ads

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসের উপজীব্য বিষয়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসের উপজীব্য বিষয়

বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮–১৯৫৬) এক অনন্য ও বিস্ময়কর নাম। তিনি মূলত মানুষের জীবনকে অতি-বাস্তবতার নিরিখে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং অবদমিত কামনার জটাজাল ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে সাহিত্যের উপজীব্য করে তুলেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে একদিকে যেমন মার্কসীয় সমাজচেতনা মূর্ত হয়েছে, অন্যদিকে ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বের প্রয়োগও সমানভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। ‘চতুষ্কোণ’ (১৯৪২) উপন্যাসটি তাঁর শিল্পসৃষ্টির এমন এক পর্যায়কে নির্দেশ করে যেখানে তিনি মানুষের চেতনার গহিন অন্ধকারের বিশ্লেষণ করেছেন অত্যন্ত নির্মম ও নির্মোহভাবে।

‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসের উপজীব্য বিষয় মূলত মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব, আত্ম-অন্বেষণ এবং তত্ত্বনির্ভর জীবনদর্শনের সাথে রূঢ় বাস্তবতার সংঘাত। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রাজকুমার নিজের জীবনকে একটি মনস্তাত্ত্বিক গবেষণাগারে পরিণত করেছে। সে সমাজ ও সম্পর্কের প্রচলিত সংজ্ঞাকে ভেঙে নিজের মনগড়া তত্ত্ব দিয়ে মানুষকে বিচার করতে চায়। এই বিচার প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চারজন নারী—রিনি, মালতী, সরসী ও কালী। এই চারজন নারী রাজকুমারের জীবনের 'চতুষ্কোণ' বা চারকোণা পরিমণ্ডল তৈরি করেছে, যা শেষ পর্যন্ত তাকে এক ভয়ংকর ও নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

উপন্যাসের শুরুতেই আমরা দেখি রাজকুমার তার চারপাশের মানুষদের, বিশেষ করে নারীদের মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ করছে। সে মনে করে মানুষের প্রতিটি আচরণের পেছনে কোনো এক গূঢ় রহস্য লুকানো থাকে। এই অতিরিক্ত বুদ্ধিজীবিতা বা তত্ত্বের প্রতি আসক্তি তাকে সাধারণ আবেগ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই প্রসঙ্গে উপন্যাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি হলো—

“নিজের অতিরিক্ত পাকা মন নিয়া জগতের সহজ সরল মানুষগুলিকে বিচার করিতে গিয়া হয়তো আরো কতবার সে এমনি অবিচার করিয়াছে। নিজের মনের আলোতে পরের সমালোচনা সত্যই ভালো নয়।”

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এখানে রাজকুমারের চরিত্রের মাধ্যমে এক ধরনের আত্ম-আলোকে দর্পণের সামনে দাঁড় করিয়েছেন। রাজকুমার তার নিজের প্রখর মেধা ও 'পাকা মন' দিয়ে অন্যদের বিচার করে, কিন্তু সেই বিচার অধিকাংশ সময়ই ভ্রমাত্মক হয়। জীবনমুখী ব্যাখ্যায় বলা যায়, আমরা যখন আমাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি বা তত্ত্বের চশমা দিয়ে অন্যকে বিচার করতে যাই, তখন প্রায়শই মানুষের প্রকৃত আবেগ ও সত্যকে আড়াল করে ফেলি। রাজকুমারের এই তথাকথিত মনস্তাত্ত্বিক বিচার আসলে এক ধরনের মানসিক অবিচার, যা তাকে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

উপন্যাসের ‘চতুষ্কোণ’ রূপকটি চরিত্রগুলোর অবস্থানের মাধ্যমে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। রিনি হচ্ছে আধুনিক ও বুদ্ধিমতী নারী, যার সাথে রাজকুমারের সম্পর্কের টানাপোড়েন তাকে চরম মানসিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। মালতী রাজকুমারের ছাত্রী, যে চঞ্চল ও সরস প্রকৃতির হলেও রাজকুমারের তত্ত্বের ফাঁদে পড়ে মানসিকভাবে পর্যুদস্ত হয়। সরসী হচ্ছে এক স্থির ও পরিণত নারী চরিত্র, যে রাজকুমারকে গভীরভাবে বুঝত এবং শেষ পর্যন্ত তার পাশে থেকেছে। আর কালী হচ্ছে সহজ-সরল গ্রাম্য মেয়ে, যাকে রাজকুমার তার মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। সমাজের এই বিচিত্র রূপ ও মানুষের ভেতরের রূপান্তর সম্পর্কে লেখক বলেন—

“এমন একটা বিকৃত আবেষ্টনীর মধ্যে তারা মানুষ হইয়াছে যে, অস্বাভাবিক মিথ্যা অসংযমকেই তারা স্বাভাবিক সত্য বলিয়া জানিতে শিখিয়াছে। মানুষ কেবল পরের নয়, নিজেরও সংযমে বিশ্বাস করে না।”

এই উদ্ধৃতিটি মধ্যবিত্ত সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও ভণ্ডামিকে নির্দেশ করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখাতে চেয়েছেন যে, সমাজব্যবস্থা যখন বিকৃত হয়ে পড়ে, তখন মানুষ তার ভেতরের স্বাভাবিক মানবিকতা ও সংযম হারিয়ে ফেলে। রাজকুমার ও তার চারপাশের চরিত্রগুলো এমন এক কৃত্রিম পরিবেশে বেড়ে উঠেছে যেখানে সত্যের চেয়ে মিথ্যা বেশি গ্রহণযোগ্য। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই অসংযম ও অবিশ্বাসের বাতাবরণ চরিত্রগুলোকে এক ধরনের অস্থিরতার মধ্যে বন্দি করে রাখে।

রাজকুমারের তত্ত্বনির্ভর জীবনের এক বড় সংকট হলো ভাষার অর্থ এবং মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। সে যখন কালীর সাথে কথা বলে বা তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে, তখন সে অনুভব করে যে শব্দের অর্থ স্থান-কাল-পাত্রভেদে বদলে যায়। উপন্যাসের একটি জায়গায় বলা হয়েছে—

“শব্দের মানে তারাই ঠিক করে, যে বলে আর যে শোনে। কাজ ও উদ্দেশ্য বেলাতেও তাই। কী ব্যাপক মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা!”

অর্থ্যাৎ, মানুষের যোগাযোগ বা সংলাপ কেবল শব্দের ওপর নির্ভর করে না, বরং সেই শব্দের পেছনের মনস্তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে। মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এখানে এক অদ্ভুত রূপ পেয়েছে—সে তার নিজের মতো করে সত্য নির্মাণ করে। জীবনমুখী প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত সত্য যে, আমরা একেকজন মানুষের কাছে একেকভাবে নিজেকে উপস্থাপন করি এবং আমাদের কথাগুলোও একেকজনের কানে একেক রকম অর্থ বহন করে। রাজকুমার এই স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে মানুষের মন নিয়ে খেলা করতে চেয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত তাকে আত্মগ্লানির দিকে নিয়ে যায়।

উপন্যাসের একটি কেন্দ্রীয় সংকট তৈরি হয় যখন রাজকুমার কালীর ওপর তার মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা চালায়। সে কালীর হৃৎস্পন্দন পরীক্ষা করার ছলে তার শরীরী সান্নিধ্যে আসে, যা কালীর মনে এক ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। রাজকুমার নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইলেও তার মনের এক কোণে অপরাধবোধ কাজ করতে থাকে। সে ভাবে—

“মনে তার পাপ নাই? - না থাক। পুণ্যের জন্যও অনেক কাজ সংসারে করা যায় না।”

এই উদ্ধৃতিটি রাজকুমারের অন্তর্গত দ্বন্দ্বের এক চমৎকার প্রকাশ। সাহিত্যিক দৃষ্টিতে এটি নৈতিকতার এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করে। রাজকুমারের হয়তো কোনো কুমতলব ছিল না, সে কেবল তার ‘থিওরি’ যাচাই করতে চেয়েছিল। কিন্তু মানবিক সম্পর্কে কেবল উদ্দেশ্যই যথেষ্ট নয়, কাজের ফলাফলও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব জীবনে অনেক সময় আমরা ভালো করতে গিয়েও অন্যের ক্ষতি করে ফেলি, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের ওপর পাপ বা গ্লানি হিসেবে ফিরে আসে। রাজকুমারের এই উপলব্ধিই তাকে তত্ত্বের জগৎ থেকে বাস্তবের মাটিতে আছড়ে ফেলে।

উপন্যাসের চারজন নারী চরিত্রের মধ্যে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা বিদ্যমান ছিল। প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব উপায়ে রাজকুমারকে পেতে চেয়েছিল। কিন্তু রাজকুমার কাউকেই প্রকৃত অর্থে ভালোবাসতে পারেনি, কারণ সে ভালোবাসা বলতে বুঝত কেবল মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ। রিনির চরম পরিণতি অর্থাৎ তার পাগল হয়ে যাওয়ার ঘটনা রাজকুমারের সামনে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দেয়। রাজকুমার বুঝতে পারে যে, তার তত্ত্ব আসলে প্রাণহীন। সরসী তাকে এই সত্য বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং বলে—

“ভালবাসার কোন ধরা বাঁধা লক্ষণ নেই রাজু।”

এই ছোট বাক্যটির মধ্য দিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ভালোবাসার বিশালতা ও রহস্যকে তুলে ধরেছেন। ভালোবাসা কোনো বৈজ্ঞানিক সূত্র বা মনস্তাত্ত্বিক সংজ্ঞায় বন্দি নয়। রাজকুমার যে সংজ্ঞায় জীবনকে বাঁধতে চেয়েছিল, ভালোবাসা তার বাইরে এক অবাধ প্রবাহ। জীবনমুখী দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা যায়, আমরা যখন আমাদের প্রিয়জনদের যুক্তি বা লক্ষণের ভিত্তিতে বিচার করতে যাই, তখন ভালোবাসার মূল নির্যাসটি হারিয়ে ফেলি। রাজকুমার রিনির উন্মাদনার মধ্য দিয়ে জীবনের সেই অনিয়ন্ত্রিত রূপটি দেখতে পায়।

চরিত্রগুলোর এই টানাপোড়েন এবং সম্পর্কের চতুর্ভুজাকার রূপায়ণ উপন্যাসের নামকরণকে সার্থকতা দান করেছে। রাজকুমার তার ঘরের চার দেয়ালের মতো মানসিক এক চতুষ্কোণে বন্দি ছিল। কালী, মালতী, সরসী ও রিনি—এই চারজন ছিল তার সেই বন্দি জগতের চারকোণা। কিন্তু রিনির মৃত্যু বা তার অপ্রকৃতিস্থ হওয়া রাজকুমারের সেই সাজানো বাগান তছনছ করে দেয়। উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে রাজকুমার এক নতুন মানুষের অবয়বে আবির্ভূত হয়, যেখানে সে তত্ত্বের চেয়ে মানুষের অস্তিত্বকে বেশি গুরুত্ব দিতে শেখে। উপন্যাসের শেষ পঙ্ক্তিটি এই আলোচনার এক অবিস্মরণীয় উপসংহার—

“জীবন তো খেলার জিনিস নয় মানুষের।”

এই একটি বাক্যের মধ্যেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সমস্ত জীবনদর্শন ঢেলে দিয়েছেন। রাজকুমার জীবনকে কেবল একটি গবেষণার বিষয় বা ছেলেমানুশি হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু রিনির ট্র্যাজেডি তাকে শিখিয়ে দেয় যে, জীবন অত্যন্ত পবিত্র এবং গুরুতর এক দায়িত্বের নাম। সাহিত্যিক বিচারে এটি এক কালজয়ী উক্তি, যা পাঠককে জীবনের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। জীবনমুখী ব্যাখ্যায় বলা যায়, আমরা যখন অন্যের অনুভূতি বা নিজের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলি, তখন আমরা ভুলে যাই যে এর প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। রাজকুমারের এই উপলব্ধিই তাকে শেষ পর্যন্ত একজন সত্যিকারের ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলে।

পরিশেষে বলা যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চতুষ্কোণ’ কেবল রাজকুমারের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের গল্প নয়, বরং এটি আমাদের সমাজের প্রতিটি মানুষের অন্তরের দর্পণ। তত্ত্বের আড়ালে আমরা যে কতটুকু মানুষ আর কতটুকু অমানুষ, মানিক তা রাজকুমারের আয়নায় আমাদের দেখিয়েছেন। মধ্যবিত্ত জীবনের অবদমন, নৈতিক সংকট এবং তত্ত্বের চেয়েও জীবনের ঊর্ধ্বে থাকার যে ধ্রুব সত্য, তাই এই উপন্যাসের সার্থকতা। ‘চতুষ্কোণ’ আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মানুষকে সূত্র দিয়ে নয়, বরং সহমর্মিতা ও ভালোবাসা দিয়ে বুঝতে হয়, কারণ জীবন কোনো গবেষণাগার নয়—এটি এক বিশাল প্রবহমান অভিজ্ঞতা।

No comments

"আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখে জানান। আপনার যেকোনো পরামর্শ সাদরে গৃহীত।"

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.