ads

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চিহ্ন’ উপন্যাসে প্রতিফলিত রাজনৈতিক চিত্র

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়েরচিহ্নউপন্যাসে প্রতিফলিত রাজনৈতিক চিত্র

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য জীবনশিল্পী, যিনি মনোবিজ্ঞান মার্কসীয় দর্শনকে সার্থকভাবে উপন্যাসের আদলে রূপদান করেছেন। তাঁর অসাধারণ রাজনৈতিক উপন্যাস চিহ্ন (১৯৪৭) ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর উত্তাল কলকাতার গণ-আন্দোলনের এক জীবন্ত দলিল। ১৯৪৫ সালের ২১ ২২ নভেম্বর এবং ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে এই উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন যখন সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্ফুলিঙ্গ তৈরি করেছিল, সেই অগ্নিগর্ভ সময়ের নিখুঁত চিত্রায়নই হলোচিহ্ন

উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জনস্রোত:চিহ্নউপন্যাসের প্রধান রাজনৈতিক সুর হলো সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন যে, রাজনীতি কেবল ড্রয়িংরুমের চর্চা নয়, বরং তা রাজপথের ধুলোবালি আর ঘামের সাথে মিশে থাকা এক বাস্তবতা। উপন্যাসের শুরুতে আমরা দেখি কলকাতার রাজপথে পুলিশের লাঠিচার্জ আর গুলিবর্ষণের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সংহতি। সাধারণ মানুষ যারা হয়তো কোনো বিশেষ তত্ত্বে বিশ্বাসী নয়, তারাও এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একাত্ম হয়ে পড়ে। উপন্যাসের ভাষায় সেই মুহূর্তের উত্তেজনা ফুটে ওঠে নিচের এই অমোঘ পংক্তিমালায়:

 অদম্য ক্রোধ ক্ষোভের চাপে অপূর্ব গাম্ভীর্য ধৈর্যের ছাপ পড়েছে মুখে... প্রতিটি কথা, প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি দৃষ্টিপাত শুধু প্রতিবাদ।(চিহ্ন, পৃষ্ঠা ১০৭, অনুচ্ছেদ )

উপন্যাসের শুরুতেই দেখা যায় সাধারণ মানুষের মধ্যে জেগে ওঠা এক অদ্ভুত অস্থিরতা সাহসের চিত্র। তৎকালীন কলকাতার রাস্তায় শ্রমিক, ছাত্র, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ যেভাবে পুলিশের লাঠি গুলির মুখে বুক পেতে দিয়েছিল, তা উপন্যাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে।

জনতার গর্জনে, গুলির আওয়াজে, বুকে আলোড়ন উঠছে, চঞ্চল হয়ে উঠছে দেহের রক্ত।(চিহ্ন, পৃষ্ঠা , অনুচ্ছেদ )

এই উদ্ধৃতিটিগুলো রাজনৈতিক সচেতনতার এক চরম প্রকাশ। এখানেরক্ত চঞ্চল হওয়াকেবল দৈহিক উত্তেজনা নয়, বরং এটি একটি পরাধীন জাতির মুক্তির নেশায় মেতে ওঠার সংকেত। মানুষের রক্তের ভেতর যে বিপ্লবের স্পন্দন জেগে উঠেছে, তাকেই নির্দেশ করা হয়েছে। যখন একটি দেশের সাধারণ মানুষ শাসনযন্ত্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে, তখন তাদের ব্যক্তিগত ভয়-ডর তুচ্ছ হয়ে যায়। রাজনীতি যখন সাধারণ মানুষের স্নায়ুতে আঘাত হানে, তখন তারা আর দর্শক থাকে না, হয়ে ওঠে ইতিহাসের নির্মাতা।

ওসমানের রাজনৈতিক বিবর্তন গণেশের আত্মদান: শ্রমজীবী মানুষ ওসমানের চরিত্রটি এই উপন্যাসের রাজনীতির মূল চালিকাশক্তিগুলোর একটি। ওসমান একজন লরি চালক বা সাধারণ শ্রমিক শ্রেণির প্রতিনিধি। প্রথমদিকে তার কাছে রাজনীতি ছিল বাইরের কোনো ঘটনা, কিন্তু আন্দোলনের মাঝপথে পড়ে সে আমূল বদলে যায়। বিশেষ করে কিশোর গণেশের মৃত্যু তার চোখের সামনে রাজনীতির এক নতুন অর্থ উন্মোচিত করে। গণেশ পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে যখন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও লড়াইয়ের কথা ভাবছে, সেই দৃশ্য ওসমানকে আমূল নাড়িয়ে দেয়। উপন্যাসে বর্ণিত সেই দৃশ্যটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক প্রেরণাদায়ক:

খুন যখন বেরিয়ে আসছে গলগল করে, তাকেই ছোকরা বারবার জিজ্ঞেস করেছে, এরা এগোবে না বাবু? শহীদ হওয়ার আগে এই একটা জবাব শুধু চেয়েছে ছেলেটা তার কাছে।(চিহ্ন, পৃষ্ঠা , অনুচ্ছেদ )

এই প্রশ্নটি— ‘এগোবে না বাবু?’—আসলে গোটা জাতির কাছে একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। এটি স্থবিরতা ভেঙে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান। ওসমানের মতো সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কাছে এই রক্তমাখা প্রশ্নটিই জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পাঠ হয়ে দাঁড়ায়। সে বুঝতে পারে, চুপ করে বসে থাকার সময় আর নেই; অধিকার আদায় করতে হলে রাজপথে রক্ত দিতেই হবে। এই উপলব্ধিই ওসমানের ব্যক্তিগত জীবনকে সমষ্টির লড়াইয়ের সাথে যুক্ত করে দেয়।

ছাত্রসমাজ মধ্যবিত্তের দ্বিধা: হেমন্তের রূপান্তর: উপন্যাসের আরেকটি অন্যতম চরিত্র হলো মেধাবী ছাত্র হেমন্ত। হেমন্তের মধ্য দিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের দোদুল্যমানতা এবং শেষ পর্যন্ত সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর দৃঢ়তাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ছাত্রনেতা হেমন্ত এই শ্রেণির প্রতিনিধি। সে মেধাবী ছাত্র, তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ পড়ে আছে সামনে। তার মা অনুরূপা তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চান। কিন্তু সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি হেমন্তকে ঘরে আটকে থাকতে দেয় না। প্রথমদিকে সে রাজনীতিকে কিছুটা তুচ্ছ বিশৃঙ্খলার উৎস মনে করলেও আন্দোলনের উত্তাপ তাকে বদলে দেয়:

না, রাজনীতি বাজে নয়, তুচ্ছ নয় হেমন্তর কাছে। অত অন্ধকার নয় তার মন। বিশেষত দেশের রাজনীতি স্বাধীনতার সংগ্রাম, বংশানুক্রমিক সুদীর্ঘ সংগ্রাম।(চিহ্ন, পৃষ্ঠা , অনুচ্ছেদ )

এখানে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করেছেন যে, ছাত্রসমাজের কাছে রাজনীতি কেবল হুজুগ নয়, সাময়িক উত্তেজনা নয়, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা পরাধীনতার গ্লানি মোছার জন্য যে সংগ্রাম, তাতে শামিল হওয়াকেই হেমন্ত তার জীবনের সার্থকতা মনে করে। তার এই রূপান্তর আসলে তৎকালীন বাংলার শিক্ষিত যুবসমাজেরই প্রতিচ্ছবি।

শৃঙ্খলিত ক্রোধ রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন: ব্রিটিশ রাজশক্তির নির্মম অত্যাচারের চিত্র এই উপন্যাসে এক ভয়াবহ বাস্তবতায় ধরা দিয়েছে। পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণ, টিয়ার গ্যাস আর লাঠিচার্জ কীভাবে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গে পরিণত করে, তা লেখক নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন। পুলিশের পৈশাচিক আক্রমণের বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখক বলেন:

লাঠির ঘায়ে কপাল ফাঁক হয়ে হাজার ফুলকি দেখে ঘুরে পড়বার ঠিক আগে এক লহমার জন্য লাল পাগড়ির নিচেরকার মুখটি সে দেখেছিল, আজও সেই পৈশাচিক আক্রোশে বিকৃত মুখের ছাপ তার মনে আঁকা হয়ে আছে।

এইছাপবাচিহ্নআসলে কেবল কপালে লাগা চোট নয়, এটি হলো ঔপনিবেশিক শাসনের নিষ্ঠুরতার চিহ্ন যা একটি জাতির হৃদয়ে গেঁথে যায়। এই আঘাতই মানুষকে দমিত করার পরিবর্তে আরও বেশি বিদ্রোহী করে তোলে। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের ওপর পাশবিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তখন সেই আঘাতই হয়ে ওঠে প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় সংকেত।

রাষ্ট্রের পাশবিক ক্ষমতা প্রয়োগ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন জনতার ভয় চলে যায় এবং তারা অনেক বেশি সুশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। উপন্যাসের একটি জায়গায় এই অদ্ভুত শান্ত দৃঢ় চেতনার বর্ণনা পাওয়া যায়:

বিৃঙ্খলা, কোলাহল, মানুষের দিশেহারা ছুটোছুটির মধ্যেও সে অনুভব করে লাঠিচার্জের উদ্দেশ্য সফল হবে না... যারা নড়বে না ঠিক করেছে তাদের হটানো যাবে না।(চিহ্ন, পৃষ্ঠা ২৬, অনুচ্ছেদ )

কিংবা..

ক্রোধে ক্ষোভে উত্তেজনায় ভরে গেছে নিশ্চয় বুকগুলি, কিন্তু মাথাগুলি ঠাণ্ডা আছে।(চিহ্ন, পৃষ্ঠা ২৩, অনুচ্ছেদ )

রাজনীতিতে এইঠাণ্ডা মাথাএবংউত্তপ্ত বুক’-এর সমন্বয়ই হলো সফল বিপ্লবের চাবিকাঠি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বোঝাতে চেয়েছেন যে, কেবল হুজুগে আন্দোলন নয়, বরং লক্ষ্য সম্পর্কে সচেতন সুশৃঙ্খল প্রতিরোধই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পরাজিত করতে পারে। ব্রিটিশ শক্তির দমন-পীড়ন সাধারণ মানুষের মনে যেচিহ্নরেখে যাচ্ছে, তা আসলে ধ্বংসের নয়, বরং নতুন সৃষ্টির সংকেত।

সাম্প্রদায়িক ঐক্য রাজনৈতিক আদর্শ: ১৯৪৬ সালের কলকাতার সেই দিনগুলোতে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িক বিভেদ তৈরির চেষ্টা চলেছিল, ‘চিহ্নউপন্যাসের রাজনীতি তাকে পরাজিত করার কথা বলে। সেই প্রেক্ষাপটে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য ছিল ব্রিটিশদের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।চিহ্নউপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে এই ঐক্যের রাজনৈতিক শক্তিকে তুলে ধরেছেন। রাজপথে যখন গুলির লড়াই চলে, তখন ওসমান, গণেশ, খলিল আর হেমন্তরা কোনো আলাদা ধর্মীয় পরিচয়ে পরিচিত হয় না; তারা সবাই হয়ে ওঠে এক একটি সংগ্রামী প্রাণ। উপন্যাসের একটি সংলাপে এই ঐক্যের সুরটি অত্যন্ত সহজ ভাষায় উঠে এসেছে:

আমরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করি, তাই স্বাধীনতা পাই না। আমরা তাই এক হয়েছি। দেখছি না? এই দ্যাখ।(চিহ্ন.pdf, পৃষ্ঠা ১২৩, অনুচ্ছেদ )

এইএক হওয়া রাজনীতিইচিহ্নউপন্যাসের প্রাণভ্রমরা। শাসকগোষ্ঠী যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিয়ে আন্দোলনকে স্তিমিত করতে চায়, তখন মেহনতি মানুষের এই ঐক্যই বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এখানে প্রমাণ করেছেন যে, অর্থনৈতিক রাজনৈতিক শোষণই হলো সাধারণ মানুষের আসল শত্রু, ধর্ম নয়। যখন এই বোধটি জনগণের মধ্যে জন্মে যায়, তখনই স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত হয়।

পারিবারিক টানাপড়েন বনাম রাজনৈতিক কর্তব্য: উপন্যাসের রাজনৈতিক আলোচনার আরেকটি গুরত্বপূর্ণ দিক হলো মা ছেলের সম্পর্ক। অনুরূপা তার একমাত্র ছেলেকে হারাবার ভয়ে তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে চান। এটি কেবল এক মায়ের মমতা নয়, এটি হলো স্থিতাবস্থা বজায় রাখার মধ্যবিত্ত আকাঙ্ক্ষা। অনুরূপার মাতৃত্বের উদ্বেগ বা সীতার উদাসীনতাসবকিছুর পেছনেই কাজ করে বাইরের সেই উত্তাল রাজনীতির প্রভাব। কিন্তু রাজনৈতিক স্রোত এতটাই তীব্র যে, স্নেহের বাঁধন সেখানে আলগা হয়ে যায়। হেমন্তর রাজনৈতিক যাত্রার পথে এই বাধা সম্পর্কে লেখকের পর্যবেক্ষণ হলো:

স্নেহের শিকলে জোর করে হেমন্তকে হয়তো বেঁধে রাখা যাবে কিন্তু ফলটা তার ভালো হবে না মোটেই?” (চিহ্ন, পৃষ্ঠা ৭৮, অনুচ্ছেদ )

এই বাক্যটি জীবনের এক গভীর সত্যকে নির্দেশ করে। যখন সমাজ পরিবর্তনের ডাক দেয়, তখন ব্যক্তিগত আবেগ বা পারিবারিক গণ্ডি সেই গতিরোধ করতে পারে না। যদি জোরালো স্নেহের দোহাই দিয়ে কাউকে আটকে রাখা হয়, তবে তা কেবল তাকে বিদ্রোহী বা নিস্তেজ করে তোলে। রাজনীতি এখানে পারিবারিক গণ্ডি ছাপিয়ে এক বৃহত্তর মানবিক জাতীয় কর্তব্যে রূপান্তরিত হয়েছে।

হেমন্তের মা অনুরূপা যখন দেখেন তার ছেলে রাজপথে বিপদের মুখে, তখন তার মাতৃহৃদয় কেঁপে ওঠে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ব্যক্তিগত উদ্বেগও সামাজিক সংহতির অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

 এত সহজে কী করে মত বদলায় মানুষের? এমন আচমকা কী করে নতুন মত মেনে চলা এমন স্বাভাবিক মনে হয় মানুষের?”

এই প্রশ্নটি আসলে হেমন্তের নিজের ভেতরের দ্বন্দ্ব। মানুষের জীবনের প্রাত্যহিক নিয়মকানুন যখন একটি বিশেষ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে অর্থহীন হয়ে পড়ে, তখন মানুষ তার ব্যক্তিগত পরিচয় ভুলে হয়ে ওঠেজনতা এই সমষ্টিগত সত্তার জন্মইচিহ্নউপন্যাসের রাজনীতির মূল শিক্ষা।

জাগরণের নব্য স্পন্দন: এঁদো ডোবায় জোয়ার: উপন্যাসের শেষে আমরা এক নতুন ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখি। শত বছরের জরা আর জীর্ণতা কাটিয়ে সাধারণ মানুষ যখন রাজপথে নেমে আসে, তখন সমাজদেহে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এই পরিবর্তনকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এক চমৎকার রূপকের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন:

জোয়ার ঢুকেছে এঁদো ডোবায়।(চিহ্ন, পৃষ্ঠা ২৭, অনুচ্ছেদ )

এইএঁদো ডোবাহলো স্থবির পরাধীন সমাজ, আরজোয়ারহলো সেই গণ-আন্দোলন যা সমাজের ময়লা আর আবর্জনা পরিষ্কার করে তাকে সচল করে তুলেছে। রাজনীতির কাজ কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং মানুষের মনের বদ্ধ দুয়ারগুলো খুলে দেওয়া। উপন্যাসের চরিত্রগুলোসে ওসমান হোক কিংবা হেমন্তসবাই এই জোয়ারের স্রোতে নিজেদের ভাসিয়ে দিয়েছে এবং নিজেদের ভেতর এক নতুন সত্তার জন্ম দিয়েছে।

উপসংহার পরিশেষে বলা যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়েরচিহ্নউপন্যাসটি কেবল ১৯৪৫-৪৬ সালের কিংবা একটি বিশেষ সময়ের আন্দোলনের ইতিহাস নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের এক অনন্য শিল্পরূপ। লেখক এখানে কোনো বড় নেতার জয়গান গাননি, বরং সাধারণ ওসমান, গণেশ আর হেমন্তদের লড়াইকে অমর করে রেখেছেন। এই উপন্যাসের রাজনৈতিক চিত্রটি অত্যন্ত নির্মোহ বাস্তবসম্মত। এখানে যেমন পুলিশের অত্যাচার আছে, তেমনই আছে জনতার প্রতিরোধ; যেমন আছে সাম্প্রদায়িকতার কালো ছায়া, তেমনই আছে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বলিষ্ঠ রূপ।

উপন্যাসের নামে যেচিহ্নশব্দটির ব্যবহার, তা মূলত দুটি অর্থ বহন করে। প্রথমত, এটি দমন-পীড়নের ক্ষতচিহ্ন যা রাষ্ট্র জনগণের শরীরে এঁকে দেয়। দ্বিতীয়ত, এটি হলো বিপ্লব জাগরণের সেই স্থায়ী চিহ্ন যা মানুষের মনে এবং ইতিহাসের পাতায় খোদাই হয়ে থাকে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সাবলীলভাবে প্রমাণ করেছেন যে, সাধারণ মানুষ যখন একবার অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, তখন তাদের আর কোনো পিছুটান থাকে না।চিহ্নতাই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন এক দলিল, যা আজও আমাদের অন্যায় শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রেরণা।

S M A Hanif
BA (Hon's) Bangla, MA
Bengali Language and Literature

No comments

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.