শহীদুল জহিরের গল্পে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার স্বরূপ
শহীদুল জহিরের গল্পে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার স্বরূপ
শহীদুল জহির (১৯৫৩-২০০৮) আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের এক নিভৃতচারী অথচ অত্যন্ত প্রভাবশালী কারিগর। তাঁর সাহিত্যিক জীবন খুব দীর্ঘ না হলেও তিনি তাঁর অনন্য গদ্যশৈলী এবং গভীর সামাজিক-রাজনৈতিক সচেতনতার মাধ্যমে বাংলা গল্পে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। রূঢ় বাস্তবতাকে সরাসরি বর্ণনা না করে তিনি প্রায়শই জাদুবাস্তবতার আড়ালে সমাজের গভীর ক্ষত, রাজনৈতিক অরাজকতা এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাসকে শৈল্পিকভাবে তুলে ধরেছেন।
২০০৪ সালে প্রকাশিত ‘ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থে শহীদুল জহিরের এই জীবনদর্শন ও রাজনৈতিক ভাবনার চূড়ান্ত প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর গল্পগুলোতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, যুদ্ধকালীন ট্রমা এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয় অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ফুটে উঠেছে। শহীদুল জহির পেশায় একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় অনেক সময়ই সরাসরি রাজনৈতিক সমালোচনা করতে পারেননি, কিন্তু তিনি তাঁর শিল্পকৌশল ব্যবহার করে রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনা ও সমাজের অসংগতিকে পাঠকদের সামনে উন্মোচিত করেছেন। নিচে তাঁর গল্পে প্রতিফলিত সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
মুক্তিযুদ্ধ: দীর্ঘস্থায়ী ট্রমা ও ইতিহাসের ক্ষত:
শহীদুল জহিরের গল্পে মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি বিজয়গাথা নয়, বরং এটি চরিত্রগুলোর মনে গভীর এক ক্ষত হিসেবে বিদ্যমান। তাঁর অনেক গল্পে একাত্তরের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো স্মৃতির মলাটে ফিরে ফিরে আসে। ‘মহল্লায় বান্দর, আব্দুল হালিম এর মা এবং আমরা’ গল্পে আমরা দেখি, বর্তমান সময়ের বর্ণনার মাঝে হঠাৎ করেই একাত্তরের ২৫শে মার্চের সেই ভয়াবহ রাত এবং পরবর্তী সময়ে জিঞ্জিরার গণহত্যার প্রসঙ্গ চলে আসে। লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে সাধারণ মানুষ প্রাণ বাঁচাতে নদী পার হয়ে অজানা আশ্রয়ের দিকে ছুটেছিল। আব্দুল হালিমের যুদ্ধের স্মৃতি এবং তার করুণ মৃত্যু যেন সেই সময়ের অসংখ্য নামহীন শহীদেরই প্রতিনিধি। তার অকাল মৃত্যুর পর মা আমেনা বেগমের সেই আকুল বিলাপ যেন আজো মহল্লার বাতাসে এক চিরন্তন হাহাকার হয়ে ভেসে বেড়ায়:
"দুনিয়ায় কত ইন্দুর!" (ইন্দুর-বিলাই খেলা)
এই ছোট অথচ গভীর উক্তিটির মাধ্যমে বীরাঙ্গনা খতিজা মূলত যুদ্ধের সময়কার মানুষের অসহায়ত্ব এবং পরবর্তী সময়ে সমাজের স্বার্থপরতাকে বিদ্রূপ করেছেন। যুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষ ইঁদুরের মতো পালিয়ে বেড়িয়েছে, কিন্তু যুদ্ধ শেষ হলেও সেই মানসিক বন্দিদশা থেকে তারা মুক্তি পায়নি। জহির এখানে বোঝাতে চেয়েছেন যে, স্বাধীনতার পরেও সাধারণ মানুষ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির চাপে ইঁদুরের মতোই গর্তে বাস করছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতির অবক্ষয় ও পেশী শক্তির আস্ফালন:
শহীদুল জহির তাঁর গল্পে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির যে চিত্র এঁকেছেন, তা অত্যন্ত রূঢ় ও হতাশাজনক। মুক্তিযুদ্ধের যে আদর্শবাদী চেতনা নিয়ে মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যুদ্ধোত্তর সময়ে তার বিচ্যুতি তাঁকে ব্যথিত করেছে। তাঁর গল্পে দেখা যায়, যুদ্ধের পর রাজাকাররা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে অথবা নতুন নতুন গুন্ডা ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের আবির্ভাব ঘটছে যারা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখে।
‘ইন্দুর-বিলাই খেলা’ গল্পে হুমু এবং জহুর নামক দুই ভাই মহল্লায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিরীহ আলতাফ আলীকে ‘ইন্দুর’ ঘোষণা করে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে হত্যা করে ম্যানহলে ফেলে দেয়। এই ঘটনাটি মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং পেশী শক্তির আস্ফালনকে ইঙ্গিত করে। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি মিলিটারি যে ভীতির পরিবেশ তৈরি করেছিল, স্বাধীন দেশে সেই একই পরিবেশ তৈরি করছে রাজনৈতিক নামধারী কিছু দুষ্কৃতিকারী।
সামাজিক অস্থিরতা ও সাধারণ মানুষের সংগ্রাম:
জহিরের গল্পে সমকালীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দৈন্য ও সামাজিক অস্থিরতাও অত্যন্ত প্রকট। ‘কোথায় পাবো তারে’ গল্পে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এক নিদারুণ বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। এই গল্পের নায়ক আব্দুল করিমের ডালপুরি খাওয়ার দৃশ্যটি বারবার ফিরে আসে এবং প্রতিবারই একটি বিশেষ সংলাপ শোনা যায়:
"ডাইলপুরির মইদ্দে ডাইল নাইকা, হুদা আলু!" (কোথায় পাবো তারে)
এটি কেবল একটি খাবারের বর্ণনা নয়, বরং এটি তৎকালীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ব্যবসায়ীদের প্রতারণার প্রতি একটি তীব্র স্যাটায়ার। ডালের দাম বেড়ে যাওয়ায় ডালপুরিতে ডাল নেই—এই সাধারণ সত্যটি আমাদের অর্থনৈতিক সংকটের গভীরতাকে প্রকাশ করে। সাধারণ মানুষ যা আশা করে আর বাস্তবে যা পায়, তার মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান, আব্দুল করিমের এই উক্তিটি সেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যেরই স্মারক।
নারীর ওপর সামাজিক ও রাজনৈতিক নিষ্পেষণ:
শহীদুল জহিরের গল্পে নারীর ওপর সামাজিক ও রাজনৈতিক নিষ্পেষণের চিত্র অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ‘আমাদের বকুল’ গল্পে জাদুবাস্তবতার এক চরম রূপ দেখা যায় যখন বকুলকে লাল পিঁপড়েরা খেয়ে ফেলে। বকুল যখন তার হারানো মা ফাতেমার স্মৃতি হাতড়ে বিচিকলার ঝোপের কাছে যায়, তখন লাল পিঁপড়ারা তাকে আক্রমণ করে। গল্পের শেষ দৃশ্যে দেখা যায়:
"সুহাসিনীর লাল পিঁপড়া বকুলকে খেয়ে যায়।" (আমাদের বকুল)
আক্ষরিক অর্থে এটি অসম্ভব মনে হলেও, এর অন্তর্নিহিত লক্ষ্য হলো সমাজের ক্ষমতাবানদের দ্বারা সাধারণ নারী ও দুস্থদের নিষ্পেষণকে প্রতিকায়িত করা। এখানে লাল পিঁপড়ারা মূলত শোষক শ্রেণি বা ধর্ষকদের প্রতীক, যারা সাধারণ মানুষের সম্পদ ও জীবনকে হরণ করে। আকালুর স্ত্রী ফাতেমার অন্তর্ধান এবং বকুলের এই পরিণতি একই সূত্রে গাঁথা—যা সমাজের বিচারহীনতা ও নারীর নিরাপত্তাহীনতার এক নগ্ন রূপ।
ভোটের রাজনীতি ও সংখ্যালঘু সংকট:
নৈতিক অবক্ষয় ও মোহভঙ্গ:
শহীদুল জহিরের গল্পে মানুষের যে মোহভঙ্গের চিত্র পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত গভীর। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, স্বাধীনতার পর তা ধূলিসাৎ হতে দেখে মানুষের মনে এক ধরনের নিস্পৃহতা ও ক্লান্তি চলে আসে। ‘প্রথম বয়ান’ গল্পে আব্দুল রহমান ৪০ বছর আগের একটি বাতির খাম্বা খুঁজে বেড়ায়। এটি মূলত তার শৈশব এবং একাত্তর-পূর্ববর্তী সেই চেনা সমাজকে খোঁজার এক নিষ্ফল চেষ্টা। বর্তমানের অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সহ্য করতে না পেরে চরিত্রগুলো স্মৃতির অতীতে আশ্রয় নিতে চায়।
সমাজের উচ্চবিত্ত বা ক্ষমতাবানদের উদাসীনতাও জহির তাঁর গল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘মহল্লায় বান্দর, আব্দুল হালিম এর মা এবং আমরা’ গল্পে বানরেরা যখন আস্ত পিস্তল চুরি করে নিয়ে যায়, তখন মহল্লার মানুষের প্রতিক্রিয়া হয় অত্যন্ত নির্বিকার। তারা যেন ভুলেই গেছে যে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি তাদের জীবনের জন্য কতটা হুমকি স্বরূপ। এই উদাসীনতা মূলত নৈতিক অবক্ষয়েরই ফল।
পরিশেষে বলা যায়, শহীদুল জহির তাঁর গল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির এক নিখুঁত ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তাঁর গল্পে মুক্তিযুদ্ধ কোনো মৃত ইতিহাস নয়, বরং তা বর্তমানের অস্থিরতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি অনুভব করেছিলেন যে, বর্তমান অরাজকতা থেকে মুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনায় ফিরে যাওয়া প্রয়োজন। তাঁর ‘ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থের প্রতিটি আখ্যানই মূলত সাধারণ মানুষের যন্ত্রণার দলিল।
জাদুবাস্তবতার আড়ালে লুকিয়ে রাখা তাঁর এই রাজনৈতিক প্রতিবাদ পাঠকদের কেবল ভাবায় না, বরং সমাজের গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্লেষণে বাধ্য করে। শহীদুল জহির আমাদের দেখিয়েছেন যে, অবাস্তব বর্ণনাই অনেক সময় চরম বাস্তবতার রূঢ়তম রূপ হয়ে ধরা দিতে পারে। তাঁর সাহিত্য তাই কেবল সময়ের গল্প নয়, বরং তা কালজয়ী এক প্রতিবাদের ভাষা যা অন্যায়, শোষণ ও অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে নিরন্তর উচ্চারিত হতে থাকে।



No comments
"আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখে জানান। আপনার যেকোনো পরামর্শ সাদরে গৃহীত।"