সারিতা নাস্-এর কবিতা এবং কিছু কথা

সারিতা নাস্ এর কবিতা
- কিফারাহ্
আমার বুকের রক্তে নাও বেয়ে
ও মাঝি, তুমি কতদূর যাবে?
লোহিত সাগর ফুরাবে
আমি ফুরাব না।
এ গল্পের প্রতিটি বর্ণ
আমার অশ্রুসিক্ত ফুল,
ভুলে কিংবা ছলে তুমি পা মাড়িয়ে গেলে
হয়ত কিছুই হবেনা কারো।
কিন্তু দীর্ঘশ্বাস?
তুমি হিসেব মেলাতে পারবে না।
তুমি পারবে না আর কোনদিন
প্রেয়সীর চোখে চোখ রেখে দু-দন্ড স্বস্তি খুঁজে নিতে।
পারবে না কোনদিন
একরাত শান্তির ঘুমে নিষ্পাপ বোধে বিশুদ্ধ হতে।
পাপ তোমায় ছুঁয়েছে,
আমি ছাড়া তোমায় মুক্তি দেবে কে?
তুমি পারবে না আর কোনদিন
নির্ভাবনায় চুম্বনে ডুবে যেতে,
তোমার ঠোঁটের বিষে তুমি নীল হবে
দিন-কে দিন......
পারবে না আর সসম্মানে প্রেমিকার বুকে
ওম খুঁজে নিতে।
আয়না তোমার কারাগার,
স্পর্শ জিঞ্জির!
তোমার আঙুলের ডগা আজীবন নিশপিশ করবে
না লেখা চিঠির হাহাকারে।
নিস্তব্ধ আকাশ, সূর্যাস্ত সন্ধ্যা,
আবেদনময়ী নারী কিংবা দামি বইয়ের পাতা
কিছুই তোমাকে আর কোনদিননিখাদ তৃপ্তি দেবেনা।
হাতের তালুতে খুনের দাগ আর
কাঁধে মৃত শালিকের পাহাড়-ভারি লাশ নিয়ে
ক্রমাগত বৃদ্ধ হয়ো যৌবনের তামাটে খোলসে।
তুমি বিম্বিসার অশোকের ধুসর জগতে সহস্র জন্ম
ঘুরেও পাবেনা সমুদ্র সফেন,
পাবেনা পাখির নীড়।
তুমি বনলতার বুক চিড়েছ ভোঁতা কুঠারের কোপে।
আজীবন ঘুরপাক খেয়ো জিদ আর অহংয়ের
দুষ্টচক্র খোপে।
![]() |
| To Know More About Sarita |
যেদিন পৃথিবী ভেঙেচুরে তুলার মতো উড়বে পাহাড়,
নীলতিমি হয়ে যাবে পিঁপড়ের আহার।
সেদিন ধ্বসে যাবে আকাশের মিনার,
যেদিন তুমি আমি নেহাৎই কংকাল,
প্রশ্নের অপেক্ষায় সূর্য মাথায় নিয়ে
শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে।
আমি মাফ করবো না তোমায়।
আমি সৃষ্টিকর্তার পায়ে লুটিয়ে বলে দেব
কত বেশি পদাঘাত করেছ
আমার বুকে,
বলে দেব তোমার বিনয়ের খোলসের আড়ে
কত তীব্র, কত নিষ্ঠুর হৃদয় বসত করে।
বলব, "হে প্রভু, গুনে দেখো আমার মস্তিষ্কে কত সহস্র পেরেক গাঁথা!"
দেখো, আমি সরে গেছি,
উড়ে গেছি, উবে গেছি
কর্পূর-সম।
আসব না আর,
ডাকব না আর কোনদিন।
তোমার শ্রবনে আমার কোন ঠাঁই ছিল না,
আমি কোন উত্তর পাইনি।
আকাশের পানে চোখ তুলে বলছি,
"তোমার দৃষ্টি উজ্জ্বলতর হোক,
শ্রবন তীক্ষ্ম হোক,
শানিত হোক জীবনের বেগ।
ভোঁতা হোক অনুভূতি,
বধির হোক হৃৎপিণ্ড
আর অন্ধ হোক প্রেমাংশু আবেগ।"
তুমি সাহারা হও,
সাইমুম হও।
হে বৃষ্টিহীন মেঘ,
ভালোবাসার রাজ্যে কাঙাল হয়ে যাও।
শ্রাবণে কিংবা শরতের খামে তোমার জন্য
কোন চিরকুট না থাক।
তুমি হও বিশুষ্ক ডাকবাক্স।
সারাটা জীবন ধরে কাগজ আর দলিলের সাপ
তোমার কন্ঠ পেঁচিয়ে ধরুক,
অর্থহীন হোক কড়কড়ে অর্থের আওয়াজ।
একটা বিশাল রাজত্ব থাক আর
তুমি হও নিঃসঙ্গ একনায়ক।
পৃথিবীর আদালতে তুমি মহান,
দেখা হবে অন্য কোথাও।
কোন কোনখানে।
আমার গল্প না হয় খুব সহজে
চুকেবুকে গেল।
হয়ত পূণ্যের পাহাড় গড়ে
অভিশাপের পাঁচিল টপকে তুমি বাল্মিকী হবে।
কিন্তু কিফারাহ্?
প্রতি বিন্দুর হিসেব চুকিয়ে,
ও মাঝি, তুমি কতদূর যাবে?
কিছু কথা
সারিতা নাস্-এর ‘কিফারাহ্’ কেবল একটি কবিতা নয়, বরং এটি হৃদয়ের এক গভীর রক্তক্ষরণ থেকে জন্ম নেওয়া এক অবিনাশী কাব্যিক চিৎকার। প্রেমের নামে প্রাপ্ত প্রতারণা, অবহেলা এবং মানসিক আঘাতের পর মানুষের ভেতরের যে আত্মিক রূপান্তর ঘটে, কবি তার এক অনবদ্য ও নির্মম চিত্র এঁকেছেন এই কবিতায়। শিরোনাম ‘কিফারাহ্’ শব্দটি নিজেই এই কাব্যের আত্মা বহন করছে—যার অর্থ পাপের ক্ষতিপূরণ বা প্রায়শ্চিত্ত বা পাপের দায় থেকে নিজেকে মুক্ত করা । কবিতাটি পড়তে পড়তে মনে হয়, পাঠক কোনো সাধারণ পদ্য পড়ছেন না, বরং ভালোবাসার আদালতে দাঁড়িয়ে এক অপরাধীর আত্মিক শাস্তির রায় শুনছেন।
কবিতার শুরুতেই এক গভীর হাহাকার ও আত্মমর্যাদার সুর ধ্বনিত হয়। কবিতার শুরুতেই দেখা যায়, কবি নিজের বুকের রক্ত দিয়ে গড়া তরী তথা অনুভূতির ওপর দিয়ে মাঝিকে চলতে দেখছেন। কবির আবেগ ও অশ্রুসিক্ত স্মৃতিগুলোকে অবজ্ঞা করে চলে যাওয়ার পরিণাম হিসেবে তিনি এক দীর্ঘশ্বাসের ইঙ্গিত দিয়েছেন, যার হিসাব মেলাতে মাঝি ব্যর্থ হবে। যখন কবি লেখেন—
“আমার বুকের রক্তে নাও বেয়ে
ও মাঝি, তুমি কতদূর যাবে?
লোহিত সাগর ফুরাবে
আমি ফুরাব না”
—তখনই বোঝা যায়, এই আঘাত কোনো সাময়িক কষ্ট নয়, এটি এক চিরন্তন ক্ষতের সূচনা। মাঝিরূপী প্রেমিক হয়তো নদীর কূলে গিয়ে পৌঁছাতে পারবে, কিন্তু কবির এই আত্মাহুতির রক্তস্রোত ও অশ্রুসিক্ত স্মৃতি সে কোনোদিন পার হতে পারবে না। ভুল বা ছলে তাকে মাড়িয়ে যাওয়া হয়তো সহজ ছিল, কিন্তু সেই অবহেলার ফলে জন্ম নেওয়া দীর্ঘশ্বাসের হিসেব মেলাতে গিয়ে সে যে আজীবন নিজের ভেতরেই এক বন্দী হয়ে থাকবে, কবি তা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উচ্চারণ করেছেন।
কবির শব্দ চয়ন ও রূপক ব্যবহারের দক্ষতা এই কবিতাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। জীবনানন্দীয় কাব্যবোধের ছোঁয়া নিয়ে তিনি যখন বলেন—
“তুমি বিম্বিসার অশোকের ধুসর জগতে সহস্র জন্ম
ঘুরেও পাবে না সমুদ্র সফেন,
পাবে না পাখির নীড়।
তুমি বনলতার বুক চিড়েছ ভোঁতা কুঠারের কোপে”
—তখন কেবল অনুভূতির নির্মম প্রকাশ ঘটে না, বরং সৃষ্টি হয় এক অতুলনীয় বিষাদময় সৌন্দর্য। ভালোবাসার অতি সূক্ষ্ম ও পবিত্রতম স্থানটিকে কতখানি নির্মমভাবে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে, এই ‘ভোঁতা কুঠার’-এর রূপকটি তা নিপুণভাবে বুঝিয়ে দেয়। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে কবি তাকে কোনো শারীরিক যন্ত্রণা দেননি, বরং তার আত্মাকে এনে দাঁড় করিয়েছেন এক অনুশোচনার আয়নায়।বিশ্বাসঘাতকতার কারণে মাঝি আর কোনোদিন তার বর্তমান প্রেয়সীর চোখে স্বস্তি খুঁজে পাবে না বা শান্তিতে ঘুমাতে পারবে না। তার জীবন এক বিষাক্ত অপরাধবোধে নীল হয়ে যাবে। কবির মতে, আয়না তার জন্য কারাগার হয়ে দাঁড়াবে এবং প্রতিটি স্পর্শ তাকে জিঞ্জিরের মতো বেঁধে ফেলবে। প্রকৃতির সৌন্দর্য বা দামি বইয়ের পাতা—কিছুই তাকে আর প্রকৃত তৃপ্তি দিতে পারবে না।
এই লেখার সবচেয়ে চমৎকার দিক হলো জাগতিক বিচারকে অতিক্রম করে এক ঐশ্বরিক বিচারে উপনীত হওয়া। পৃথিবীর চোখে হয়তো প্রতারক প্রেমিক নির্দোষ, হয়তো সামাজিক আদালতে সে সফল ও মহান। কিন্তু পরম বিচারের দিন যখন সবকিছু ধসে পড়বে, তখন কবির ক্ষোভ রূপান্তরিত হবে এক অবিনাশী বিচারে।
“আমি মাফ করব না তোমায়
আমি সৃষ্টিকর্তার পায়ে লুটিয়ে বলে দেব
কত বেশি পদাঘাত করেছ আমার বুকে”
কিংবা, যখন কবি বলেন- হে প্রভু, গুনে দেখো আমার মস্তিষ্কে কত সহস্র পেরেক গাঁথা!"
—এই লাইনগুলোয় ক্ষমা না করার যে অটল সিদ্ধান্ত প্রকাশ পেয়েছে, তা কোনো কুৎসিত প্রতিহিংসা নয়, বরং নিখাদ সত্য ও প্রাপ্ত আঘাতের এক চরম সত্যতা।
কবিতার শেষভাগে এসে কবির প্রার্থনাগুলো এক নীরব ও নিভৃত নিঃসঙ্গতার রূপ নেয়। কবি তাকে মৃত্যুর প্রার্থনা দেননি, বরং চেয়েছেন সে বেঁচে থাকুক তার সমস্ত বৈভব, অর্থ ও সামর্থ্য নিয়ে, কিন্তু তার আত্মাটি যেন চিরতরে নির্জন ও ভালোবাসা-শূন্য হয়ে যায়।
“একটা বিশাল রাজত্ব থাক আর
তুমি হও নিঃসঙ্গ একনায়ক”
—এই উচ্চারণটি এতটাই নিখুঁত যে, এটি পাঠককে এক অদ্ভুত স্তব্ধতায় এনে দাঁড় করায়। একটি মানুষের সব থেকেও কিছু না থাকার যে পরম হাহাকার, তাকে এর চেয়ে সুন্দর কাব্যিক ভাষায় আর প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
সর্বোপরি, সারিতা নাস্-এর এই কবিতাটি পাঠককে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। কবিতার প্রতিটি শব্দের ভাঁজে যেমন অভিমানের বিষ জড়িয়ে আছে, তেমনই আছে এক রাজকীয় গম্ভীরতা। আঘাত পেয়েও নিজের আত্মাকে নিঃশেষ হতে না দিয়ে, সেই বেদনাটাকে কীভাবে এক রাজকীয় শক্তিতে রূপান্তর করা যায়, ‘কিফারাহ্’ তারই এক অনন্য সাহিত্যিক দলিল। এটি পড়ার পর পাঠকের মনে দীর্ঘক্ষণ এক বিষাদময় তৃপ্তির সুর বাজতে থাকে, যা কেবল খাঁটি সাহিত্যের স্পর্শেই পাওয়া সম্ভব।
পরিশেষে, কবিতায় কবির রূপকের অসাধারণ ব্যবহার নিয়ে আলাদা করে কিছু কথা না বললেই নয় এবং সেটি বলেই আজকের আলোচনাটি শেষ করতে চাই।

No comments