রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রক্তকরবী' নাটকের পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রক্তকরবী' নাটকের পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) তাঁর দীর্ঘ সৃজনশীল জীবনে মানব সভ্যতার বিভিন্ন সংকট, অগ্রগতি এবং মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর এই কালজয়ী সাহিত্যিক ও দার্শনিক ভাবনার এক অনন্য ফসল হলো ‘রক্তকরবী’ (১৯২৬) নাটকটি। নাটকটি কেবল একটি রূপক-সাংকেতিক সৃষ্টিই নয়, বরং এটি সমকালীন পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা, যান্ত্রিক সভ্যতা এবং সাম্রাজ্যবাদী লোভের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ শৈল্পিক প্রতিবাদ। রবীন্দ্র-চেতনার আলোকে যক্ষপুরীর স্বর্ণখনিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক নির্মম সাম্রাজ্যের আড়ালে নাট্যকার এখানে পুঁজিবাদের করাল গ্রাস এবং তার বিপরীতে মানবাত্মার অবিনশ্বর বিজয়ের কাহিনি ফুটিয়ে তুলেছেন।
যক্ষপুরী: পুঁজিবাদী শোষণের রূপক দুর্গ
‘রক্তকরবী’ নাটকের মূল পটভূমি
হলো যক্ষপুরী, যা মূলত আধুনিক
যন্ত্রসভ্যতা এবং
ধনতান্ত্রিক শোষণের
এক
নির্মম
প্রতীকী রূপ।
এই
পুরীর
অধিবাসীরা দিনরাত
মাটির
নিচ
থেকে
সোনা
উত্তোলনের কাজে
নিয়োজিত। পুঁজিবাদী সমাজ
মানুষের আত্মিক
এবং
প্রাকৃতিক বিকাশকে রুদ্ধ
করে
কেবল
বস্তুগত প্রাচুর্য সঞ্চয়ের পেছনে
ছুটতে
বাধ্য
করে।
ধুলোর
নাড়ির
ধন
অর্থাৎ
সোনা
মাটির
তলাকার
জড়বস্তু, যা
মানুষের প্রাণের ক্ষুধাকে মেটাতে
পারে
না।
অথচ
পুঁজিবাদ মানুষকে তার
অন্তরের অমল
আনন্দ
থেকে
দূরে
সরিয়ে
এই
ক্ষণস্থায়ী বস্তুগত সম্পদের গোলামে
পরিণত
করে। পুঁজিবাদের বিভাজনমূলক চরিত্রকে উন্মোচন করতে
গিয়ে
যক্ষপুরীর অধ্যাপক নন্দিনীকে বলেছেন:
"সব জিনিসকে টুকরো
করে
আনাই
এদের
পদ্ধতি।" (রক্তকরবী)
পুঁজিবাদ কখনোই
অখণ্ড
মানবজীবন বা
জীবনের
সহজ
আনন্দকে প্রশ্রয় দেয়
না।
সে
মানুষের প্রেম,
সখ্যতা
ও
পারিবারিক আবেগকে
খণ্ডিত
করে
তাকে
একাকী
করে
তোলে।
ফলে
মানুষ
একসময়
সমাজ
ও
নিজের
কাছ
থেকেই
বিচ্ছিন্ন হয়ে
পড়ে
এবং
পুঁজিপতির কারখানায় স্রেফ
উৎপাদন
যন্ত্রের একটি
তুচ্ছ
যন্ত্রাংশে পরিণত
হয়।
মনুষ্যত্বের অবমাননা ও মানুষকে যন্ত্রের পুতুলে রূপান্তর
পুঁজিবাদের অন্যতম
প্রধান
বৈশিষ্ট্য হলো
মানুষের শ্রমকে
যান্ত্রিক করা
এবং
মানুষকে ব্যক্তিত্বহীন এক
একটি
শ্রম-যন্ত্রে পরিণত করা। যক্ষপুরীতে শ্রমিকদের কোনো
নাম
নেই;
তারা
কেবল
কিছু
সংখ্যা
বা
নম্বর
(যেমন
৬১-হ্ন, ৪৭-প
ইত্যাদি)।
তাদের
ব্যক্তিগত সুখ,
দুঃখ,
ভালোবাসা বা
পরিচিতি সেখানে
গুরুত্বহীন। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বার্থে তাদের
শুধুমাত্র শ্রমের
উৎস
হিসেবে
ব্যবহার করা
হয়।
তাদের
এই
পরিচয়হীনতা ও
যান্ত্রিক জীবনের
তীব্র
যন্ত্রণা আমাদের
চোখে
আঙুল
দিয়ে
দেখিয়ে
দেয়
কীভাবে
পুঁজি
শ্রমিকের মনুষ্যত্বকে হরণ
করে।
বিশু
এবং
ফাগুলালের মতো
শ্রমিকেরা প্রতিদিন এই
নির্মম
বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।
এই
যান্ত্রিকতা ও
বন্দিত্ব সম্পর্কে বলতে
গিয়ে
ফাগুলাল তার
স্ত্রী
চন্দ্রাকে বলেছেন:
"বনের মধ্যে পাখি
ছুটি
পেলে
উড়তে
পায়,
খাঁচার
মধ্যে
তাকে
ছুটি
দিলে
মাথা
ঠুকে
মরে।
যক্ষপুরে কাজের
চেয়ে
ছুটি
বিষম
বালাই।"
(রক্তকরবী)
পুঁজিবাদী সমাজ মানুষকে এমনভাবে একটি খাঁচার মধ্যে বন্দি করে ফেলে যে, শ্রমিকেরা স্বাভাবিক জীবনের স্বাদ কেমন তা ভুলেই যায়। কাজের চাপ যখন তাদের দম বন্ধ করে দেয়, তখনও তারা ছুটি সহ্য করতে পারে না; কারণ ছুটির অবসর তাদের খাঁচাবন্দি জীবনের কদর্য রূপটিকে আরও তীব্রভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। পুঁজিবাদ মানুষের চিন্তা করার শক্তিকেও অবশ করে দেয়, যাতে সে বিদ্রোহ করার সাহস হারিয়ে ফেলে।
প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর পুঁজিবাদী আগ্রাসন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রকৃতির সহজ
দান
ও
সৌন্দর্যের আজীবন
উপাসক
ছিলেন।
‘রক্তকরবী’ নাটকে
তিনি
দেখিয়েছেন কীভাবে
পুঁজিবাদী লোভ
কেবল
মানুষের ওপরেই
নয়,
বরং
প্রকৃতির ওপরেও
নির্মম
অত্যাচার করায়।
যক্ষপুরীর শাসকেরা পৃথিবীর উর্বর
বুক
চিরে
তার
খনিজ
সম্পদ
লুণ্ঠন
করে
চলেছে।
প্রকৃতি যেখানে
মানুষকে উন্মোচিত হৃদয়ে
তার
ফল,
ফুল
ও
শস্য
বিলিয়ে
দেয়,
সেখানে
পুঁজিবাদ হিংস্রভাবে মাটির
তলাকার
কঙ্কালগুলোকে উপড়ে
নিয়ে
আসে।
এই
নির্মম
ধনলিপ্সার বিরুদ্ধে নন্দিনী রাজার
উদ্দেশ্যে ক্ষোভ
উগরে
দিয়ে
বলেছে:
"পৃথিবী আপনার প্রাণের জিনিস
আপনি
খুশি
হয়ে
দেয়।
কিন্তু
যখন
তার
বুক
চিরে
মরা
হাড়গুলোকে ঐশ্বর্য ব’লে ছিনিয়ে নিয়ে
আস
তখন
অন্ধকার থেকে
একটা
কানা
রাক্ষসের অভিসম্পাত নিয়ে
আস।
দেখছ
না,
এখানে
সবাই
কেমন
রেগে
আছে,
কিম্বা
সন্দেহ
করছে,
কিম্বা
ভয়
পাচ্ছে?"
(রক্তকরবী)
প্রকৃতির ওপর
মানুষের এই
হিংস্র
থাবা
আসলে
পুঁজিবাদের এক
আত্মঘাতী রূপ।
উর্বর
মাটিকে
রক্তাক্ত করে
যখন
সোনা
অর্থাৎ
‘মরা
হাড়’
নিয়ে
আসা
হয়,
তখন
চারপাশের পরিবেশ
ও
মানুষের জীবন
এক
অদৃশ্য
অভিশাপে জরাজীর্ণ হয়ে
ওঠে।
প্রকৃতিকে ধ্বংস
করে
যে
ঐশ্বর্য অর্জন
করা
হয়,
তা
মানুষের মনে
কোনো
শান্তি
আনতে
পারে
না;
বরং
তা
কেবল
ভয়,
অবিশ্বাস এবং
ক্রোধের জন্ম
দেয়।
প্রশাসন, ধর্ম ও পুঁজির অশুভ আঁতাত
পুঁজিবাদের শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে
রাখতে
এবং
শ্রমিকদের অসন্তোষকে দমন
করতে
প্রশাসন ও
ধর্ম
কীভাবে
একযোগে
কাজ
করে,
রবীন্দ্রনাথ এই
নাটকে
তা
অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে দেখিয়েছেন। নাটকের
সর্দাররা হলেন
পুঁজিবাদী দমনপীড়নের যান্ত্রিক বাহক।
তারা
কঠোর
নিয়মের
বেড়াজালে শ্রমিকদের বেঁধে
রাখে।
শোষক
শ্রেণি
ধর্মের
আফিম
ব্যবহার করে
শ্রমিকদের চেতনাকে অবশ
করে
রাখে।
যক্ষপুরীতে রাজকীয়
ক্ষমতার সহায়ক
শক্তি
হিসেবে
কাজ
করে
গোঁসাই। সে
ধর্মের
মিথ্যা
আশ্বাস
ও
শাস্ত্রের বাণী
শুনিয়ে
শ্রমিকদের অধিকারের লড়াই
থেকে
বিচ্যুত করে।
গোঁসাই
নিজে
পরম
আরামে
জীবনযাপন করলেও
খনির
নরককুণ্ডে বাস
করা
শ্রমিকদের শেখায়
যে,
তাদের
অল্পতে
সন্তুষ্ট থাকাই
ঈশ্বরের বিধান।
গোঁসাইয়ের এই
মেকি
তত্ত্ব
ও
সুবিধাবাদী চরিত্রটি প্রকাশ
পায়
তাঁর
নিজস্ব
এক
অসামান্য সংলাপে:
"ওদের খুব কম
বাঁচলেও চলে,
কেননা
ওদের
ভার-লাঘবের জন্যে আমরাই
বাঁচি।
এ
কি
ওদের
পক্ষে
কম
বাঁচোয়া?" (রক্তকরবী)
এই সংলাপটির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ পুঁজিবাদী সমাজে ধর্মের ছদ্মবেশে চলা তীব্র শ্রেণিগত শোষণের রূপটি ফুটিয়ে তুলেছেন। শোষক ও পুরোহিত শ্রেণি নিজেদের বিলাসী জীবনকে ঈশ্বরের ইচ্ছা বলে প্রচার করে এবং মেহনতি মানুষের বঞ্চনাকে তাদের পূর্বজন্মের পাপ বা আধ্যাত্মিক পরীক্ষা বলে সান্ত্বনা দেয়। এই কপট ধর্মব্যবসা আসলে শোষণের দুর্গ রক্ষা করার এক অন্যতম মোক্ষম হাতিয়ার।
শ্রমিকদের অবশীকরণ ও মদের নেশার রাজনীতি
পুঁজিবাদের অন্যতম
বড়
কৌশল
হলো
শ্রমিকদের মগজ
ধোলাই
করা
এবং
তাদের
ক্ষোভকে ভুলিয়ে
রাখার
জন্য
কৃত্রিম উত্তেজনার জোগান
দেওয়া।
যক্ষপুরীর শ্রমিকদের বারো
ঘণ্টা
খাটানোর পর
চার
ঘণ্টা
অতিরিক্ত খাটানো
হয়
এবং
তাদের
এই
সীমাহীন ক্লান্তিকে দূর
করার
জন্য
মদের
জোগান
দেওয়া
হয়।
মদ
তাদের
ভেতরের
প্রতিবাদী চেতনাকে অবশ
করে
রাখে।
বিশু
পাগল
এই
নির্মম
সত্যটি
গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে।
সে
বুঝতে
পেরেছে
যে,
ক্ষুধা
আর
তৃষ্ণা
চাবুকের মতো
শ্রমিকদের কাজ
করায়,
আর
মদের
কনকনে
নেশা
তাদের
মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ভুলিয়ে
রাখে।
যক্ষপুরীর এই
বিভীষিকাময় রূপ
তুলে
ধরে
বিশু
সর্দারদের ভেতরের
পৈশাচিক মনোভাব
সম্পর্কে বলেছে:
"ভিতরে মস্ত একটা
পশু
রয়েছে-যে— মানুষের অপমানের ওদের
মাথা
হেঁট
হয়
না,
ভিতরকার জানোয়ারটার লেজ
ফুলতে
থাকে,
দুলতে
থাকে।"
(রক্তকরবী)
পুঁজিবাদী সমাজ শোষকদের মানুষের কাতার থেকে নামিয়ে এক একটি হিংস্র পশুতে পরিণত করে। এখানে অন্য মানুষের অপমান বা যন্ত্রণায় শোষক শ্রেণির মনে কোনো অনুশোচনা তৈরি হয় না, বরং তাদের ক্ষমতার দম্ভ আরও বেড়ে যায়। শ্রমিকের ওপর চাবুকের আঘাত এবং তাদের অবমাননা শোষকদের অহংকারকে আরও প্রস্ফুটিত করে তোলে।
মানুষখেকো পুঁজিবাদ ও শোষণের নির্মম সত্য
পুঁজিবাদের ভিত্তি
দাঁড়িয়ে থাকে
তীব্র
শ্রেণিভেদ এবং
এক
শ্রেণির শ্রম
শোষণ
করে
অন্য
শ্রেণির স্ফীত
হওয়ার
ওপর।
এখানে
পুঁজিপতির সম্পদ
বৃদ্ধি
মানেই
শ্রমিকের রক্ত
জল
করা
মেহনতের লুণ্ঠন। রবীন্দ্রনাথ এই
নাটকে
অত্যন্ত স্পষ্ট
ভাষায়
পুঁজিবাদের এই
পরজীবী
ও
সর্বগ্রাসী রূপটি
তুলে
ধরেছেন। যক্ষপুরীর বিলাসী
ও
অলস
শাসক
শ্রেণি
খোদাইকরদের নিদারুণ কষ্টের
ওপর
ভর
করেই
নিজেদের ক্ষমতার প্রাসাদ নির্মাণ করে।
যক্ষপুরীর এই
নির্মম
সত্যটিকে ব্যাখ্যা করতে
গিয়ে
অধ্যাপক অত্যন্ত কাটখোট্টা ভাষায়
বলেছেন:
"বাঘকে খেয়ে বাঘ
বড়ো
হয়
না,
কেবল
মানুষই
মানুষকে খেয়ে
ফুলে
ওঠে।"
(রক্তকরবী)
এই উক্তিটি পুঁজিবাদের নির্মম
শোষণের
এক
অসামান্য ও
কালোত্তীর্ণ রূপক
প্রকাশ। বাঘ
বা
অন্যান্য হিংস্র
পশুও
নিজের
শ্রেণির প্রাণীকে গ্রাস
করে
জীবনধারণ করে
না,
কিন্তু
সভ্যতার দাবিদার মানুষ
নিজের
লোভ
মেটাতে
অন্য
মানুষের শ্রম,
সময়
এবং
জীবনীশক্তিকে নির্দ্বিধায় চুষে
নেয়।
যক্ষপুরীর খনিতে
শ্রমিকদের হাড়ভাঙা খাটুনি
আর
সর্দারদের ক্ষমতার আস্ফালন আসলে
এই
মানুষখেকো সমাজব্যবস্থারই এক
বাস্তব
রূপায়ন।
শক্তির
ভার ও পুঁজির আত্মবিনাশী সংকট
পুঁজিবাদ কেবল
শ্রমিকেরই ক্ষতি
করে
না,
তা
পুঁজিপতিকেও এক
অন্ধকার খাঁচায়
বন্দি
করে
ফেলে।
সঞ্চয়ের অদম্য
তৃষ্ণা
এবং
ক্ষমতার লোভ
রাজাকে
মানুষের সাধারণ
স্পর্শ
থেকে
দূরে
সরিয়ে
একটি
কৃত্রিম লৌহজালের আড়ালে
নির্বাসিত করেছে।
রাজা
যক্ষপুরীর হর্তাকর্তা হয়েও
আসলে
নিজের
তৈরি
কারাগারের সবচেয়ে
বড়
কয়েদি।
নন্দিনীর সহজ
মৈত্রীর ডাকে
রাজার
ভেতরের
অবদমিত
মানুষটি যখন
জেগে
ওঠে,
তখন
তিনি
অনুভব
করেন
যে
বিপুল
ক্ষমতার এই
জগদ্দল
পাথরটি
কীভাবে
তাঁকে
ভেতর
থেকে
পিষে
মারছে।
নিজের
এই
আত্মিক
পঙ্গুত্ব প্রকাশ
করতে
গিয়ে
রাজা
নেপথ্য
থেকে
নন্দিনীকে বলেছেন:
"শক্তির ভার নিজের
অগোচরে
কেমন
করে
নিজেকে
পিষে
ফেলে,
সেই
পাহাড়টাকে দেখে
তাই
বুঝেছিলুম।" (রক্তকরবী)
এই জীবনমুখী দর্শনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শক্তির দম্ভ বা অতি-সঞ্চয় মানুষের আত্মাকে অসাড় করে দেয়। রাজা বুঝতে পারেন যে পাহাড়ের চূড়া যেমন বাইরে থেকে অটল ও দুর্ভেদ্য মনে হলেও তার ভেতরে চাপা পড়া পাথরগুলো একসময় গুমরে গুমরে ভেঙে পড়ে এবং পাহাড়টি ধসে যায়; ঠিক তেমনি বাহ্যিক বৈষয়িক শক্তি ও অহংকার মানুষের ভেতরের সত্তাকে নিঃশব্দে ধ্বংস করে ফেলে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এই আত্মঘাতী হাহাকারই রাজার চরিত্রের মূল ট্র্যাজেডি।
শ্রমিকের আত্মিক শূন্যতা ও হরণ হওয়া ভরসা
যক্ষপুরীর পুঁজিবাদী যন্ত্র
কেবল
শ্রমিকের শারীরিক ক্ষতি
করেই
ক্ষান্ত হয়
না,
তা
তাদের
ভেতরের
আত্মবিশ্বাস, স্বপ্ন
এবং
লড়াই
করার
মানসিকতাকেও সম্পূর্ণ শুষে
নেয়।
এখানকার শ্রমিকেরা দীর্ঘদিনের নিপীড়নে এতটাই
অভ্যস্ত হয়ে
পড়েছে
যে,
তারা
নিজেদের মানুষের মর্যাদা ও
অধিকারের কথা
ভাবতেও
ভয়
পায়।
কুস্তিগীর বা
জোয়ান
যুবকেরা যখন
যক্ষপুরীর শৃঙ্খলে আটকা
পড়ে,
তখন
তাদের
সমস্ত
দৈহিক
শক্তি
কর্পূরের মতো
উড়ে
যায়।
যক্ষপুরীর এই
পৈশাচিক ক্ষমতা
ও
মানসিক
দাসত্ব
তৈরির
রাজনীতি সম্পর্কে বলতে
গিয়ে
নিপীড়িত পালোয়ান ক্ষোভের সাথে
নন্দিনীকে জানিয়েছে:
"বোধ হচ্ছে ভেতরটা
ফাঁপা
হয়ে
গেছে।
এরা
কোথাকার দানব,
জাদু
জানে,
শুধু
জোর
নয়,
একেবারে ভরসা
পর্যন্ত শুষে
নেয়।"
(রক্তকরবী)
পুঁজিবাদের সবচেয়ে
বড়
অপরাধ
হলো
সে
মানুষের আত্মাকে ফাঁপা
করে
দেয়।
সে
মানুষকে শুধু
ভীতি
প্রদর্শন করে
না,
বরং
তার
ভেতরের
প্রতিবাদী সত্তা
ও
ঘুরে
দাঁড়ানোর ন্যূনতম আশাটুকুকেও জাদুর
মতো
হরণ
করে
নেয়।
মানুষ
তখন
নিজেকে
স্রেফ
নিয়তির
হাতে
সঁপে
দিয়ে
দাসত্বকে নিজের
ভাগ্য
বলে
মেনে
নেয়।
অমানবিকীকরণ
ও ‘রাজার এঁটো’
পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চূড়ান্ত পরিণতি
হলো
মানুষের সম্পূর্ণ অমানবিকীকরণ বা
‘ডিহিউম্যানাইজেশন’।
যক্ষপুরীর সর্দাররা শ্রমিকদের মানুষ
বলে
গণ্য
করে
না,
তারা
তাদের
স্রেফ
ব্যবহারের পর
ফেলে
দেওয়া
বর্জ্য
বলে
মনে
করে।
সর্দারদের চোখে
জরাজীর্ণ ও
ক্ষয়প্রাপ্ত শ্রমিকেরা মানুষের মর্যাদা হারিয়ে
ফেলে।
যক্ষপুরী থেকে
কাজ
শেষে
বের
হওয়া
প্রাণহীন শ্রমিকদের দেখে
সর্দার
অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে নন্দিনীকে বলেছে:
"ওদের আমরা বলি
‘রাজার
এঁটো’।" (রক্তকরবী)
এই নিষ্ঠুর সত্যটি
শুনে
ব্যথায়
কাতর
হয়ে
নন্দিনী প্রশ্ন করেছে:
"কিন্তু এ-সব
কী
চেহারা!
ওরা
কি
মানুষ!
ওদের
মধ্যে
মাংসমজ্জা মনপ্রাণ কিছু
কি
আছে!"
(রক্তকরবী)
এই কথোপকথনটি পুঁজিবাদী সমাজের নির্মমতম বাস্তবতাকে নির্দেশ করে। পুঁজিপতি যখন শ্রমিকের যৌবন ও জীবনীশক্তিকে সম্পূর্ণরূপে চুষে নেয়, তখন অবশিষ্ট কঙ্কালসার দেহগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয় আস্তাকুঁড়ে। তারা তখন আর মানুষ থাকে না, হয়ে যায় ‘রাজার এঁটো’ বা উচ্ছিষ্ট মাত্র। মানুষের এই নিদারুণ অপমান ও যন্ত্রে রূপান্তরই পুঁজিবাদের আসল কুৎসিত রূপ।
উপসংহার
পরিশেষে বলা
যায়,
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটকে
পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার যে
চিত্র
অঙ্কিত
হয়েছে,
তা
একবিংশ
শতাব্দীর বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও সমানভাবে সত্য
ও
প্রাসঙ্গিক। নাট্যকার কেবল
পুঁজিবাদের নেতিবাচক দিকগুলো দেখিয়েই ক্ষান্ত হননি,
বরং
এর
থেকে
মুক্তির পথও
দেখিয়েছেন। নন্দিনীর লাল
করবীর
রক্তিম
আলো,
বিশুর
গান
এবং
রঞ্জনের অদম্য
যৌবনের
শক্তি
প্রমাণ
করে
যে,
কোনো
যান্ত্রিক দেওয়াল
বা
ক্ষমতার জাল
মানুষের মুক্ত
প্রাণকে চিরকাল
বন্দি
রাখতে
পারে
না।
নাটকের
শেষে
রাজার
নিজেরই
লোহার
জাল
ছিঁড়ে
নন্দিনীর লড়াইয়ের সাথী
হওয়া
আসলে
যান্ত্রিক লোভের
ওপর
মানবিক
সুন্দরের চিরন্তন বিজয়েরই অমল
সংকেত।

No comments
"আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখে জানান। আপনার যেকোনো পরামর্শ সাদরে গৃহীত।"