ads

একটি হৃদয়ের বদলে যাওয়া । The Turning of a Heart

একটি হৃদয়ের বদলে যাওয়া 

এস এম হানিফ

নায়লার জানালার বাইরের শহরটা কখনোই যেন ঘুমাতো না। অ্যাম্বার রঙের স্ট্রিটলাইট, দূর থেকে ভেসে আসা মধ্যরাতের গাড়ির শব্দ আর ভেজা রাস্তায় প্রতিফলিত নিয়ন চিহ্নের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ ছিল সেই শহর। নায়লার ছোট, আধুনিক অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে একমাত্র আলো ছিল তার হাতের মুঠোয় থাকা ওই ছোট আয়তাকার পর্দাটি। তার আঙুলগুলো এক যান্ত্রিক ছন্দে পর্দার ওপর নড়াচড়া করছিলঅন্যদের সাজানো জীবন আর কৃত্রিম মুহূর্তগুলোর এক অন্তহীন স্রোতের মধ্য দিয়ে সে স্ক্রল করে যাচ্ছিল।

নায়লা ছিল এই জগতেরই একটি অংশএকটি দ্রুতগতির ডিজিটাল মহানগর, যেখানে 'দৃশ্যমান হওয়া' বা সবার নজরে থাকাই ছিল সবচেয়ে বড় সার্থকতা। তার সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলটি ছিল তার বহির্মুখী স্বভাবের এক জীবন্ত প্রমাণ। তাকে প্রায়ই চঞ্চল এবং মিশুক হিসেবে বর্ণনা করা হতো; এমন একজন নারী যে জানত কীভাবে কমেন্ট বক্সে আলোচনার ঝড় তুলতে হয় এবং কীভাবে 'লাইক' সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু আজ রাতে, সেই নীল আলোটা তার ক্লান্ত চোখের ওপর খুব কঠোর মনে হচ্ছিল। যে স্বীকৃতি সে সবসময় খুঁজে বেড়াত, আজ তা হাতের মুঠোর বালির মতো মনে হচ্ছিলযা আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে গিয়ে কেবল একরাশ শূন্যতা রেখে যায়।

সে তার সর্বশেষ পোস্টটির দিকে তাকালআজ দুপুরে বন্ধুদের সাথে কফি খেতে যাওয়ার একটি ছবি। ছবিতে সে প্রাণ খুলে হাসছিল, তার মাথাটা একপাশে হেলানো, এবং তার উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত মনোযোগ আকর্ষণকারী। সেই সময় সে মুহূর্তের উত্তেজনা অনুভব করেছিল; বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সাথে সাধারণ আড্ডা দেওয়াটা তাদের বন্ধু মহলে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল যে একে সে ভুল মনে করেনি। কিন্তু এখন, ঘরের নিস্তব্ধতায় এক ভারী উপলব্ধি তার বুকের ওপর জেঁকে বসল। তার মনে হলো সে অত্যন্ত মূল্যবান কিছু হারিয়ে ফেলছে, যা একান্তই তার নিজস্ব এবং অভ্যন্তরীণ। সে দুনিয়ার তুচ্ছ আনন্দের বিনিময়ে নিজের 'হায়া' বা লজ্জাশীলতাকে বিক্রি করে দিচ্ছিল, অথচ এই উপভোগ ছিল এক মরীচিকা যা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।

হঠাৎ তার নজর গেল বুকশেলফের কোণে পড়ে থাকা ধুলোবালি মাখা একটি ডায়েরির দিকে। এটি তার মা তাকে কয়েক বছর আগে উপহার দিয়েছিলেন, যা এতদিন অবহেলায় পড়ে ছিল। ডায়েরিটি হাতে নিতেই প্রথম পাতায় মায়ের হাতের লেখা ভেসে উঠল: "লজ্জাশীলতা বা হায়া হলো মুমিনের অলঙ্কার।" কৌতূহলবশত সে ভেতরে পড়তে শুরু করল। সেখানে লেখা ছিল, "একজন মুসলিম নারীর বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত লাজুক বিনয়ী"- যা তাকে এক অবহেলিত সত্য মনে করিয়ে দিল: "একজন মুসলিম নারীর বৈশিষ্ট্য বহির্মুখী, চঞ্চল বা মনোযোগ আকর্ষণকারী হওয়া উচিত নয়; বরং তার হওয়া উচিত পরিমিতিবোধ সম্পন্ন বা লজ্জাশীল"  জানালার কাঁচে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে নায়লার মনে হলো, সে এক অচেনা মানুষকে দেখছে; তার হায়াঈমানের সেই সুন্দর শাখা যা তার সম্মানের ঢাল হওয়া উচিত ছিলতা যেন আজ খুব জীর্ণ এবং ফিকে হয়ে গেছে।

জানালার কাঁচে বৃষ্টির মৃদু শব্দ শুরু হলোএকটি ছন্দময় আওয়াজ যা তার দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দের সাথে মিলে যাচ্ছিল। নায়লা তার ফোনটি টেবিলের ওপর উপুড় করে রাখল। হঠাৎ ঘরের এই নিস্তব্ধতা যেন তার কানে বাজছিল। দীর্ঘ সময় ধরে সে এই শূন্যতাকে গান, আড্ডা আর ফোনের নোটিফিকেশনের শব্দ দিয়ে পূর্ণ করে রেখেছিল। সেও যেন তাদের একজন হয়ে গিয়েছিল যারা দ্বীনকে নিছক খেলা কৌতুক হিসেবে গ্রহণ করে এবং পার্থিব জীবনের মোহে প্রতারিত হয়।

সে রান্নাঘরের দিকে হেঁটে গেল, কাঠের মেঝের ওপর তার পায়ের শব্দ ছিল খুব মৃদু। সে কেটলিটা চুলায় দিল। ফুটন্ত পানির শোঁ শোঁ শব্দ তাকে সামান্য স্বস্তি দিচ্ছিল। অপেক্ষা করতে করতে সে তার বন্ধুদের কথা ভাবল। তার সার্কেল বা বন্ধু মহল এমন মানুষদের নিয়ে গঠিত ছিল যারা কেবল বাহ্যিক জৌলুসকে মূল্য দিত। তারা সবসময় তাকে আরও বেশি 'সামাজিক' হতে, আরও বেশি সবার সামনে আসতে এবং ধর্মীয় 'সীমাবদ্ধতা' কমিয়ে আনতে প্ররোচনা দিত। যদিও তারা তার প্রিয় বন্ধু ছিল, কিন্তু সে বুঝতে পারল তারা তার আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য কল্যাণকর ছিল না।

সে ভাবলো: "একা থাকা মানে হলো খারাপ সঙ্গ এড়িয়ে চলা" সে যদি আল্লাহর সাথে থাকে, তবে সে একা হয় কীভাবে? কেটলির বাঁশি বেজে উঠল, যা তার এলোমেলো চিন্তার সাথে এক বৈপরীত্য তৈরি করল। সে চায়ের কাপে গরম পানি ঢালল, আর ক্যামোমাইলের ঘ্রাণ বাষ্পের সাথে ছড়িয়ে পড়ল।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে সে নিজেকে নিয়ে ভাবতে লাগল। তার দ্বীনি জ্ঞান হয়তো ছিল, কিন্তু সে কি তার আচরণের মাধ্যমে সেই জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটাতে পারছিল? সমাজ তার পোশাক এবং আচরণের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছিল, কিন্তু সে জানত যে নিজেকে বিনয়ী রাখতে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত নজর থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হলে তাকে দুনিয়ার এই ফাঁদে পা দেওয়া বন্ধ করতে হবে তার হৃদয়টা আজ খুব ভারী মনে হচ্ছিল, ঠিক যেন এক অবহেলিত বাগান, যেখানে ঈমানের ফুলগুলো যত্নের অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে

ঘড়িতে তখন রাত ৩টা। বৃষ্টির বেগ বেড়েছে, যেন শহরের ধুলোবালি ধুয়ে পরিষ্কার করে দেওয়ার জন্য এক অবিরাম ধারা। ডায়েরির কথাগুলো তার মনের গভীরে এক প্রবল আলোড়ন তৈরি করল। এতদিন সে এই শূন্যতাকে গানের শব্দ আর নোটিফিকেশন দিয়ে ঢেকে রেখেছিল। নায়লা তার মনের গভীরে এক টান অনুভব করলনিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি তার যে আকর্ষণ ছিল বা সে যেসব সীমারেখা লঙ্ঘন করেছিল, তার জন্য এক গভীর লজ্জা তাকে গ্রাস করল। সে উপলব্ধি করল এই লজ্জা বা সংকোচ অনুভব করাই হলো তার হৃদয়ে হায়া এবং ঈমান অবশিষ্ট থাকার লক্ষণ।

সে ওযু করল, শীতল পানি যেন তার শরীরে এবং আত্মায় এক পবিত্র পরশ বুলিয়ে দিল। পানির প্রতিটি ফোঁটা যেন তার সেই 'স্মার্ট' বা আধুনিক মুখোশটিকে ধুয়ে দিচ্ছিল, যা সে দুনিয়ার মানুষের জন্য পরেছিল। সে ঘরের এক কোণে জায়নামাজ বিছিয়ে দিল, পায়ের নিচে নরম কাপড়ের স্পর্শ তাকে প্রশান্তি দিল।

তাহাজ্জুদের এই নিস্তব্ধতায় নায়লা মাথা নত করল। তার মনে প্রতিধ্বনিত হলো: "নিশ্চয়ই হায়া (লজ্জাশীলতা) এবং ঈমান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদি একটি হারিয়ে যায়, তবে অন্যটিও হারিয়ে যায়" সে বুঝতে পারল সে এতদিন হায়া ছাড়াই ঈমানকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছিল, যা ছিল অসম্ভব।

"ইয়া আল্লাহ," সে অন্ধকারের মাঝে ফিসফিস করে বলল, তার কণ্ঠস্বর তখন কাঁপছিল। "আমি কোলাহলের মাঝে পথ হারিয়ে ফেলেছি। আমি এমন মানুষের কাছে স্বীকৃতি খুঁজেছি যারা আমার আত্মাকে চেনে না, আর আপনাকে অবহেলা করেছি যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি আপনার কাছে ফিরে আসতে চাই। আমি 'সবার জন্য সহজলভ্য' হয়ে থাকতে ক্লান্ত। আমি এমন কিছু হতে চাই যা আপনি যার জন্য লিখে রেখেছেন সে ছাড়া আর কেউ পাবে না"

সে দীর্ঘ সময় ধরে চোখের জলে দুআ করল। তার বন্ধুদের ত্যাগ করার শক্তি চাইল, যদিও তা ছিল খুব কঠিন। সে চাইল তার হায়া যেন আবার ফিরে আসেশুধু পোশাকে নয়, বরং তার কথায়, কাজে এবং তার প্রতিটি চিন্তায়। সে এমন একটি হৃদয়ের জন্য প্রার্থনা করল যা হবে বিশুদ্ধ এবং লোকদেখানো 'লাইক' পাওয়ার ভণ্ডামি থেকে মুক্ত

পরের দিন সকালটা অন্যরকম মনে হলো। বৃষ্টি থেমে গেছে, বাতাস ছিল খুব সতেজ এবং নির্মল। নায়লা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটি নরম চারকোল রঙের রেশমি হিজাব হাতে নিল। দীর্ঘদিন ধরে সে হিজাবকে কেবল একটি ফ্যাশন বা সাজসজ্জার অনুষঙ্গ হিসেবে পরেছিল যা তার পোশাকের সাথে মানানসই হয়। হঠাৎ এক অদ্ভুত শূন্যতা তাকে গ্রাস করল। বছরের পর বছর 'লাইক' আর 'কমেন্টের' ওপর যে আত্মমর্যাদা সে তৈরি করেছিল, তা হঠাৎ ছেড়ে দেওয়াটা ছিল ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হিজাবটি মাথায় জড়ানোর পর সে এক অদ্ভুত মর্যাদা অনুভব করল  

অভ্যাসবশত সে ব্যাগ থেকে ফোনটা হাতে নিল। অবচেতন মন থেকে পুরনো অভ্যাসটি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। হিজাবে নিজেকে কেমন লাগছে তা দেখার জন্য ক্যামেরা ওপেন করল। একটা পারফেক্ট অ্যাঙ্গেল খুঁজে পেল, সে হিজাব পরা অবস্থায় একটি সেলফি তুলল। মনে মনে সে ভাবল, "সবাইকে দেখালে কি খুব ক্ষতি হবে? অন্তত জানুক যে আমি বদলে গেছি।"   আবার ভাবল, "সবাইকে দেখানোর দরকার নেই, জাস্ট ক্লোজ ফ্রেন্ডদের জন্য একটা স্টোরি দিলেই তো হয়" এক তীব্র দ্বান্দ্বিকতা তাকে ঘিরে ধরলো। তার আঙুলটা 'আপলোড' বাটনের ওপর থমকে রইল। কিন্তু পরক্ষণেই গত রাতের কান্নার কথা মনে পড়ল। সে বুঝতে পারল, প্রশংসার এই নেশাই তাকে এতদিন রিক্ত করেছিল- এই ভ্যালিডেশন খোঁজার নেশাই তো তাকে শূন্য করে দিয়েছিল। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ফোনটা নামিয়ে রাখল। এটি ছিল তার ভেতরের এক নীরব লড়াইয়ের শুরু- তার আত্মিক লড়াইয়ের প্রথম বিজয়। সে আয়নায় হিজাবটির দিকে নীরব চোখে অনেকটা সময় ধরে আনমনে চেয়ে থাকলো।

তার মনে পড়ল এই কাপড়ের টুকরোটি আল্লাহর দেওয়া একটি মুকুট, যা তার মূল্য এবং তার দ্বীনের পরিচয় বহন করে এটি ছিল সম্মানের এক শক্তিশালী ঢাল, যা তাকে পরপুরুষের লোলুপ দৃষ্টি এবং সবসময় অন্যের নজরে থাকার ক্লান্তি থেকে রক্ষা করে। সে যখন যত্ন করে এটি মাথায় জড়াল, তখন সে এক অদ্ভুত মর্যাদা অনুভব করল যা সে বছরের পর বছর অনুভব করেনি। আজ সে কোনো 'দর্শক' বা 'অডিয়েন্সের' জন্য সাজেনি; সে সেজেছে নিজের সম্মান এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।

সে যখন বাইরে পা রাখল, শহরটাকে আগের চেয়েও কোলাহলপূর্ণ মনে হলো, কিন্তু তার নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত স্থিরতা কাজ করছিল। সে অভ্যাসবশত ফোনের দিকে হাত বাড়াল কোনো আপডেট দেওয়ার জন্য, কিন্তু পরক্ষণেই থেমে গেল। "তোমার এবং তোমার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে যত কম মানুষ জানবে, তা তোমার সম্মান খ্যাতির জন্য ততই মঙ্গলজনক," ডায়েরির এই উপদেশ তার মনে পড়ল সে ফোনটা ব্যাগে রেখে দিল। ব্যক্তিগত বা আড়ালে থাকার যে শান্তি, তা সে অবশেষে অনুভব করতে শুরু করল।

সেদিন বন্ধুদের সাথে তার একটি গেট-টুগেদারে যেতে হলো। ক্যাফেতে তার পুরনো বন্ধুরা যখন ফ্যাশন আর পরনিন্দা নিয়ে ব্যস্ত, নায়লা তখন তার চারকোল হিজাব আর শান্ত ব্যক্তিত্ব নিয়ে একপাশে বসে ছিল। তার খুব ইচ্ছা করছিল সেই চপল নায়লা হয়ে আড্ডায় যোগ দিতে। কিন্তু সে চুপ রইল, কেবল তখনই কথা বলল যখন ভালো বা অর্থবহ কিছু বলার ছিল।

সে আগের মতো চপলতা দেখাচ্ছিল না বা সেলফি তুলছিল না। নায়লার এই পরিবর্তন তার বন্ধুদের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য ছিল না। 

তার এক বন্ধু হেসে বলল, "নায়লা, আজ তুমি এত চুপচাপ কেন? আমাদের সেই মজার নায়লা কোথায় হারিয়ে গেল?"

নায়লা মৃদু হাসল, তার হৃদয় তখন শান্ত। "আমি আসলে একটু সচেতন থাকার চেষ্টা করছি," সে শান্তভাবে বলল। 

তার এক বন্ধু তাচ্ছিল্য করে বলে উঠল, "কী ব্যাপার নায়লা, হঠাৎ এমন সন্ন্যাসিনী হয়ে গেলি যে! তোর সেই স্মার্টনেস সব কোথায় গেল? দিন দিন তো একদম ব্যাকডেটেড হয়ে যাচ্ছিস" 

পুরনো নায়লা হলে হয়তো রেগে গিয়ে ঝগড়া করত। কিন্তু এখন সে মৃদু হাসল, তার কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাসের ছোঁয়া। সে শান্তভাবে বলল, "তোদের কাছে যেটা ব্যাকডেটেড মনে হচ্ছে, আমার কাছে সেটাই এখন স্বস্তির জায়গা। আমি এতদিন অন্যের চোখের প্রশংসার জন্য বেঁচেছি, এখন নিজের প্রশান্তির জন্য বাঁচতে চাইছি" তার এই বিনয়ী কিন্তু দৃঢ় অবস্থান বন্ধুদের চুপ করিয়ে দিল। সে নিজের সীমানা নির্ধারণ করে দিল, যা প্রমাণ করল তার পরিবর্তন কেবল পোশাকে নয়, বরং তার আত্মিক শক্তিতে এসেছে সে জানত যে সে যদি তাদের প্রকৃত বন্ধু হয়, তবে তার উচিত হয় তাদের উপদেশ দেওয়া অথবা তাদের জন্য দুআ করা সে বুঝতে পারল যারা দ্বীনকে নিয়ে উপহাস করে, তাদের সঙ্গ ত্যাগ না করলে সে নিজেও তাদের মতো হয়ে যেতে পারে

এই পরিবর্তন মোটেও সহজ ছিল না। পরবর্তী সময়গুলোতে তার পুরনো বন্ধুদের আমন্ত্রণের সংখ্যা কমতে শুরু করল, কারণ সে আর আগের মতো সবার মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করত না। কিছু সন্ধ্যা এমন আসত যখন সে একাকীত্ব অনুভব করত, সেই সব মানুষের জন্য মায়া লাগত যাদের সে একসময় খুব কাছের ভাবত।

পরের কয়েক সপ্তাহ ছিল নায়লার জন্য অত্যন্ত কঠিন। প্রতিবার যখন কোনো নোটিফিকেশন বাজত, তার হাতটা ফোনের দিকে যেতে চাইত। বন্ধুদের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের ছবি দেখে তার ভেতরে এক ধরণের একাকীত্ব কাজ করত সে ধীরে ধীরে তার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপগুলো ফোন থেকে সরাতে শুরু করল।

সে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখল: "নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যা কিছু ত্যাগ করবো, আল্লাহ আমাকে তার চেয়েও উত্তম কিছু দান করবেন"

 

সে স্থানীয় একটি লার্নিং সেন্টারে শিশুদের পড়ানোর কাজ নিল। সেখানে তার পরিচয় হলো মরিয়মের সাথে- যার অমায়িক ব্যবহার তার প্রতিটি কাজে ফুটে উঠতশিশুদের সাথে মমতাভরা কথা বলা থেকে শুরু করে তার মার্জিত চলাফেরা পর্যন্ত। একদিন একটি ছোট শিশু রাগের মাথায় মরিয়মের প্রিয় একটি ফুলদানি ভেঙে ফেলে তাকে খুব কটু কথা বলল। নায়লা ভেবেছিল মরিয়ম হয়তো চিৎকার করবে, কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখল মরিয়ম একটি গভীর শ্বাস নিল, তার চেহারায় রাগের কোনো চিহ্ন নেই। সে হাঁটু গেড়ে বসে বাচ্চাটার সমান উচ্চতায় আসলো এবং অত্যন্ত শান্ত মমতাময় কণ্ঠে তাকে জড়িয়ে ধরল এবং মমতাভরা স্বরে কথা বলে তাকে শান্ত করল। পরিস্থিতিটা সে এমনভাবে সামাল দিল যে বাচ্চাটি নিজেই লজ্জিত হয়ে কাঁদতে শুরু করল।

দূর থেকে দাঁড়িয়ে নায়লা বুঝতে পারল, সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেকে জাহির করে যে সম্মান পাওয়া যায়, তার চেয়ে রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে এমন বিনয়ী লজ্জাশীল আচরণ করাটা কত বেশি মর্যাদাপূর্ণ। নায়লা শিখল, আস্টিন প্রদর্শন নয়, বরং নিজের আবেগ আর রাগকে নিয়ন্ত্রণ করাই হলো প্রকৃত হায়া চরিত্রের সৌন্দর্য

নায়লার হৃদয়ে এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। এটাই ছিল সেই "উত্তম কিছু" যা আল্লাহ তাকে দিয়েছেন। মরিয়মের মাঝে সে একজন সত্যিকারের বন্ধু খুঁজে পেল। তাদের ভালো থাকার জন্য কোনো 'লাইক' বা ডিজিটাল দর্শকের প্রয়োজন ছিল না; তাদের তৃপ্তি আসত তাদের অভিন্ন বিশ্বাস এবং একে অপরের পবিত্র সাহচর্য থেকে।

কয়েক মাস কেটে গেছে। শরতের বৃষ্টি এখন শীতের তুষারপাতে রূপ নিয়েছে, শহরটা যেন সাদা এক নীরব চাদরে ঢাকা পড়েছে। নায়লা কোলে একটি হাদিসের বই নিয়ে জানালার পাশে বসে আছে। তার ফোন থেকে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপগুলো অনেক আগেই মুছে ফেলা হয়েছে, বন্ধুদের অনেকের সাথে যোগাযোগ কমে গেছে, যার জায়গা নিয়েছে বর্তমান মুহূর্তের উপস্থিতি আর আত্মোপলব্ধি। তার মনে কোনো আক্ষেপ নেই।

সে তার যাত্রার কথা ভাবলনিজের হায়ার অভাব উপলব্ধি করার সেই কষ্টকর মুহূর্ত, দুআর সেই কান্নাভেজা রাতগুলো, আর সেই পুরনো নিজেকে ছেড়ে আসার সাহস যা দুনিয়া পছন্দ করত কিন্তু তার আত্মা ঘৃণা করত। সে এখন তার অন্তরে এক গভীর প্রশান্তি অনুভব করে, যা কেবল তাদের জন্যই বরাদ্দ যারা প্রকৃত কল্যাণের জন্য চেষ্টা করে।

এখন আর সমাজের মাপকাঠিতে 'আধুনিক' হওয়ার কোনো প্রয়োজন সে বোধ করে না। সে বুঝেছে তার 'হায়া' হলো তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, যা তার পোশাক থেকে শুরু করে কথা কাজসবকিছুকেই পরিমার্জিত করে দিয়েছে সে নিজের জিহ্বাকে মিথ্যা থেকে, চোখকে খেয়ানত থেকে এবং আত্মাকে মুনাফিকি থেকে রক্ষা করতে শিখেছে

ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতে নিতে সে এক অপার শান্তি অনুভব করল। জানালার বাইরের শহরটা হয়তো এখনো আগের মতোই ব্যস্ত, কোলাহলপূর্ণ এবং ভুল পথে স্বীকৃতি খুঁজে ফিরছে। কিন্তু তার ঘরের ভেতরে, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার হৃদয়ের ভেতরে, এখন এক অবিচল বিশ্বাস আর স্থিরতা বিরাজ করছে। সে জানে এই পার্থিব জীবন কেবল এক ধোঁকা বা মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই নয়।

সে চোখ বন্ধ করল, নিজের শান্ত নিঃশ্বাসের শব্দই এখন তার জন্য যথেষ্ট। তার হায়া এখন আর কোনো বোঝা বা সীমাবদ্ধতা নয়; বরং এটিই তার মর্যাদা, তার সম্মান এবং নিজের সত্তায় ফিরে আসার একমাত্র পথ। আর সে যখন প্রশান্তির ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছিল, তখন সে জানত যেসে অবশেষে নিজের ঠিকানায় পৌঁছাতে পেরেছে। 

গল্পটির ইংরেজি ভার্সন শুনতে এই ভিডিওটি দেখার অনুরোধ রইল

S M A Hanif

No comments

"আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখে জানান। আপনার যেকোনো পরামর্শ সাদরে গৃহীত।"

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.