সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘উজানে মৃত্যু’ নাটকে যন্ত্রণাক্ষুদ্ধ মানুষগুলোর যন্ত্রণার স্বরূপ
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘উজানে মৃত্যু’ নাটকে যন্ত্রণাক্ষুদ্ধ মানুষগুলোর যন্ত্রণার স্বরূপ
বাংলা সাহিত্যের আধুনিকমনস্ক ও জীবনঘনিষ্ঠ কথাসাহিত্যিক এবং নাট্যকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১) তাঁর লেখনীর মাধ্যমে মানুষের মনের গহিন অন্ধকার, অস্তিত্ব সংকট ও প্রথাগত সংস্কারের অসারতাকে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর সৃষ্টিকালজয়ী একাঙ্ক নাটক ‘উজানে মৃত্যু’ (১৯৬৩) বাংলা নাট্যসাহিত্যে এক বিরল ও অনন্য সৃষ্টি। নাটকটি মূলত মানুষের অবচেতনার গভীরে প্রোথিত যন্ত্রণা, অপরাধবোধ এবং অনিবার্য মৃত্যুর প্রতীকী রূপায়ন, যেখানে চিরন্তন বাস্তবতার চেয়েও অন্তর্জগতের সত্যগুলো বড় হয়ে উঠেছে।
যন্ত্রণাক্ষুদ্ধ মানুষগুলোর যন্ত্রণার প্রকৃতি:
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘উজানে মৃত্যু’ নাটকের চরিত্রগুলো কোনো নাম দ্বারা চিহ্নিত নয়। এখানে চরিত্র হিসেবে আমরা পাই একজন নৌকাবাহক, সাদা পোশাক পরিহিত এক ব্যক্তি এবং কালো পোশাক পরিহিত অন্য এক ব্যক্তিকে। এই প্রতিটি চরিত্রই এক গভীর যন্ত্রণার বাহক। নিচে এই যন্ত্রণাক্ষুদ্ধ মানুষগুলোর যন্ত্রণার স্বরূপ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
নৌকাবাহকের অস্তিত্ব রক্ষা ও নিরন্তর সংগ্রামের যন্ত্রণা:
নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র নৌকাবাহক একজন প্রান্তিক ও নিঃস্ব মানুষ। সে এক প্রতিকূল স্রোতের বিরুদ্ধে বা ‘উজানে’ নৌকা টেনে নিয়ে চলেছে। তার এই সংগ্রাম কেবল দৈহিক নয়, বরং এটি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক নিষ্ফল লড়াই। তার জীবনে সুখের লেশমাত্র নেই; তার তিন ছেলের মধ্যে দুজন বসন্ত রোগে মারা গেছে, তৃতীয় ছেলেও হারিয়ে গেছে কোনো এক অজানা কারণে। এমনকি তার পরম মমতাময়ী স্ত্রীও আজ বেঁচে নেই। তার সমস্ত জমিজমাও হারিয়ে গেছে। এই সর্বহারা মানুষটির যন্ত্রণা এতটাই তীব্র যে, সে তার যন্ত্রণাকে ভুলতে দিনরাত একটি ‘খালি নৌকা’ টেনে নিয়ে চলেছে।
নৌকাবাহকের এই অন্তহীন সংগ্রামের মর্মন্তুদ চিত্র ফুটে ওঠে যখন নাটকে বলা হয়:
“মাসে-মাসে ঘূর্ণি-হাওয়া। গত বছর তোমার তৃতীয় ছেলেটিও মরল। আদরের ছেলে, সে-ও মরল।”
এই উদ্ধৃতিটি নৌকাবাহকের জীবনের শূন্যতাকে নির্দেশ করে। তার যন্ত্রণা কেবল বস্তুগত হারানোর নয়, বরং প্রিয়জন হারানোর এক দীর্ঘশ্বাসের। সে জানে তার গন্তব্য অনিশ্চিত, তবুও সে নৌকা টেনে যায়। এই নৌকা টানা মূলত যন্ত্রণাদায়ক জীবনকে টেনে নেওয়ারই এক সার্থক রূপক।
অর্থহীন কর্ম ও গন্তব্যহীনতার যন্ত্রণা:
নৌকাবাহক যে নৌকাটি উজানে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, সেটি সম্পূর্ণ খালি। সে নিজেও জানে না এই নৌকাটি সে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। তার এই গন্তব্যহীন যাত্রা আধুনিক মানুষের ‘অ্যাবসার্ড’ বা অর্থহীন জীবনেরই প্রতিফলন। সে তার গভীরতম দুঃখের স্মৃতিগুলোকে ভুলে থাকার জন্য নিজেকে এক উদ্দেশ্যহীন শ্রমে নিয়োজিত রেখেছে। কিন্তু এই শ্রম তাকে শান্তি দেয় না, বরং এক প্রবঞ্চনাময় আশ্রয়ের দিকে ঠেলে দেয়।
নাটকটিতে নৌকাবাহকের এই মানসিক অবস্থাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে:
“সাারারাত অর্থহীনভাবে খালি নৌকা টেনেছ, তুমি জান না কেন? শোন! তোমার বুকে অনেক দুঃখ, কিন্তু তাই বলে এমন পাগলামি করবে নাকি?”
এখানে যন্ত্রণার স্বরূপটি হলো ‘আত্মপ্রবঞ্চনা’। নৌকাবাহক জানে তার এই যাত্রার কোনো অর্থ নেই, তবুও সে নিজেকে বিশ্বাস করাতে চায় যে তার কোনো গন্তব্য আছে। এই দ্বিধা এবং সত্যকে অস্বীকার করার গ্লানিই তাকে যন্ত্রণাক্ষুদ্ধ করে রাখে।
সাদা পোশাক পরিহিত ব্যক্তির বিশ্বাসের দোলাচল ও সহানুভূতি:
সাদা পোশাক পরিহিত ব্যক্তিটি নৌকাবাহকের চেতনার এক নির্মল ও শুভ্র অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। সে বিশ্বাসী এবং দয়ালু। সে নৌকাবাহকের দুর্দশা দেখে ব্যথিত হয় এবং তাকে এই যন্ত্রণাদায়ক ও অর্থহীন শ্রম থেকে মুক্তি দিতে চায়। তার যন্ত্রণা হলো অন্যের দুঃখ অনুভব করার যন্ত্রণা। সে যখন নৌকাবাহককে বিশ্রাম নিতে বলে, তখন আসলে সে মানুষের অন্তর্নিহিত সেই সত্তার কথা বলে যা শান্তি চায়। কিন্তু পরক্ষণেই কালো পোশাকধারী ব্যক্তির অবিশ্বাসের কাছে তার যুক্তিগুলো হার মেনে যায়। তার সহানুভূতি নৌকাবাহকের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে না, যা তার জন্য এক প্রকার নিষ্ফলতার যন্ত্রণা তৈরি করে।
কালো পোশাক পরিহিত ব্যক্তির সত্যদর্শন ও নিষ্ঠুর নির্লিপ্ততা:
কালো পোশাক পরিহিত ব্যক্তিটি নাটকের সবচেয়ে জটিল চরিত্র। সে সত্যদর্শী, ত্রিকালদর্শী এবং একই সাথে ঘোরতর অবিশ্বাসী। সে বিশ্বাস করে জগতে সব কিছুই অর্থহীন এবং মানুষের কর্মের সীমা সুনির্দিষ্ট। তার যন্ত্রণা হলো সত্যকে নগ্নভাবে দেখতে পাওয়ার যন্ত্রণা। সে নৌকাবাহকের জীবনের রূঢ় সত্যগুলো তার চোখের সামনে তুলে ধরে তাকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে।
কালো পোশাকধারী ব্যক্তিটি নৌকাবাহকের জীবনের একটি চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি উল্লেখ করে বলে:
“অন্য মানুষটিও শান্তিতে ডুবে মরেছিল, কারণ প্রতিবারই কোনো প্রকারে মাথা তুলতে পেরে যা সে দেখেছিল তা সে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভুলতে পারে নাই। পানির অন্ধকারেও সে দৃশ্য জ্বলজ্যান্ত থাকে।”
এখানে যন্ত্রণার স্বরূপটি হলো স্মৃতির দহন। কালো পোশাকধারী ব্যক্তি জানে যে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি নেই, এমনকি মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সেই ভয়াবহ স্মৃতিগুলো মানুষকে তাড়া করে ফেরে। এই চরিত্রটি মানুষের চেতনার সেই রূঢ় বাস্তবতাকে প্রকাশ করে, যা বিশ্বাসকে পদদলিত করে যন্ত্রণাকে চিরস্থায়ী রূপ দেয়।
অপরাধবোধ ও স্মৃতির অন্তর্দহন:
নাটকের চরিত্রগুলোর যন্ত্রণার অন্যতম প্রধান উৎস হলো অপরাধবোধ। বিশেষ করে নৌকাবাহকের মধ্যে তার অতীত জীবনের ব্যর্থতা ও প্রিয়জনদের রক্ষা করতে না পারার এক গুমরে মরা হাহাকার কাজ করে। কালো পোশাকধারী ব্যক্তির বয়ানে ফুটে ওঠে এক করুণ চিত্র—এক ক্রন্দনরত মেয়ে মানুষের বাহুতে একটি জ্বলন্ত শিক চেপে ধরার দৃশ্য। সেই মেয়েটির চোখের বিস্ময় ও চিৎকারহীন বেদনা আসলে গভীরতম দুঃখের এক প্রতীকী প্রকাশ।
নাট্যকারের ভাষায় সেই মুহূর্তের যন্ত্রণা ছিল এমন:
“গভীরতম দুঃখেও বাড়াবাড়ি করা অনুচিত। মানুষের কর্মের সীমানা পাকাপাকিভাবে টানা। সমস্তই যখন নিয়তি নির্ধারিত, তখন সব কিছুকে মেনে নেওয়াই শ্রেয়।”
এই উক্তিটি যন্ত্রণার এক চরম রূপকে নির্দেশ করে—তা হলো ‘অসহায়ত্ব’। যখন মানুষ জানে যে তার কিছুই করার নেই, তখন সেই নীরব যন্ত্রণা তার বুক ফেটে কান্না হয়ে বের হতে পারে না, বরং এক নিশ্চল ও স্থবির পাথর হয়ে হৃদয়ে চেপে বসে থাকে।
মৃত্যুভয় ও মৃত্যুর অনিভায্যতা:
উজানে মৃত্যু’ নাটকের মূল বিষয়বস্তু হলো মৃত্যু। নৌকাবাহক স্রোতের বিরুদ্ধে নৌকা বাইছে অর্থাৎ সে সময় ও বার্ধক্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। কিন্তু এই লড়াইয়ের অবসান ঘটে মৃত্যুতে। তার যন্ত্রণার স্বরূপটি কেবল বেঁচে থাকার কষ্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মৃত্যুর অবধারিত উপস্থিতিতেও নিহিত। সে বিশ্বাস করে এক অদৃশ্য শক্তি আছে যা সব কিছু চুষে নেয়—অর্থাৎ নিয়তি। এই নিয়তিবাদী মানসিকতা তাকে প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য মৃত্যুভয়ে আচ্ছন্ন করে রাখে।
নাটকের শেষে এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধি থেকে উঠে আসে:
“একমাত্র মৃত্যুই উদ্ধার, অস্তিত্বের যন্ত্রণায় শান্তির প্রলেপ দিতে পারে—একমাত্র এই মৃত্যুই।”
এই উদ্ধৃতিটি যন্ত্রণার চূড়ান্ত সমাপ্তিকে ইঙ্গিত করে। বেঁচে থাকা যখন কেবল যন্ত্রণারই নামান্তর হয়ে দাঁড়ায়, তখন মৃত্যুই হয়ে ওঠে একমাত্র কাম্য এবং পরম শান্তির আশ্রয়। নৌকাবাহকের জন্য মৃত্যু কেবল শেষ নয়, বরং তার দীর্ঘদিনের যন্ত্রণাক্লিষ্ট অস্তিত্বের এক অনিবার্য মুক্তি।
সামগ্রিক পরিবেশ ও প্রতীকের যন্ত্রণা:
নাটকটিতে ব্যবহৃত মঞ্চসজ্জা এবং শব্দগুলোও যন্ত্রণার এক এক একটি ভাষা হয়ে উঠেছে। মঞ্চে অন্ধকার, শূন্যতা এবং নৌকাবাহকের ক্রমাগত ‘হাঁপানির আওয়াজ’ যন্ত্রণার এক বিভীষিকাময় আবহ তৈরি করে। হাঁপানির এই শব্দ আসলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ানো ক্লান্ত মানুষের আকুতি। নাটকের প্রতীকি শব্দগুলো—যাত্রা, অর্থ, যন্ত্রণা, মৃত্যু—সবই এই যন্ত্রণাক্ষুদ্ধ মানসিকতার স্বরূপ ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
নাটকের সংলাপের একটি বিশেষ অংশ মানুষের অন্তিম যন্ত্রণার প্রকাশ ঘটায় এভাবে:
“নৌকাবাহক: বুঝতে পেরেছি। সেও ওই পাশবিক মানুষের মতো। তিন-দিন তিন-রাত তার চারধারে দাঁড়িয়ে আত্মীয়-স্বজনরা কেঁদেছিল এবং শেষ পর্যন্ত তার মনে হয়েছিল সবকিছুই অতি সাধারণ, সবকিছুই ঠিকঠাক আছে।”
এখানে যন্ত্রণা এক নতুন মাত্রা পায়—তা হলো ‘নির্লিপ্ততা’। যন্ত্রণার চরম সীমায় পৌঁছে মানুষ যখন আর অনুভব করতে পারে না, তখন সব কিছুই তার কাছে সাধারণ মনে হয়। এটি যন্ত্রণার এক ভয়াবহ রূপ, যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
পরিশেষে বলা যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘উজানে মৃত্যু’ নাটকের যন্ত্রণাক্ষুদ্ধ মানুষগুলো আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন চরিত্র নয়, বরং তারা পৃথিবীর প্রতিটি বিপর্যস্ত মানুষের প্রতিনিধি। নৌকাবাহকের শারীরিক পরিশ্রম, সাদা পোশাকধারীর করুণাময় আকুতি এবং কালো পোশাকধারীর রূঢ় সত্যদর্শন—এই সব কিছুর সমন্বয়ে নাট্যকার মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর ক্ষতকে উন্মোচন করেছেন। এই নাটকে যন্ত্রণা কেবল একটি অনুভূতি নয়, বরং তা মানুষের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রিয়জন হারানোর বেদনা, জীবনসংগ্রামের ক্লান্তি, অর্থহীন অস্তিত্বের গ্লানি এবং মৃত্যুর অনিবার্য হাতছানি—এই চতুষ্পার্শ্বিক যন্ত্রণার বলয়ে বন্দি হয়েই নাটকের চরিত্রগুলো তাদের যন্ত্রণাক্ষুদ্ধ মানসিকতার পরিচয় দেয়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অত্যন্ত কুশলতার সাথে দেখিয়েছেন যে, উজানে বা স্রোতের বিপরীতে মানুষের এই যাত্রা যতটা যন্ত্রণার, মৃত্যুর শীতল পরশ যেন সেই যন্ত্রণার বিপরীতে ততটাই শান্তির। এই জীবনমুখী ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের কারণেই ‘উজানে মৃত্যু’ একাঙ্ক নাটকটি বাংলা সাহিত্যে যন্ত্রণার এক সার্থক আখ্যান হিসেবে অমর হয়ে থাকবে।

No comments
"আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখে জানান। আপনার যেকোনো পরামর্শ সাদরে গৃহীত।"