবি দয়া বা ভিক্ষা নয়; তার দাবি হলো স্বাভাবিক স্বাধীনতা ও অধিকার [২৬]। রাজনৈতিক আধিপত্যকামী শক্তি যখন মানুষের অন্ন-জলের পথ বন্ধ করে তাকে বশ করতে চায়, তখন সেই ভণ্ডামির বিরুদ্ধে প্রথম জোরালো প্রতিবাদটি আসে যুবরাজ অভিজিতের কাছ থেকে। জীবনের স্বাভাবিক বিকাশ যেখানে দয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, সেখানে মানুষের মর্যাদাবোধ লাঞ্ছিত হয়। অভিজিৎ এই লাঞ্ছনার অবসান চেয়েছেন।
যন্ত্রশক্তির অন্ধ অহংকার ও কৃত্রিমতার দম্ভ
‘মুক্তধারা’ নাটকে যন্ত্র ও রাজনীতির এক অপবিত্র আঁতাত আমরা দেখতে পাই। উত্তরকূটের যন্ত্ররাজ বিভূতি পঁচিশ বছর ধরে হাজার হাজার শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে এক বিশাল অভ্রভেদী লোহার বাঁধ নির্মাণ করেছে। এই বাঁধটি ভৈরব মন্দিরের ত্রিশূলের চেয়েও উঁচুতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, যা কেবল শিবতরাইয়ের মানুষের জল আটকে দেওয়ার জন্য নয়, বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহকে নিজের যান্ত্রিক বুদ্ধির দম্ভে অবরুদ্ধ করার এক প্রতীক। বিভূতি বিশ্বাস করে যে মানুষের যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তাই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শেষ সত্য এবং প্রকৃতির শাশ্বত বিধানকেও যন্ত্রের শৃঙ্খলে বন্দি করা সম্ভব। যান্ত্রিক সভ্যতার এই অন্ধ অহংকার প্রকাশ পায় বিভূতির কণ্ঠে, যখন সে যুবরাজের দূতের সাথে কথা বলছিল:
"দেবতা তাদের কেবল জলই দিয়েছেন, আমাকে দিয়েছেন জলকে বাঁদবার শক্তি।" (উৎস: মুক্তধারা)
এই উক্তিটি যান্ত্রিক যুগের মানুষের চরম ঔদ্ধত্য ও অন্ধ অহংকারের প্রতীক। বিভূতি এখানে বোঝাতে চায় যে, ঈশ্বর বা প্রকৃতি মানুষকে যা দিয়েছেন তা কাঁচা উপাদান মাত্র, কিন্তু মানুষের তৈরি যান্ত্রিক প্রযুক্তি সেই প্রাকৃতিক দানকেও বন্দি ও নিজের ইচ্ছামতো পরিচালিত করতে পারে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যখন মানুষের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কল্যাণমুখী না হয়ে কেবল আধিপত্য ও শোষণের বাহন হয়, তখন তা এক চরম দানবীয় রূপ ধারণ করে। নাটকে এই লোহার বাঁধকে ‘অসুরের মাথা’ বা ‘তৃষ্ণারাক্ষসী’ বলা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে নির্মিত হয়েছে। যন্ত্ররাজ বিভূতি মানুষের কান্না বা প্রকৃতির অভিশাপকে তুচ্ছ করে নিজের কৃত কীর্তির মহিমায় অন্ধ। কিন্তু এই কৃত্রিম অহংকারের শেষ রক্ষা হতে পারে না, কারণ প্রাণের দাবি যন্ত্রের লোহার খাঁচার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
রাজনৈতিক প্রতিবাদের অহিংস রূপ ও ধনঞ্জয় বৈরাগী
রবীন্দ্রনাথ এই নাটকে কেবল শোষণের রূপ দেখাননি, দেখিয়েছেন কীভাবে সেই শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয়। শিবতরাইয়ের প্রজাদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নাটকে এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ধারা উন্মোচিত হয়েছে। শিবতরাইয়ের চারণ কবি ও সাধক ধনঞ্জয় বৈরাগী এই প্রতিবাদের প্রধান পথপ্রদর্শক। তিনি প্রজাদের কোনো হিংসাত্মক বিপ্লবের কথা বলেন না, বরং শেখান কীভাবে অন্তরের ভয়কে দূর করে শাসকের চোখের দিকে তাকিয়ে অবিচারের প্রতিবাদ করতে হয়। ধনঞ্জয়ের রাজনীতি কোনো সংকীর্ণ ক্ষমতার লড়াই নয়; তা হলো মানুষের আত্মিক শক্তির জাগরণ। রাজা রণজিৎ যখন ধনঞ্জয়কে শিবতরাইয়ের প্রজাদের কর দিতে বারণ করার জন্য অভিযুক্ত করেন এবং তাকে বন্দি করার আদেশ দেন, তখন ধনঞ্জয় বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে গেয়ে ওঠেন:
"তোর শিকল আমায় বিকল করবে না। তোর মারে মরম মরবে না।" (উৎস: মুক্তধারা)
এই অসাধারণ গানটি মানুষের অজেয় ও অবিনশ্বর আত্মিক শক্তির জয়ঘোষণা। শারীরিক বন্ধন বা অত্যাচারের লোহার শিকল দিয়ে মানুষের দেহকে হয়তো কারারুদ্ধ করা যায়, কিন্তু তার ভেতরের স্বাধীন সত্তা ও নৈতিক চেতনাকে কখনো পরাস্ত বা অসাড় করা যায় না। ধনঞ্জয় বৈরাগী শিবতরাইয়ের প্রজাদের বোঝাতে চেয়েছেন যে, যতক্ষণ তাদের মন ভয় থেকে মুক্ত হচ্ছে, ততক্ষণ বাইরের কোনো শক্তি তাদের দাস বানাতে পারবে না। এটি এক চরম সত্য—অত্যাচারীর প্রধান অস্ত্র হলো ভয়ের চাষ করা। যখন শোষিত মানুষ সেই ভয়কে মন থেকে চিরতরে ঝেড়ে ফেলে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, তখন শাসকের সমস্ত চাবুক ও শিকল অর্থহীন হয়ে পড়ে। ধনঞ্জয়ের এই অহিংস রাজনৈতিক আদর্শ বিশ্ব ইতিহাসে মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দেয়।
যুবরাজ অভিজিতের রূপান্তর ও মানবমুক্তির চেতনা
নাটকের মূল চালিকাশক্তি হলেন উত্তরকূটের যুবরাজ অভিজিৎ। অভিজিতের চরিত্রটি বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় কেন এই নাটকটি রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে মানবমুক্তির এক মহান মহাকাব্যে রূপ নিয়েছে। অভিজিৎ রাজপ্রাসাদের সমস্ত আরাম ও ঐশ্বর্যের মধ্যে বড় হলেও নিজেকে উত্তরকূটের শোষক রাজপরিবারের সমগোত্রীয় মনে করতে পারেননি। পরবর্তীতে তাঁর সামনে এক পরম সত্য উন্মোচিত হয়—তিনি রাজপ্রাসাদের সন্তান নন, বরং তাঁকে মুক্তধারা ঝরনার উৎসের কাছে এক কুড়িয়ে পাওয়া শিশু হিসেবে রাজপরিবারে আনা হয়েছিল। এই জন্মরহস্যটি তাঁর মনের সমস্ত সংশয় ও বন্দিত্ব ঘুচিয়ে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন যে প্রকৃতির যে খরস্রোতা জলধারা মুক্তধারা, তাঁর সাথে তাঁর এক অদৃশ্য রক্তের ও আত্মার বন্ধন রয়েছে। রাজা রণজিৎ যখন তাঁর এই ঝরনাপ্রীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন অভিজিৎ গভীর আবেগের সাথে বলেছিলেন:
"এই জলের শব্দে আমি আমার মাতৃভাষা শুনতে পাই।" (উৎস: মুক্তধারা)
এটি প্রকৃতির সাথে মানুষের আত্মিক ও নিবিড় মেলবন্ধনের এক অনুপম প্রকাশ। অভিজিতের কাছে মুক্তধারার কল্লোলধ্বনি কোনো জড় জলের প্রবাহ ছিল না, তা ছিল তাঁর নিজের সত্তার গান, মায়ের স্নেহমাখা কোল ও মাতৃভাষা। মানুষের জন্ম ও অস্তিত্ব যখন প্রকৃতির অবাধ স্বাধীনতার সাথে যুক্ত হয়, তখন সে আর কোনো কৃত্রিম জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতার মধ্যে নিজেকে বন্দি রাখতে পারে না। জীবনমুখী ব্যাখ্যায় এটি আমাদের শেখায় যে, প্রকৃতির স্বাভাবিক দানকে যখন শাসকেরা নিজেদের কৃত্রিম স্বার্থে আটকে দেয়, তখন মানুষের ভেতরের শাশ্বত সত্তা বিদ্রোহ করে ওঠে। অভিজিৎ অনুভব করেন যে মুক্তধারাকে বাঁধার অর্থ হলো তাঁর নিজের আত্মাকে বন্দি করা।
অভিজিতের এই জাগরণ কেবল নিজের ব্যক্তিগত মুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য হলো সমস্ত মানুষের জন্য মুক্তির পথ উন্মুক্ত করা। রাজমন্ত্রীকে নিজের জীবনের লক্ষ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন:
"আমি পৃথিবীতে এসেছি পথ কাটবার জন্যে, এই খবর আমার কাছে এসে পৌঁচেছে।" (উৎস: মুক্তধারা)
এই উক্তিটির মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনের প্রকৃত ব্রত ব্যক্ত হয়েছে। মানুষের জীবন কেবল সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে স্থবির হয়ে থাকার জন্য নয়; তার প্রধান দায়িত্ব হলো জীবনের অগ্রগতির পথে আসা সমস্ত সামাজিক, রাজনৈতিক ও যান্ত্রিক বাধা অপসারণ করা। অভিজিৎ শিবতরাইয়ের মানুষের মুক্তির জন্য নন্দিসংকটের দুর্গম পথ খুলে দিয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে বন্ধ পথ খুলে দেওয়াই জীবনের স্বভাব ধর্ম, আর পথ বন্ধ করে রাখাই হলো আধ্যাত্মিক মৃত্যু।
যান্ত্রিক বন্ধন বনাম আত্মার শৃঙ্খল মোচন
বিভূতির তৈরি লোহার বাঁধ যখন মুক্তধারাকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেয়, তখন অভিজিৎ বুঝতে পারেন যে তাঁর নিজের আত্মাও আজ সিংহাসন ও রাজকীয়তার কারাগারে বন্দি। এই বাঁধ কেবল জলের গতি রোধ করেনি, তা উত্তরকূটের রাজতন্ত্রের শোষণের চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে। নিজের প্রিয় অনুচর সঞ্জয়ের কাছে হৃদয়ের এই বন্দিত্ব ও যন্ত্রনার কথা প্রকাশ করতে গিয়ে অভিজিৎ বলেন:
"আমার অন্তরের কথা আছে ঐ মুক্তধারার মধ্যে। তারই পায়ে ওরা যখন লোহার বেড়ি পরিয়ে দিলে তখন হঠাৎ যেন চমক ভেঙে বুঝতে পারলুম উত্তরকূটের সিংহাসনই আমার জীবনস্রোতের বাঁধ।" (উৎস: মুক্তধারা)
এখানে‘লোহার বাঁধ’ এবং ‘উত্তরকূটের সিংহাসন’ একে অপরের সমার্থক হয়ে উঠেছে। অভিজিৎ উপলব্ধি করেন যে রাজকীয় বৈভব ও কৃত্রিম ক্ষমতার সিংহাসন আসলে মানুষের জীবনকে সংকীর্ণ ভৌগোলিক অহংকারে বন্দি করে ফেলে। মুক্তধারা ঝরনাকে বাঁধার পর অভিজিতের চোখের সামনে শোষণের নগ্ন রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বুঝতে পারেন যে, শোষক রাজশক্তির রাজপুত্র হিসেবে বিলাসের মধ্যে থাকা আসলে নিজের আত্মার ওপর শৃঙ্খল চাপিয়ে দেওয়ার শামিল। তাই এই কৃত্রিম বাঁধ ভাঙার জন্য তাঁকে প্রাসাদ ছেড়ে মুক্ত পথে বেরিয়ে পড়তে হবে।
চূড়ান্ত আত্মত্যাগ ও মুক্তির শাশ্বত পরিণতি
অভিজিৎ কেবল ভাবেননি, তিনি কাজে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বুঝতে পারেন যে যন্ত্ররাজ বিভূতির তৈরি এই অটল লোহার বাঁধকে শুধু মৌখিক আবেদন বা কূটনীতি দিয়ে ভাঙা যাবে না। এই দানবীয় যান্ত্রিক শক্তির মূলে আঘাত করতে হলে নিজের রক্ত ও জীবন বিসর্জন দিতে হবে। বাঁধের উত্তর দিকের এক বিশেষ দুর্বল অংশের ছিদ্রপথের সন্ধান তিনি জানতেন। কিন্তু সেই দুর্বল অংশে আঘাত করার অর্থ হলো বাঁধ ভাঙার সাথে সাথে জলের প্রচণ্ড তোড়ে আঘাতকারীকে ভেসে যেতে হবে। অভিজিৎ নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে প্রকৃতির প্রবাহ ও মানবমুক্তির জন্য হাসিমুখে সেই আত্মত্যাগের পথ বেছে নেন। মোহনগড়ের খুড়া-মহারাজ বিশ্বজিতের কাছে বিদায় নিয়ে তিনি তাঁর অন্তিম প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করেন:
"স্রোতের পথ আমার ধাত্রী, তার বন্ধন মোচন করব।" (উৎস: মুক্তধারা)
এই প্রতিজ্ঞাটি প্রমাণ করে যে অভিজিৎ কেবল রাজপুত্র ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রকৃতির ও সাধারণ মানুষের প্রকৃত মুক্তিদাতা। স্রোতস্বিনী মুক্তধারাই তাঁর পালিকা মাতা বা ধাত্রী, যে তাঁকে লালন করেছে। তাই মায়ের শরীরের ওপর রাজশক্তি যে লোহার বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে, তা ভেঙে ফেলাকে তিনি নিজের পবিত্রতম দায়িত্ব বলে মনে করেন। অবরুদ্ধ প্রকৃতির মুক্তি ও অবরুদ্ধ শিবতরাইয়ের মানুষের জীবনের অধিকার রক্ষা করার জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়ার এই পরম সংকল্পই নাটকটিকে রাজনৈতিকতার স্তর থেকে মানবমুক্তির এক অনন্য আধ্যাত্মিক চূড়ায় উন্নীত করে।
অবশেষে অমাবস্যার রাতে অভিজিৎ সেই গোপন দুর্বল অংশে আঘাত করেন। প্রবল গর্জনে লৌহ-বাঁধ ভেঙে পড়ে এবং যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা মুক্তধারা আবার তার চিরন্তন কল্লোলে মেতে ওঠে। কিন্তু এই মুক্তির লীলায় ক্ষতবিক্ষত অভিজিতের আহত দেহ মায়ের মতো মুক্তধারার জলেই চিরতরে ভেসে চলে যায়। এই মর্মান্তিক সংবাদ শুনে রাজা রণজিৎ তাঁর সমস্ত বৈষয়িক অহংকার ও শোক ভুলে গিয়ে এক পরম আধ্যাত্মিক সত্য উপলব্ধি করে বলেন:
"বুঝেছি, সেই মুক্তিতে তিনি মুক্তি পেয়েছেন।" (উৎস: মুক্তধারা)
রণজিতের এই উক্তিটি নাটকের মূল প্রতিপাদ্যকে স্পষ্ট করে দেয়। অভিজিৎ নিজের নশ্বর শরীরকে বিসর্জন দিয়ে কেবল জলের প্রবাহকে মুক্ত করেননি; তিনি নিজে উত্তরকূটের কৃত্রিম রাজসিংহাসন, ভোগলিপ্সা এবং সাংসারিক বন্ধন থেকে চিরন্তন আত্মিক মুক্তি লাভ করেছেন। আধ্যাত্মিক মুক্তি কেবল বেঁচে থাকার মধ্যে নয়, মানবকল্যাণে নিজের ক্ষুদ্র ‘আমি’-কে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মহৎ সত্যের সাথে বিলীন করে দেওয়ার মধ্যেই নিহিত থাকে।
উপসংহার
সার্বিক আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে বলা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুক্তধারা’ নাটকটি কেবল একটি রাজনৈতিক নাটক নয়, বরং এটি মূলত একটি পরম মানবমুক্তির নাটক। নাটকে উত্তরকূটের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও শিবতরাইয়ের ওপর অর্থনৈতিক শোষণের যে রাজনৈতিক ছবি আঁকা হয়েছে, তা কেবল নাটকের প্লট বা পটভূমি তৈরিতে সাহায্য করেছে। কিন্তু নাটকের মূল লক্ষ্য ও চরম পরিণতি আবর্তিত হয়েছে যুবরাজ অভিজিতের আধ্যাত্মিক রূপান্তর ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে মানবাত্মা ও অবরুদ্ধ প্রকৃতির একযোগে মুক্তির মধ্য দিয়ে। ধনঞ্জয় বৈরাগীর অহিংস নীতি এবং অভিজিতের প্রাণ দিয়ে যান্ত্রিক বাঁধ ভাঙার দর্শন রাজনৈতিক কূটকৌশলের সংকীর্ণ সীমানাকে অতিক্রম করে সার্বজনীন মানবিকতার জয়গান গায় । তাই ‘মুক্তধারা’ নাটকে রাজনীতি নামক বীজটি থেকে শেষ পর্যন্ত মানবমুক্তির এক বিশাল মহীরুহ প্রস্ফুটিত হয়েছে। নাটকের নামকরণ, চরিত্র সৃষ্টি, দ্বন্দ্বের প্রকৃতি এবং অন্তিম ট্র্যাজিক মহিমা—সবকিছুই প্রমাণ করে যে, এটি চিরকালীন মানবমুক্তির এক সার্থক, গভীর ও কালোত্তীর্ণ রূপক-সাংকেতিক সৃষ্টি।

No comments
"আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখে জানান। আপনার যেকোনো পরামর্শ সাদরে গৃহীত।"