শহীদুল জহিরের গল্পে পুরনো ঢাকার চালচিত্র ও চরিত্র চিত্রায়ণ
শহীদুল জহিরের গল্পে পুরনো ঢাকার চালচিত্র ও চরিত্র চিত্রায়ণ
বাংলা কথাসাহিত্যের এক অনন্য ও বিস্ময়কর কারিগর শহীদুল জহির (১৯৫৩-২০০৮)। খুব অল্প লিখেও তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে নিজের জন্য একটি স্থায়ী ও স্বতন্ত্র আসন তৈরি করে নিয়েছেন। বিশেষ করে জাদুবাস্তবতার শিল্পকৌশল ব্যবহার করে তিনি রূঢ় বাস্তবতাকে যেভাবে শৈল্পিক রূপ দিয়েছেন, তা তাকে সমকালীন অন্যান্য লেখকদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে চিনে নিতে সাহায্য করে। তাঁর গল্পগুলোতে পুরনো ঢাকার জনজীবন, অলিগলি এবং সেখানকার মানুষের বিচিত্র মনস্তত্ত্ব এক অখণ্ড শিল্পরূপ লাভ করেছে।
২০০৪ সালে প্রকাশিত ‘ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থে শহীদুল জহিরের এই বিশেষ গদ্যশৈলী ও চরিত্র নির্মাণের মুন্সিয়ানা চূড়ান্তভাবে ফুটে উঠেছে। এই গ্রন্থের অধিকাংশ গল্পের পটভূমিই হলো পুরনো ঢাকার নারিন্দা, ভূতের গলি বা দক্ষিণ মৈসুন্দীর মতো এলাকাগুলো। শহীদুল জহিরের গল্পে চরিত্ররা কেবল রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, তারা যেন এক একটি বিশেষ এলাকা বা সমষ্টিগত জীবনের প্রতিনিধি। নিচে তাঁর গল্পের পুরনো ঢাকার মেজাজ, সামাজিক পরিবেশ এবং চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ণ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
যৌথ জীবন ও কার্নিভালীয় আবহাওয়া:
শহীদুল জহিরের গল্পের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো একক কোনো নায়কের অনুপস্থিতি। তাঁর গল্পে চরিত্ররা আসে দল বেঁধে, যাকে অনেকটা মিখাইল বাখতিনের ‘কার্নিভাল’ তত্ত্বের সঙ্গে তুলনা করা যায়। পুরনো ঢাকার সমাজজীবন অত্যন্ত নিবিড় এবং সেখানে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার চেয়ে যৌথতা বড় হয়ে দেখা দেয়। মহল্লার যেকোনো ঘটনা সবার জানা থাকে এবং প্রত্যেকেই সেই ঘটনায় অংশগ্রহণ করে। ‘কোথায় পাবো তারে’ গল্পে আব্দুল করিম যখন ময়মনসিংহে যাওয়ার ঘোষণা দেয়, তখন পুরো মহল্লা যেন এক চরম উত্তেজনায় ফেটে পড়ে। মহল্লার মানুষের কাছে ময়মনসিংহে যাওয়া মানে যেন পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে মহাকাশ ভ্রমণে বের হওয়া।
এই যৌথ জীবনবোধের প্রকাশ ঘটেছে চরিত্রগুলোর সংলাপ ও প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে। একটি নির্দিষ্ট চরিত্রের কথা বলতে গিয়ে লেখক প্রায়ই ‘আমরা’ শব্দটি ব্যবহার করেন, যা মহল্লার মানুষের সম্মিলিত স্বরকে প্রকাশ করে। যেমন:
"..... পোলাটা হালার ভোদাই এবং আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, খোরশেদ আলমের এই বেকার ছেলেটার মানুষ হতে পারার আর সম্ভাবনা নাই।" (গল্পের নাম: কোথায় পাবো তারে)
এই উদ্ধৃতিটির মাধ্যমে লেখক কেবল একটি বেকার যুবকের প্রতি মহল্লার দৃষ্টিভঙ্গিই তুলে ধরেননি, বরং পুরনো ঢাকার মানুষের সরাসরি ও কিছুটা কর্কশ কিন্তু আন্তরিক বিচারবুদ্ধিকে চিত্রিত করেছেন। তাদের কাছে জীবনের সার্থকতা মানেই হলো কাজে নিয়োজিত থাকা, আর অলস বিচরণ মানেই হলো ব্যর্থতা।
পুরনো ঢাকার অলিগলি ও পরিবেশের প্রভাব:
শহীদুল জহিরের গল্পে পুরনো ঢাকার অলিগলি কেবল ভৌগোলিক অবস্থান নয়, বরং তা চরিত্রদের মনস্তত্ত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নারিন্দার ভূতের গলি বা দক্ষিণ মৈসুন্দীর সরু গলিগুলো চরিত্রদের মাঝে এক ধরনের আবদ্ধ কিন্তু নিরাপদ বোধ তৈরি করে। এই মানুষগুলো নিজেদের এলাকার বাইরে যেতে ভয় পায় বা অনীহা বোধ করে। ‘প্রথম বয়ান’ গল্পে আব্দুল রহমান ৪০ বছর আগের একটি রাস্তার বাতির খাম্বা খুঁজে বেড়ায়। এই খাম্বাটি কেবল একটি বস্তু নয়, এটি তার হারানো শৈশব এবং বদলে যাওয়া শহরের প্রতি এক ধরনের আকুলতা।
পুরনো ঢাকার পরিবেশের এক অলিখিত নিয়ম হলো—এখানে সময় যেন থেমে থাকে। মানুষগুলো অতীতের স্মৃতি হাতড়ে বর্তমানকে বোঝার চেষ্টা করে। তাদের জীবনে জাদুকরী সব ঘটনা ঘটে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে। ‘মহল্লায় বান্দর, আব্দুল হালিম এর মা এবং আমরা’ গল্পে বানরের আগমন এবং তাদের বিভিন্ন বস্তু চুরি করার ঘটনাটি মহল্লাবাসীদের কাছে এক রহস্যময় কিন্তু প্রতিদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়।
ভাষিক স্বাতন্ত্র্য ও সংলাপের জাদু:
শহীদুল জহিরের চরিত্ররা যে ভাষায় কথা বলে, তা বিশুদ্ধ প্রমিত বাংলা নয়, বরং পুরনো ঢাকার নিজস্ব ‘ঢাকাইয়া’ উপভাষা। এই ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। তাদের ভাষায় গালি বা স্ল্যাং ব্যবহারের মধ্যে এক ধরনের অবলীলা থাকে, যা তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যেরই অংশ। লেখক এই ভাষার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে পাঠকদের এক ধরনের ঘোরের মধ্যে নিয়ে যান। ‘কোথায় পাবো তারে’ গল্পে ডালপুরি খাওয়ার দৃশ্যে আব্দুল করিমের বিখ্যাত উক্তিটি এর উদাহরণ:
"ডাইলপুরির মইদ্দে ডাইল নাইকা, হুদা আলু!" (গল্পের নাম: কোথায় পাবো তারে)
এই একটি উক্তি বারবার ব্যবহারের মাধ্যমে লেখক কেবল দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির রূঢ় বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলেননি, বরং মানুষের যান্ত্রিক জীবন ও একই বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়ার ট্র্যাজেডিও ফুটিয়ে তুলেছেন। জীবনমুখী ব্যাখ্যায় এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আমরা যা প্রত্যাশা করি আর যা পাই—তার মাঝে সবসময়ই এক বিশাল ব্যবধান থেকে যায়।
রাজনৈতিক সচেতনতা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি:
শহীদুল জহিরের চরিত্ররা রাজনীতি থেকে বিচ্ছন্ন নয়। তাদের অবচেতন মনে সবসময় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ট্রমা কাজ করে। ‘ইন্দুর-বিলাই খেলা’ গল্পে লেখক পুরনো ঢাকার প্রেক্ষাপটে রাজনীতির এক ভয়াবহ রূপ দেখিয়েছেন। এখানে যুদ্ধের সময়কার রাজাকার ও মিলিটারিদের তাণ্ডব আর সাধারণ মানুষের ইঁদুরের মতো পালিয়ে বেড়ানোর দৃশ্যটি রূপকের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। যুদ্ধের সময় যারা দাপট দেখাত তারা বিড়াল আর সাধারণ মানুষ ছিল ইঁদুর। যুদ্ধের পর আবার এই সম্পর্কের পালাবদল ঘটে। চরিত্রদের মনস্তত্ত্বে এই জয়-পরাজয় ও ভীতির খেলাটি চিরস্থায়ী ছাপ রেখে যায়। একটি উদ্ধৃতি লক্ষ্য করা যাক:
"দুনিয়ায় কত ইন্দুর!" (গল্পের নাম: ইন্দুর-বিলাই খেলা)
এই ছোট বাক্যের মধ্য দিয়ে বীরাঙ্গনা খতিজা মূলত সমাজের অসহায়ত্ব এবং মানুষের স্বার্থপরতাকে বিদ্রূপ করেছেন। যুদ্ধের ক্ষত চরিত্রগুলোকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়, যা তাদের আচরণে এক ধরনের অস্বাভাবিকতা বা রহস্যময়তা তৈরি করে।
মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ণ ও স্মৃতির গোলকধাঁধা:
শহীদুল জহিরের গল্পের চরিত্ররা স্মৃতির অতীতে বিচরণ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাদের কাছে অতীত হলো এক নিরাপদ আশ্রয়। ‘প্রথম বয়ান’ গল্পে আব্দুল রহমানের খাম্বা খোঁজার বিষয়টি এক ধরনের মানসিক বিভ্রান্তি মনে হলেও আসলে এটি আধুনিক জীবনের অস্থিরতা থেকে মুক্তির এক চেষ্টা। পুরনো ঢাকার মানুষগুলো বর্তমানের যান্ত্রিকতা মেনে নিতে না পেরে বারবার নিজেদের চেনা ঐতিহ্যে ফিরে যেতে চায়।
"খুঁটার মাথায় বাতি জ্বলতো, আর আপনে অখনে কইতে পারেন না কই জ্বলতো, হুদাহুদি বিচরান!" (গল্পের নাম: প্রথম বয়ান)
এখানে আব্দুল রহমানের স্ত্রী স্বর্না বেগমের এই উক্তিটি চরিত্রদের মাঝে বিদ্যমান এক ধরনের বাস্তবতাবোধ এবং সেই সঙ্গে স্মৃতির প্রতি অবহেলার দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে। জহিরের চরিত্ররা সবসময় কিছু একটা খুঁজছে—হয়তো হারানো প্রেম, হারানো শৈশব বা হারানো দেশ।
বানর ও অন্যান্য প্রতীকের চরিত্রায়ণ:
শহীদুল জহিরের গল্পে ইতর প্রাণী বা জড় বস্তুও অনেক সময় জীবন্ত চরিত্রের মতো আচরণ করে। ‘মহল্লায় বান্দর, আব্দুল হালিম এর মা এবং আমরা’ গল্পে বানরেরা যখন আস্ত পিস্তল চুরি করে নিয়ে যায়, তখন তা চরিত্রদের মনে ভীতির উদ্রেক করে। বানর এখানে মূলত সমাজের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের এক অদ্ভুত ছদ্মবেশ। এই বানরদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে লেখক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও পেশী শক্তির আস্ফালনকে ইঙ্গিত করেছেন।
"মহল্লার নারী পুরুষ, শিশু কিশোর এবং বৃদ্ধ, সকলে, যখন যার হাতে সময় থাকে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বানর দেখে, বানরের সব কিছুই তাদের কাছে খেলা মনে হয়; কিন্তু তারা এই বানরদের আস্তানার হদিস জানতে পারেনা।" (গল্পের নাম: মহল্লায় বান্দর, আব্দুল হালিম এর মা এবং আমরা)
এই উদ্ধৃতিটি মহল্লাবাসীর উদাসীনতা এবং সংকটের মুখে তাদের নিস্পৃহতাকে দারুণভাবে তুলে ধরে। পুরনো ঢাকার মানুষরা সব কিছুকেই ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে নিজেরা দর্শক হয়ে থাকতে পছন্দ করে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি শহীদুল জহির তাঁর গল্পের চরিত্রগুলোর মাধ্যমে পুরনো ঢাকাকে এমনভাবে বিনির্মাণ করেছেন যা বিশ্বসাহিত্যের যেকোনো কালজয়ী সৃষ্টির সমকক্ষ। তাঁর গল্পে পুরনো ঢাকা কেবল একটি স্থান নয়, এটি একটি জীবন্ত সত্তা। সেখানকার ঘিঞ্জি অলিগলি, ডালপুরির দোকান, মসজিদের মিনার আর মানুষের সম্মিলিত চিৎকার সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মায়াভরা জগত তৈরি হয়। চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, তাদের ভাষার নিজস্বতা এবং স্মৃতি ও বাস্তবের মধ্যকার টানাপড়েন শহীদুল জহিরকে বাংলা ছোটগল্পের একজন প্রধান রূপকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তাঁর চরিত্র চিত্রায়ণের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—তিনি অতি সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের তুচ্ছ ঘটনাকে মহাকাব্যিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। রূঢ় বাস্তবতাকে সরাসরি না বলে জাদুবাস্তবতার আড়ালে লুকিয়ে রাখা তাঁর এই শিল্পকৌশল পাঠকদের কেবল মুগ্ধই করে না, বরং সমাজের গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্লেষণে বাধ্য করে। পুরনো ঢাকার এই যে ‘যৌথ জীবন’ এবং ‘সম্মিলিত স্মৃতি’, তা শহীদুল জহিরের কলমেই চিরস্থায়ী রূপ পেয়েছে। ‘ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থের প্রতিটি চরিত্র তাই আমাদের চারপাশের রক্ত-মাংসের মানুষের মতোই বাস্তব, আবার জাদুকরী ঘোরে আচ্ছন্ন এক অপার্থিব অস্তিত্ব।

No comments
"আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখে জানান। আপনার যেকোনো পরামর্শ সাদরে গৃহীত।"