হিংস্র হায়না চারিপাশে - জুয়েল রানা
হিংস্র হায়না চারিপাশে
--- জুয়েল রানা
সময়টা বড্ড পরীক্ষা নিচ্ছে
কঠিন থেকে কঠিন হচ্ছে পরিস্থিতি,
চারিদিক থেকে ভেসে আসা বোকামির পঁচা গন্ধ
জীবনটাকে বিষিয়ে তুলছে একেবারে।
চারিদিক থেকে ভেসে আসা বোকামির পঁচা গন্ধ
জীবনটাকে বিষিয়ে তুলছে একেবারে।
একদণ্ড বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস নেয়ার ইচ্ছা
মন মস্তিষ্ক তেতিয়ে তুলছে ঢের,
কিন্তু সেই সুযোগটা আসছে কই?
চারিপাশে ছড়িয়ে থাকা বেঈমান হায়না গুলো,
প্রতি মুহূর্তে খাবলে খাচ্ছে আমার কাঁচা মাংস,
ক্ষত বিক্ষত করছে আমার মন, মস্তিষ্ক আর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ।
মন মস্তিষ্ক তেতিয়ে তুলছে ঢের,
কিন্তু সেই সুযোগটা আসছে কই?
চারিপাশে ছড়িয়ে থাকা বেঈমান হায়না গুলো,
প্রতি মুহূর্তে খাবলে খাচ্ছে আমার কাঁচা মাংস,
ক্ষত বিক্ষত করছে আমার মন, মস্তিষ্ক আর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ।
আমার বোকা কর্মকাণ্ডে,
হায়না জাতিটাকে লজ্জায় ফেলে যে জাতি
হিংস্র জানোয়ার কূলের শ্রেষ্ঠত্ব ধারণ করলো
সেই অমানুষগুলো বার বার খাবলে খাচ্ছে আমায়।
প্রতিটা মুহূর্তে বয়ে বেড়ানো তীব্র বোকামির ফল
ভারী, বড্ড ভারী করে তুলেছে আমার পরিবেশ।
সেই ভারী হয়ে ওঠা পরিবেশটা প্রতিমুহূর্তে
মৃত্যুকূপে ঠেলে দিচ্ছে আমায়।
বায়ুমণ্ডলে ভেসে বেড়ানো সেই হায়নাদের বাক্য বিষ
আরও ভারী করে তুলছে মাথাটা,
সেই ভারী মাথায় ঘুমটাও ঘন হয় গেছে ঢের।
মৃত্যুকূপে ঠেলে দিচ্ছে আমায়।
বায়ুমণ্ডলে ভেসে বেড়ানো সেই হায়নাদের বাক্য বিষ
আরও ভারী করে তুলছে মাথাটা,
সেই ভারী মাথায় ঘুমটাও ঘন হয় গেছে ঢের।
চারিদিক থেকে ভেসে আসা বোকা গন্ধে
নাকের ছিদ্রটা বিষিয়ে উঠেছে আপনি থেকে।
চোখের পাপড়িগুলোও নুইয়ে পড়ছে নিজে থেকেই।
না আর পেরে উঠছি না
বাহ্যিকতা কেমন আবছা হয়ে গেছে,
নিজেকে মানাতে পারছি না আর
এই পৃথিবীর জল, বায়ু আর নিশ্বাসের সাথে।
না আর পেরে উঠছি না, এই হায়নাদের সাথে
নুইয়ে আসা পাপড়িগুলো বুঝি বন্ধ হবে চিরতরে
বায়ুতে মিশে থাকা হায়নাগুলোর বিষময় নিশ্বাস
আমি আর নিতে পারছি না।
আমার পাঁজরের ভিতরের আটকে থাকা ফুসফুসটা
এই তীব্র বিষের যন্ত্রণাটা সইতে চাইছে না আর।
থাক, এই পৃথিবীটা ঐ হায়নাদেরই থাক
ভরে উঠুক এর প্রতিটা কোণ, ওদের তীব্র হুংকারে
ওরা খাবলে থাক আমার মত বোকা মানুষটারে!
আর আমার পরে থাকা হাড়গুলো উপহাস করুক
পৃথিবীর সকল বিশ্বাসী বোকা মানুষটা রে।
কিছু কথা:
কবিতাটির মূলভাব হলো মানবসমাজের ছদ্মবেশী নিষ্ঠুরতা, মানসিক যন্ত্রণা এবং আস্থার সংকট। কবি এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন যেখানে চারপাশে সমাজ বা মানুষের বেঈমানি এবং বিষাক্ত আচরণ তাকে নিষ্পেষিত করছে। নিজের সরলতা বা বোকামির সুযোগ নিয়ে যখন অমানুষিক আচরণ করা হয়, তখন বেঁচে থাকার ইচ্ছা এবং মানসিক শক্তি কীভাবে ধসে পড়ে—তা-ই এই কবিতার মূল উপজীব্য।
কবিতাটিতে কবি একাধিক তীব্র রূপক ও চমৎকার ভাব ফুটিয়ে তুলেছেন:
এখানে 'হায়না' কোনো বন্য প্রাণী নয়, বরং সমাজের হিংস্র, বেঈমান ও সুযোগসন্ধানী মানুষদের রূপক। হায়না যেমন মৃত বা দুর্বল প্রাণীকে খাবলে খায়, তেমনি এই মানুষেরাও কবির মন-মানসিকতাকে ক্ষত-বিক্ষত করছে।
কবির শরীর বা মাংস খাবলে খাওয়ার কথাটি শারীরিক আঘাত বোঝায় না; এটি শারীরিক ও মানসিক শোষণের এবং ব্যক্তিত্বকে ধ্বংস করার তীব্র প্রতীকী প্রকাশ।
চারপাশের মানুষদের কটু কথা, গালিগালাজ বা অপবাদকে কবি ‘বাক্য বিষ’ এবং বোকামি ও কপটতাকে ‘পঁচা গন্ধ’ বলেছেন। এটি ফুসফুস ও শ্বাসনালীকে বিষিয়ে তুলছে বলে কবি একটি শারীরিক অনুভূতির রূপক তৈরি করেছেন।
চোখের পাপড়ি বন্ধ হয়ে আসা বা নুইয়ে পড়া বলতে কবি রূপক অর্থে জীবনের ইতি টানা বা চিরনিদ্রার (মৃত্যুর) কথা বুঝিয়েছেন।
কবিতার শেষ চরণে কবির হাড়গুলোর উপহাস করার কথাটি একটি গভীর রূপক। এর মাধ্যমে কবি বলতে চেয়েছেন, এই পৃথিবীতে অন্ধভাবে মানুষকে বিশ্বাস করার পরিণতি কতটা করুণ হতে পারে, তা যেন তার পড়ে থাকা অবশেষগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সতর্ক করে।
কবিতাটি মুক্ত ছন্দে (Free Verse) রচিত। কোনো নির্দিষ্ট অন্ত্যমিল না থাকলেও ভাবের তীব্রতা ও শব্দচয়নের কারণে কবিতাটিতে একটি নিজস্ব অভ্যন্তরীণ লয় (Internal Rhythm) তৈরি হয়েছে।
কবিতাটি বিশ্লেষণে আমরা পাই শুরুতেই, ক্লান্তি ও চারপাশের প্রতিকূল পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভের সূচনা, মধ্যভাগে মানসিক যন্ত্রণার চরম সীমায় পৌঁছানো এবং শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি এবং শেষভাগে পরাজয় মেনে নিয়ে করুণ সুর এবং সমাজের ওপর এক ধরনের চরম ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য।
সবমিলিয়ে, এটি একটি অত্যন্ত আবেগঘন, হতাশাপূর্ণ কিন্তু প্রতিবাদী ভাবনার কবিতা। বাহ্যিক পৃথিবীর সাথে মানিয়ে নিতে না পারা একজন ভেঙে পড়া মানুষের মনের আকুতি ও মানসিক আত্মহননের পরিস্থিতিকে কবি রূপক ও স্পষ্ট শব্দ চয়নের মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলেছেন।


No comments
"আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখে জানান। আপনার যেকোনো পরামর্শ সাদরে গৃহীত।"