ads

নকশি কাঁথার মাঠ: লোকজ নাট্যের এক অনন্য দৃশ্যকাব্য | Nakshi Kanthar Math Analysis

লোকজ নাট্যের অনুষঙ্গে হৃদ্য 'নকশি কাঁথার মাঠ'

জসীম উদ্দীন (১৯০৩১৯৭৬) বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী অপ্রতিদ্বন্দ্বী পল্লীকবি, যিনি বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধ আর সাধারণ মানুষের হৃদস্পন্দনকে কবিতার ছন্দে অসামান্য নিপুণতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর সৃষ্টিকর্ম কেবল কাব্যিক সুষমাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বাংলার পল্লী জীবনের এক গভীর সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। নকশি কাঁথার মাঠ (১৯২৯) তাঁর শ্রেষ্ঠ কাহিনিকাব্য হিসেবে স্বীকৃত, যা লোকজীবনের প্রাত্যহিক অনুষঙ্গ আর প্রেম-বিরহের করুণ রসকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় এই গ্রন্থটি গ্রামীণ বাংলার লোকসংস্কৃতির প্রতিনিধি হিসেবে আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে।

নকশি কাঁথার মাঠ মূলত একটি আখ্যানকাব্য হলেও এর পরতে পরতে লোকজ নাট্যের অসাধারণ উপাদান মিশে আছে। নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনেরদ্বৈতাদ্বৈতবাদী তত্ত্বঅনুযায়ী, সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা যেমন গল্প, কবিতা বা নাটকের মধ্যে এক ধরনের নিবিড় আন্তঃসম্পর্ক বিদ্যমান। জসীম উদ্দীনের এই কাব্যেও আমরা সেই নাট্যগুণের বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাই। প্রাচীন মধ্যযুগের সাহিত্যে যেমন কবিতা পাঠের মাধ্যমে এক ধরনেরপারফর্মিং আর্টবা উপস্থাপনা শিল্প গড়ে উঠত, নকশি কাঁথার মাঠ ঠিক তেমনি এক দৃশ্যকাব্য হিসেবে পাঠক বা শ্রোতার সামনে উদ্ভাসিত হয়। এই কাব্যের প্রতিটি পরিচ্ছেদ বা সর্গ যেন একেকটি নাট্যদৃশ্য, যেখানে চরিত্রায়ন, সংলাপ এবং ঘটনার ঘনঘটা পাঠককে এক গ্রামীণ নাট্যমঞ্চের স্বাদ দেয়।

কাব্যের নায়ক রূপাইয়ের পরিচয় দেওয়ার সময় কবি তাকে গ্রামীণ সংস্কৃতির এক প্রতিভাবান শিল্পী হিসেবে চিত্রিত করেছেন। রূপাই কেবল একজন দক্ষ কৃষকই নয়, সে একাধারে জারি গান লাঠি খেলায় পারদর্শী এক বীর। তার দৈহিক সৌন্দর্য বীরত্ব লোকনাট্যের নায়কের মতোই বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

"আখড়াতে তার বাঁশের লাঠি অনেক মানে মানী,

খেলার দলে তারে নিয়েই সবার টানাটানি।

জারীর গানে তাহার গলা ওঠে সবার আগে,

'শাল-সুন্দী-বেত' যেন , সকল কাজেই লাগে।" (দুই পরিচ্ছেদ)

উপরিউক্ত উদ্ধৃতিতে রূপাইয়ের যে রূপটি ফুটে উঠেছে, তা বাংলার লোকজ বীরের প্রতিচ্ছবি। এখানে 'শাল-সুন্দী-বেত' উপমাটির মাধ্যমে তার সর্বগুণান্বিত চরিত্রটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। লোকনাট্যে যেমন নায়কের অসাধারণ দক্ষতা দর্শকদের মুগ্ধ করে, রূপাইয়ের লাঠি খেলা জারি গানের পারদর্শিতাও তাকে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। এটি কেবল তার দৈহিক বর্ণনা নয়, বরং তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বীরত্বেরই এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ।

আবার নায়িকার রূপ বর্ণনায় কবি লোকজ অনুষঙ্গের যে ব্যবহার করেছেন, তা অসামান্য নাট্যগুণের দাবি রাখে। সাজু নামের মেয়েটি কেবল সুন্দরীই নয়, সে গৃহকর্মে নিপুণা এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধারক। তার বর্ণনায় কবি লাল মোরগের পাখা কিংবা ভোরের হাওয়ার মতো রূপক ব্যবহার করেছেন, যা কোনো লোকজ যাত্রাপালার সজ্জার কথা মনে করিয়ে দেয়।

"লাল মোরগের পাখার মত ওড়ে তাহার শাড়ী,

ভোরের হাওয়া যায় যেন গো প্রভাতী মেঘ নাড়ী।

মুখখানি তার ঢলঢল ঢলেই যেত পড়ে,

রাঙা ঠোঁটের লাল বাঁধনে না রাখলে তায় ধরে।" (তিন পরিচ্ছেদ)

এখানে সাজুর সচল চঞ্চল রূপটি প্রকাশ পেয়েছে। নাটকের মঞ্চে নায়িকার প্রবেশের সময় যেমন রঙের খেলা থাকে, কবির বর্ণনায় সাজুর লাল শাড়ি আর তার হাসির ঝিলিক তেমনি এক দৃশ্যপট তৈরি করে। সাজু কেবল একজন সাধারণ তরুণী নয়, সে গ্রাম বাংলারলক্ষ্মী মেয়ে এক শাশ্বত রূপ। তার পিঠা তৈরির নিপুণতা কিংবা নকশা আঁকার হাত তাকে লোকশিল্পের একজন কারিগর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

লোকজ নাট্যের একটি বড় অনুষঙ্গ হলো লোকাচার বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান। নকশি কাঁথার মাঠ কাব্যেবদনা বিয়ে যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা এক জীবন্ত নাট্যদৃশ্য। চৈত্রের দাবদাহে যখন প্রকৃতি মানুষ বৃষ্টির জন্য হাহাকার করে, তখন গ্রামীণ নারীরা বৃষ্টির আবাহন জানিয়ে বাড়ি বাড়ি গান গেয়ে চাল-ডাল সংগ্রহ করে। এই বৃষ্টির গান বা বদনা বিয়ের গানের সুরে মিশে থাকে গভীর আর্তি।

"কাজল মেঘা নামো নামো চোখের কাজল দিয়া,

তোমার ভালে টিপ আঁকিব মোদের হলে বিয়া!

আড়িয়া মেঘা, হাড়িয়া মেঘা, কুড়িয়া মেঘার নাতি,

নাকের নোলক বেচিয়া দেব তোমার মাথার ছাতি।" (চার পরিচ্ছেদ)

এই উদ্ধৃতিটি বাংলার লোকবিশ্বাস প্রকৃতির সাথে মানুষের আদিম সম্পর্কের প্রতিফলন। বৃষ্টির জন্য মেঘকে প্রলুব্ধ করা এবং বিনিময়ে নিজের অলংকার বা কাজল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়াএটি একটি অনন্য লোকজ রীতি। এই গানটি যখন সম্মিলিত স্বরে গাওয়া হয়, তখন তা কেবল একটি গান থাকে না, বরং এটি একটি আচার-সর্বস্ব নাট্যাভিনয়ে পরিণত হয়। বৃষ্টির অভাবে হাহাকার করা কৃষকদের বুকফাটা আকুতি এই গানের চরণে চরণে স্পন্দিত।

কাব্যের কাহিনী যখন বিবাহের দিকে এগিয়ে যায়, তখন গ্রামীণ বিয়ের নানা খুটিনাটি বিষয়গুলো নাটকের সংলাপের মতো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ঘটক দুখাই মিয়ার চাতুর্য, বরপক্ষ কনেপক্ষের মধ্যে কৃত্রিম মান-অভিমান এবং হাস্যরসের মধ্য দিয়ে যে সামাজিক চিত্র ফুটে ওঠে, তা বাঙালির আবহমান সংস্কৃতির অংশ। বিয়ের আসরে মোল্লার কলেমা পড়া, সাক্ষী-উকিলের উপস্থিতি এবং ক্ষীর খাওয়ানোর রীতিগুলো অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে, যা পাঠককে বাস্তবের কোনো বিয়ের মজলিসে নিয়ে যায়।

বিবাহের পর রূপাই সাজুর দাম্পত্য জীবনের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তাতে পল্লী জীবনের অনাবিল সুখের চিত্র ফুটে ওঠে। দিনের বেলা মাঠে কাজ করা আর রাতে রূপাইয়ের বাঁশির সুর শুনে সাজুর বিভোর হওয়াএই সবই যেন একটি সুখী দৃশ্যকাব্যের অংশ। রূপাইয়ের বাঁশির সুর এখানে কেবল একটি বাদ্যযন্ত্রের শব্দ নয়, এটি তাদের হৃদয়ের গহীন আবেগের ভাষা।

"রূপা কয় 'শোন সোনার বরণি, আমার কুঁড়ে ঘর,

তোমার রূপের উপহাস শুধু করে সারাদিন ভর।

তুমি ফুল! তব ফুলের গায়েতে বহে বিহানের বায়ু,

আমি কাঁদি সই রোদ উঠিলে যে ফুরাবে রঙের আয়ু।" (দশ পরিচ্ছেদ)

এই সংলাপে রূপাইয়ের মনের সূক্ষ্ম শঙ্কা প্রকাশ পেয়েছে। নাটকের টানটান উত্তেজনার মতো এখানেও কবির লেখনীতে এক গভীর বিষাদ লুকিয়ে আছে। রূপাই জানে এই সুখ হয়তো ক্ষণস্থায়ী, আর সেই আশঙ্কাই তার বাঁশির সুরে সাজুর সাথে নিভৃত আলাপে ফুটে উঠেছে। প্রিয়তমার সৌন্দর্য রক্ষার আকুতি আর রোদ উঠলে সেই সৌন্দর্য হারানোর ভয়এটি এক চিরন্তন রোমান্টিক হাহাকার।

কাব্যের চূড়ান্ত নাটকীয়তা বা ক্লাইম্যাক্স তৈরি হয়গাজনা চরের দাঙ্গাবাকাইজা দৃশ্যে। ধান কাটাকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ দাঙ্গার যে ভয়াবহ উত্তেজনাপূর্ণ বর্ণনা কবি দিয়েছেন, তা যাত্রাপালার যুদ্ধের দৃশ্যের মতো গতিশীল। লাঠিয়ালদের হুঙ্কার আরআলী-আলীধ্বনিতে গগন বিদীর্ণ হওয়ার চিত্রটি অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ।

"মাটির সাথে মুখ লাগায়ে, মাটির সাথে বুক লাগায়ে,

'আলী! আলী!!' শব্দ করি মাটি বুঝি দ্যায় ফাটায়ে।

হাজার লেঠেল হুঙ্কারী কয় 'আলী আলী হজরত আলী,'

সুর শুনে তার বন-গেঁয়োদের কর্ণে বুঝি লাগল তালি!" (এগারো পরিচ্ছেদ)

এই যুদ্ধের দৃশ্যটি কাব্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। লোকনাট্যে যেমন আকস্মিক কোনো বিপদের মাধ্যমে কাহিনীর ছন্দপতন ঘটে, রূপাইয়ের ফেরারী হওয়াও সাজুর জীবনের সমস্ত সুখ কেড়ে নেয়। এই লড়াইয়ের পর রূপাইকে পালিয়ে যেতে হয়, যার ফলে তাদের প্রেম এক করুণ পরিণতির দিকে ধাবিত হয়। এটি কেবল একটি লড়াই নয়, বরং গ্রামীণ জীবনের জমিজমা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের এক নিষ্ঠুর বাস্তব চিত্র।

রূপাইয়ের বিদায়ের পর সাজুর বিরহকাল এই কাব্যের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অংশ। স্বামীর জন্য প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে সাজু তার জীবনের সমস্ত বেদনা ঢেলে দেয় একটি কাঁথার জমিনে। এই কাঁথাটিই হয়ে ওঠে তাদের জীবনের আলেখ্য। সুঁইয়ের প্রতিটি ফোঁড়ে সে তার সুখ-দুঃখের স্মৃতিগুলোকে গেঁথে রাখে। লোকনাট্যে যেমন কোনো প্রতীকের মাধ্যমে মূল ভাব প্রকাশ পায়, এখানেনকশি কাঁথাঠিক সেই প্রতীকের ভূমিকা পালন করে।

সাজুর মৃত্যুর পর কাব্যের পরিসমাপ্তি ঘটে এক গভীর বিষাদময় পরিবেশে। রূপাই যখন ফিরে আসে এবং সাজুর কবরের ওপর সেই নকশি কাঁথাটি দেখে, তখন তার হাহাকারে আকাশ-বাতাস কেঁপে ওঠে। কবির বর্ণনায় এই দৃশ্যটি এক মহান ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে।

"বহুদিন পরে গাঁয়ের লোকেরা গভীর রাতের কালে,

শুনিল কে যেন বাজাইছে বাঁশি বেদনার তালে তালে।

প্রভাতে সকলে আসিয়া দেখিল সেই কবরের গায়

রোগ পান্ডুর একটি বিদেশী মরিয়া রয়েছে হায়।" (চৌদ্দ পরিচ্ছেদ)

এই অন্তিম দৃশ্যটি নকশি কাঁথার মাঠকে এক অমর মর্যাদা দিয়েছে। বিরহী প্রেমিকের মৃত্যু আর কবরের ওপর পড়ে থাকা সেই নকশি কাঁথাএই চিত্রটি দর্শকদের মনে এক গভীর রেখাপাত করে। লোকনাট্যের সমাপ্তি যেমন প্রায়ই করুণ রসের মধ্য দিয়ে হয়, এই কাব্যটিও তেমনি এক বুকফাটা আর্তনাদে শেষ হয়েছে। আজীবন পল্লীর মানুষের গান সুরকে হৃদয়ে ধারণ করা কবি জসীম উদ্দীন এই কাব্যের মাধ্যমে গ্রামীণ বাংলার এক অখণ্ড রূপ তৈরি করেছেন।

পরিশেষে বলা যায়, ‘নকশি কাঁথার মাঠকেবল একটি কাহিনীকাব্য নয়, বরং এটি বাংলার লোকজ নাট্যের এক সমৃদ্ধ সংকলন। এতে যেমন আছে যাত্রাপালার সুর উত্তেজনা, তেমনি আছে মুর্শিদা বা রাখালি গানের গভীর মরমী আবেদন। কবির সহজ-সরল ভাষা, লোকজ অলংকার আর নিপুণ চরিত্রায়ন এই কাব্যটিকে বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রূপাই সাজুর এই বিরহগাথা আজও গ্রাম বাংলার মানুষের মুখে মুখে গীত হয় এবং এটি আমাদের লোকসংস্কৃতির এক অমলিন প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।

S M A Hanif
BA (Hon's), MA
Bengali Language and Literature

No comments

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.