ads

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুক্তধারা’ নাটকের নামকরণের সার্থকতা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুক্তধারা’ নাটকের নামকরণের সার্থকতা 

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১১৯৪১) তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সংগীতস্রষ্টা এবং নাট্যকার। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তাঁর পদচারণা থাকলেও রূপক সাংকেতিক নাটক সৃষ্টিতে তাঁর মৌলিকতা সারাবিশ্বে স্বীকৃত। মানুষের ভেতরের অন্তর্নিহিত সত্য, আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা এবং প্রাকৃতিক নিয়মের সঙ্গে মানবজীবনের আত্মিক মেলবন্ধনের যে রূপ তিনি নাটকে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা এক কথায় অতুলনীয়। তাঁর এই দার্শনিক জীবনচেতনার এক অনন্য ফসল হলো মুক্তধারা’ (১৯২২) নাটকটি। সাহিত্যের শিল্পশৈলীতে একটি রচনার নামকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে। নামকরণের মাধ্যমেই মূলত রচনার মূল সুর, কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু লেখকের উদ্দেশ্য প্রকাশ পায়।মুক্তধারানাটকের ক্ষেত্রেও নামকরণটি কেবল বাহ্যিক কোনো ভৌগোলিক ঝরনার পরিচয় বহন করে না, বরং তা নাটকের মূল চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর, সামাজিক দ্বন্দ্ব এবং মানবমুক্তির শাশ্বত দর্শনকে প্রকাশ করে। নিচে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এই নামকরণের সার্থকতা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

নামকরণের তাত্ত্বিক গুরুত্ব ও আক্ষরিক অর্থ

যেকোনো সাহিত্যকর্মের নামকরণ সাধারণত তিনভাবে হতে পারে—চরিত্রপ্রধান, কাহিনিপ্রধান কিংবা ভাব বা প্রতীকপ্রধান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুক্তধারা’ নাটকটি একটি সার্থক প্রতীকধর্মী ও ভাবপ্রধান নাটক। আক্ষরিক অর্থে ‘মুক্তধারা’ হলো উত্তরকূটের পার্বত্য অঞ্চলের একটি খরস্রোতা প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বা ঝরনা। এই জলধারাটি যুগ যুগ ধরে কোনো বাধা ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বয়ে চলেছিল এবং পাহাড়ি উপত্যকার নিচে বসবাসকারী শিবতরাই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের তৃষ্ণা মেটাত ও তাদের চাষের জমিকে উর্বর করত।

তাত্ত্বিকভাবে বিচার করলে, এই অবাধে বয়ে চলা জলপ্রবাহ বা ‘মুক্তধারা’ আসলে জীবন ও প্রকৃতির স্বাভাবিক ও চিরন্তন গতির প্রতীক। যেখানেই জীবনের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহকে কৃত্রিম উপায়ে আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়, সেখানেই তৈরি হয় এক দানবীয় সংকট। এই নাটকে মুক্তধারার নামকরণের গুরুত্ব নিহিত রয়েছে প্রকৃতির এই স্বতঃস্ফূর্ত গতির সঙ্গে মানুষের কৃত্রিম যান্ত্রিক লালসার সংঘাতের মধ্যে।

উত্তরকূটের রাজশক্তি ও যন্ত্ররাজ বিভূতির অহংকার

নাটকের কাহিনিতে দেখা যায়, উত্তরকূটের সাম্রাজ্যবাদী রাজা রণজিৎ এবং তাঁর সভার প্রধান প্রকৌশলী যন্ত্ররাজ বিভূতি দীর্ঘ পঁচিশ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে এক বিশাল লোহার বাঁধ তৈরি করেছেন। এই বাঁধের মাধ্যমে তাঁরা মুক্তধারা ঝরনার জলপ্রবাহকে সম্পূর্ণ আটকে দিয়েছেন। বিভূতির এই বাঁধ তৈরি করা কেবল এক সাধারণ প্রকৌশলগত সাফল্য ছিল না, এটি ছিল প্রকৃতির ওপর মানুষের মেকি বুদ্ধির বিজয় ঘোষণা করার এক উদ্ধত অহংকার। বিভূতি বিশ্বাস করে যে মানুষের যান্ত্রিক শক্তি দিয়ে বিশ্বপ্রকৃতি ও মানুষের প্রাণকে চিরতরে শৃঙ্খলিত করা সম্ভব। উত্তরকূটের দূতের কাছে নিজের যান্ত্রিক দম্ভ প্রকাশ করে বিভূতি বলে:

"দেবতা তাদের কেবল জলই দিয়েছেন, আমাকে দিয়েছেন জলকে বাঁধবার শক্তি।" (উৎস: মুক্তধারা)

এই উক্তিটির সাহিত্যিক তাৎপর্য অত্যন্ত সুগভীর। যন্ত্রী বিভূতি নিজেকে দেবতার চেয়েও শক্তিশালী ভাবছে। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি ও প্রযুক্তি যখন জীবনমুখী না হয়ে অহংকারী ও আগ্রাসী হয়ে ওঠে, তখন তা প্রকৃতির স্বাভাবিক দানকে নিজের কুক্ষিগত করতে চায়। বিভূতি এখানে যান্ত্রিক আধুনিকতার সেই নেতিবাচক রূপের প্রতীক, যা প্রাণের স্পন্দনকে উপেক্ষা করে কেবল বস্তুগত শক্তিকে বড় করে দেখে। জীবনমুখী দৃষ্টিতে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির স্বাভাবিক দানকে যখন মানুষ ক্ষমতার দম্ভে বন্দি করার চেষ্টা করে, তখন তা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শান্তিময় ভারসাম্যের বিরুদ্ধে এক চরম অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

শিবতরাইয়ের সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার ও জল সংকট

উত্তরকূটের এই বাঁধ নির্মাণের মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল শিবতরাই অঞ্চলের সাধারণ প্রজাদের অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে পরাধীন করা। শিবতরাইয়ের মানুষ মূলত কৃষিজীবী এবং তাদের জীবন ও জীবিকা সম্পূর্ণভাবে মুক্তধারার জলের ওপর নির্ভরশীল। জল আটকে দেওয়ার অর্থ হলো তাদের চাষের জমিকে মরুভূমি বানিয়ে দেওয়া এবং তাদের ভাতের থালা কেড়ে নেওয়া। রাজশক্তি এই জলকে একটি মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে শিবতরাইয়ের প্রজাদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করতে চায়। জল এখানে জীবনের অধিকারের প্রতীক। জল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উত্তরকূটের রাজশক্তি যে নিষ্ঠুর আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে, তার বিরুদ্ধেই পুরো নাটকের মূল দ্বন্দ্ব আবর্তিত হয়েছে। শোষিত ও জলবঞ্চিত মানুষের এই হাহাকার ও বেঁচে থাকার লড়াই নাটকের নামকরণের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

মুক্তধারার ঝরনা বাঁধার অন্তরালে শোষণের রাজনীতি

উত্তরকূটের রাজা রণজিৎ মনে করেন যে, দূরবর্তী অঞ্চলের প্রজাদের ওপর শাসন বজায় রাখতে হলে ভালোবাসা নয়, বরং ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। খাজনা আদায়ে বিলম্ব এবং শিবতরাইয়ের অবাধ্যতাকে দমন করতে তাই মুক্তধারার জল আটকে দেওয়াকে তিনি প্রধান রাজনৈতিক চাল হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি মূলত যান্ত্রিক যুগের সাম্রাজ্যবাদের এক কুৎসিত রূপ। যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদকে মুষ্টিমেয় কিছু শাসক নিজেদের স্বার্থে বন্দি করে সাধারণ মানুষকে দাস বানানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। মুক্তধারাকে বাঁধার এই চক্রান্তের পেছনে কাজ করেছে উত্তরকূটের ক্ষমতার লোভ এবং শোষণের উগ্র রাজনীতি।

যুবরাজ অভিজিতের রূপান্তর ও মুক্তধারার মাতৃত্ব

নাটকের নামকরণের সার্থকতা সবচেয়ে গভীরভাবে প্রকাশিত হয়েছে উত্তরকূটের যুবরাজ অভিজিৎ চরিত্রের মধ্য দিয়ে। অভিজিৎ রাজপ্রাসাদের সমস্ত ভোগবিলাস ও রাজকীয় পরিবেশের মধ্যে বড় হলেও তাঁর মন সব সময় এক অজানা আকুলতায় ব্যাকুল থাকত। নাটকের একপর্যায়ে জানা যায় যে, অভিজিৎ আসলে রাজপরিবারের সন্তান নন; তাঁকে মুক্তধারা ঝরনার উৎসের কাছে এক কুড়িয়ে পাওয়া শিশু হিসেবে উদ্ধার করা হয়েছিল। এই জন্মরহস্য জানতে পেরে অভিজিতের জীবন দর্শন সম্পূর্ণ বদলে যায়। তিনি অনুভব করেন যে মুক্তধারা ঝরনাটি কেবল একটি প্রাকৃতিক জলাধার নয়, এটিই তাঁর জন্মদাত্রী মা। ঝরনার অবারিত ধারার কলধ্বনির মধ্যে তিনি তাঁর মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পান। রাজা রণজিতের সামনে তাঁর এই অন্তরের সত্য প্রকাশ করে অভিজিৎ বলেন:

"এই জলের শব্দে আমি আমার মাতৃভাষা শুনতে পাই।" (উৎস: মুক্তধারা)

এই উক্তিটি অত্যন্ত কাব্যিক এবং গভীর জীবনবোধসম্পন্ন। অভিজিতের কাছে মুক্তধারার বয়ে চলা জল কেবল কোনো তরল পদার্থ নয়, তা তাঁর সত্তার মূল উৎস এবং তাঁর মায়ের স্নেহময় কণ্ঠস্বর। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির যে আত্মিক ও নাড়ির সম্পর্ক রয়েছে, তা এই লাইনের মাধ্যমে অতুলনীয়ভাবে প্রকাশ পেয়েছে। জীবনমুখী দিক থেকে বিচার করলে, এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে মানুষ প্রকৃতিরই অংশ। প্রকৃতিকে ধ্বংস বা বন্দি করার অর্থ হলো নিজের মাতৃভাষাকে তথা নিজের অস্তিত্বের মূল সুরকে গলা টিপে হত্যা করা।

অভিজিৎ নিজেকে রাজপ্রাসাদের প্রথাগত নিয়মের বেড়াজালে আটকে রাখতে পারেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর জন্ম হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য বন্ধ দুয়ার খুলে দিতে। নিজের জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি রাজমন্ত্রীকে বলেন:

"আমি পৃথিবীতে এসেছি পথ কাটবার জন্যে, এই খবর আমার কাছে এসে পৌঁচেছে।" (উৎস: মুক্তধারা)

অভিজিতের এই উক্তিটি প্রমাণ করে যে তিনি কেবল মুক্তধারার সন্তানই নন, তিনি মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক। তিনি উত্তরকূটের বন্ধ নন্দিসংকটের পথ কেটে দিয়ে শিবতরাইয়ের মানুষের অন্ন চলাচলের পথ সুগম করেছিলেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে গতিরুদ্ধ জীবন আসলে এক ধরনের আধ্যাত্মিক মৃত্যু। মানুষের জীবনপথকে অবাধ ও উন্মুক্ত রাখাই ছিল তাঁর জীবনের মূল সাধনা।

যান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদ বনাম মুক্ত প্রাণের আকাঙ্ক্ষা

রণজিৎ ও বিভূতির তৈরি দানবীয় বাঁধ যখন প্রকৃতির অবারিত ধারাকে বন্দি করে ফেলে, তখন অভিজিৎ নিজের ভেতরে এক অসহ্য বন্দিত্ব অনুভব করেন। তাঁর মনে হতে থাকে যে মুক্তধারা ঝরনার পায়ে লোহার বেড়ি পরানোর অর্থ হলো তাঁর নিজের আত্মার ওপর ক্ষমতার শিকল চাপিয়ে দেওয়া। উত্তরকূটের রাজসিংহাসন এবং যান্ত্রিক অহংকারকে তিনি প্রাণের মুক্তির পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় বলে মনে করেন। তাঁর প্রিয় অনুচর সঞ্জয়ের কাছে অন্তরের এই গভীর উপলব্ধির কথা প্রকাশ করে তিনি বলেন:

"আমার অন্তরের কথা আছে ঐ মুক্তধারার মধ্যে। তারই পায়ে ওরা যখন লোহার বেড়ি পরিয়ে দিলে তখন হঠাৎ যেন চমক ভেঙে বুঝতে পারলুম উত্তরকূটের সিংহাসনই আমার জীবনস্রোতের বাঁধ।" (উৎস: মুক্তধারা)

এই অসাধারণ উক্তিটির মধ্য দিয়ে রূপক নাটকের মূল সত্য উন্মোচিত হয়েছে। এখানে উত্তরকূটের রাজসিংহাসন এবং বিভূতির বাঁধ সমান্তরালভাবে মানুষের কৃত্রিম অহংকার ও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। অভিজিৎ বুঝতে পারেন যে, প্রথাগত ক্ষমতার চূড়ায় বসে মানুষের কল্যাণ করা যায় না; বরং ক্ষমতার মোহ মানুষের জীবনস্রোতকে রুদ্ধ করে দেয়। জীবনের আসল সার্থকতা হলো বাঁধনহীনভাবে সত্যের পথে চলা। জীবনমুখী ব্যাখ্যায় এটি স্পষ্ট করে যে, বৈষয়িক লালসা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার রাজসিংহাসন মানুষের আত্মিক মুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

অহিংস প্রতিবাদ ও ধনঞ্জয় বৈরাগীর চেতনা

নাটকের আরেকটি অত্যন্ত শক্তিশালী চরিত্র হলো শিবতরাইয়ের চারণ কবি ধনঞ্জয় বৈরাগী। ধনঞ্জয় প্রজাদের শেখান যে ভয়ের রাজত্বকে জয় করার একমাত্র উপায় হলো নিজের মন থেকে ভয় দূর করা। তিনি অহিংস ও নির্ভীক প্রতিবাদের ডাক দেন। রাজা রণজিৎ যখন শিবতরাইকে অনাহারে মারার চক্রান্ত করেন, তখন অভিজিৎ কেবল দয়ার বশে তাদের সাহায্য করতে চাননি, বরং তাদের আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ প্রসঙ্গে অভিজিৎ বলেন:

"ডান হাতের কার্পণ্য দিয়ে পথ বন্ধ করে বাঁ হাতের বদান্যতায় বাঁচানো যায় না।" (উৎস: মুক্তধারা)

এই বক্তব্যটি চিরকালীন শোষণের রাজনীতির গালে এক সজোরে চড়। একদিকে সাধারণ মানুষের অন্ন ও জলের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে দিয়ে তাদের পরাধীন করা, আর অন্যদিকে দয়ালু রাজার অভিনয় করে সামান্য সাহায্য বা ত্রাণের হাত বাড়িয়ে দেওয়া চরম ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ দয়া ভিক্ষা করে বাঁচতে চায় না, সে নিজের অধিকার নিয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়।

ধনঞ্জয় বৈরাগীও এই তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি যখন রাজার হাতে বন্দি হন, তখন রাজার বাহ্যিক ক্ষমতার দম্ভকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে নির্ভীক চিত্তে গেয়ে ওঠেন:

"তোর শিকল আমায় বিকল করবে না। তোর মারে মরম মরবে না।" (উৎস: মুক্তধারা)

এই গানটি মানুষের আত্মিক শক্তির জয়গান গায়। অত্যাচারী শাসক লোহার শিকল দিয়ে মানুষের দেহকে বন্দি করতে পারে, কিন্তু মানুষের অন্তরের সত্য ও স্বাধীনতার চেতনাকে কোনোদিন বন্দি করতে পারে না। লোহার বাঁধ যেমন মুক্তধারাকে সাময়িকভাবে আটকে রেখেছিল কিন্তু তার তরল প্রাণের ধারাকে ধ্বংস করতে পারেনি, তেমনি অত্যাচারী রাজশক্তিও মানুষের অজেয় আত্মাকে কোনোদিন বিকল করতে পারে না।

অভিজিতের চূড়ান্ত আত্মত্যাগ ও নামকরণের অন্তিম সার্থকতা

নাটকের শেষ ভাগে এসে দ্বন্দ্ব তার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায়। অভিজিৎ বুঝতে পারেন যে শুধু কথায় বা অহিংস আন্দোলনে বিভূতির তৈরি অটল লোহার বাঁধ ভাঙা যাবে না। যন্ত্রের এই দানবীয় অহংকারকে ভাঙতে হলে নিজের রক্ত ও প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে। বিভূতি বাঁধটির উত্তর দিকে এমন একটি দুর্বল ছিদ্রপথ রেখেছিল, যাতে আঘাত করলে পুরো বাঁধটি ভেঙে পড়বে, কিন্তু একই সাথে সেই প্রবল জলের স্রোতে আঘাতকারী ব্যক্তি ভেসে যাবে। যুবরাজ অভিজিৎ নিজের জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে প্রকৃতির এবং মানুষের মুক্তির জন্য সেই চরম আত্মত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। মোহনগড়ের রাজা বিশ্বজিতের কাছে বিদায় নেওয়ার সময় তিনি প্রতিজ্ঞা করেন:

"স্রোতের পথ আমার ধাত্রী, তার বন্ধন মোচন করব।" (উৎস: মুক্তধারা)

অভিজিতের এই উক্তিটি নাটকের মূল পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করে। স্রোতের পথ বা নদীই তাঁর আসল ধাত্রী মা, যে তাঁকে লালন করেছে। মায়ের শরীরে রাজশক্তি যে যান্ত্রিক শৃঙ্খল বা বাঁধ পরিয়ে দিয়েছে, তা কেটে ফেলার দায়িত্ব পুত্রেরই। অভিজিৎ এই বাঁধন মোচন করার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে প্রাকৃতিক নিয়ম ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রয়োজনে হাসিমুখে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করা যায়।

অমাবস্যার ঘন অন্ধকারের রাতে অভিজিৎ বাঁধের সেই গোপন দুর্বল ছিদ্রপথে আঘাত করেন। বিকট শব্দে বিভূতির অহংকারের প্রতীক লোহার বাঁধ ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। পঁচিশ বছর ধরে বন্দি থাকা ‘মুক্তধারা’ আবার নিজের পূর্ণ গতি ফিরে পেয়ে প্রবল কল্লোলে ধেয়ে চলে। কিন্তু এই বাঁধন ভাঙার খেলায় বাঁধের প্রকাণ্ড লোহার কাঠামো যখন ভেঙে পড়ে, তখন তার সুতীব্র আঘাতে ক্ষতবিক্ষত যুবরাজ অভিজিতের দেহটি সেই মুক্তধারার প্রবল স্রোতেই চিরতরে ভেসে যায়।

রণজিতের কাছে সঞ্জয় এসে যখন অভিজিতের পরিণতির কথা জানায়, তখন রাজা রণজিৎ গভীর শোকে নিমজ্জিত হয়েও এক পরম সত্য উপলব্ধি করেন। তিনি বলেন:

"বুঝেছি, সেই মুক্তিতে তিনি মুক্তি পেয়েছেন।" (উৎস: মুক্তধারা)

এই উক্তিটি নাটকের চরম সত্যকে উন্মোচন করে। অভিজিৎ কেবল মুক্তধারাকে মুক্ত করেননি; এই মহান ত্যাগের মাধ্যমে তিনি নিজে উত্তরকূটের বৈষয়িক মোহ, রাজসিংহাসনের কৃত্রিম বন্ধন এবং সাংসারিক বন্দিত্ব থেকে চিরন্তন আত্মিক মুক্তি লাভ করেছেন। জলধারার এই ভৌত মুক্তি আসলে যুবরাজ অভিজিতের আধ্যাত্মিক মুক্তির সমার্থক হয়ে উঠেছে।

উপসংহার

    সামগ্রিক পর্যালোচনার পর নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুক্তধারা’ নাটকের নামকরণটি সর্বাংশে সার্থক ও তাৎপর্যপূর্ণ। নাটকটিতে ‘মুক্তধারা’ কেবল পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে আসা কোনো জলপ্রবাহ নয়; তা হলো জীবনের অবাধ গতি, প্রকৃতির অবারিত রূপ, সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার এবং সব ধরনের যান্ত্রিক ও সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙার এক মহাকাব্যিক চেতনা। যুবরাজ অভিজিৎ নিজের প্রাণের বিনিময়ে যে ঝরনাকে মুক্ত করেছেন, তা আসলে বন্দি মানবাত্মারই মুক্তির নামান্তর। নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনা, চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত এবং কাহিনীর চূড়ান্ত ট্র্যাজিক পরিণতি এই ‘মুক্তধারা’ নামক রূপকটিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। তাই রবীন্দ্রনাথের নাটকগুলোর মধ্যে নামকরণ এবং নাট্যভাবনার এমন নিবিড় ও সার্থক মেলবন্ধন সত্যিই বিরল ও কালজয়ী।

S M A Hanif
BA (Hon's), MA
Bengali Language and Literature
মুক্তধারা বই: 


No comments

"আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখে জানান। আপনার যেকোনো পরামর্শ সাদরে গৃহীত।"

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.