শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাস আকারে বড় হয়ে উঠেছে এত মানুষের জীবন কাহিনীর সমাবেশ ঘটায়
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাস আকারে বড় হয়ে উঠেছে এত মানুষের জীবন কাহিনীর সমাবেশ ঘটায়
শরৎচন্দ্র
চট্টোপাধ্যায়ের ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসটি কেবল সতীত্বের সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্যই নয়, বরং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের গভীরতার কারণেও অনন্য। উপন্যাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা চরিত্রগুলোর জীবনকাহিনী কীভাবে এই বিশাল অবয়ব
তৈরি করেছে, তা আলোচনা করলে
দেখা যায় যে লেখক এখানে
প্রচলিত সমাজব্যবস্থার মুখে একটি বড় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। সমাজ যাঁদের ‘চরিত্রহীন’ বলে দাগিয়ে দিয়েছে, শরৎচন্দ্র তাঁদেরই অন্তরের মহত্ত্ব ও মানবিকতাকে বড়
করে দেখিয়েছেন।
উপন্যাসের
কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সতীশ। সতীশের চরিত্রটি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। তিনি যেমন আবেগপ্রবণ ও গান-বাজনায়
দক্ষ, তেমনই কখনও কখনও বিশৃঙ্খল। সতীশের জীবনের মধ্য দিয়ে শরৎচন্দ্র এক অস্থির যুবকের
মানসিক বিবর্তনকে দেখিয়েছেন। সতীশের জীবনে সাবিত্রীর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। সাবিত্রী চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। তিনি বিধবা এবং পরিস্থিতির চাপে মেসের ঝিয়ের কাজ করতে বাধ্য হন। কিন্তু তাঁর অন্তরের আভিজাত্য ও পবিত্রতা কোনো
জাগতিক পঙ্কিলতা স্পর্শ করতে পারেনি। সাবিত্রী ও সতীশের সম্পর্কের
রসায়ন উপন্যাসের কলেবরকে সমৃদ্ধ করেছে। সতীশের প্রতি সাবিত্রীর সেই চিরন্তন উক্তিটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:
“এই
দেহ আমার
আজও নষ্ট
হয়নি বটে
কিন্তু তোমার
পায়ে দেবার
যোগ্যতাও এর
নেই। এই
দেহ দিয়ে
আমি ইচ্ছে
করে অনেকের
মন ভুলিয়ে
আছি।”
এই উক্তির মাধ্যমে সাবিত্রীর সামাজিক অবস্থান এবং তাঁর অন্তরের গ্লানি ও আত্মত্যাগের এক করুণ ছবি ফুটে ওঠে। সাবিত্রী নিজেকে অপবিত্র মনে করলেও তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা তাঁকে অনন্য করে তুলেছে।
অন্যদিকে,
উপন্যাসের এক বিশাল অংশ
জুড়ে রয়েছে কিরণময়ী ও দিবাকরের কাহিনী।
কিরণময়ী চরিত্রটি অত্যন্ত জটিল এবং বুদ্ধিবাদী। তিনি পাণ্ডিত্যপূর্ণ নাস্তিক স্বামীর কাছ থেকে জ্ঞান পেলেও প্রেম পাননি। তাঁর সৌন্দর্যের সঙ্গে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মিলন তাঁকে এক অপরাজেয় নারী
হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। উপেন্দ্রর প্রতি তাঁর চাপা আকর্ষণ এবং পরবর্তীতে প্রতিশোধ নেওয়ার নেশায় তিনি অসহায় দিবাকরকে তাঁর লালসার শিকারে পরিণত করেন। কিরণময়ীর যুক্তিপূর্ণ তর্কের মধ্য দিয়ে শরৎচন্দ্র তৎকালীন সমাজের সনাতন সংস্কারকে আঘাত করেছেন। কিরণময়ী যখন বলেন,
“যাকে
ঘৃণিত বলছ,
সেটা আসলে
সুবুদ্ধির অভাব।
অর্থাৎ যাকে
ভালোবাসা উচিত
ছিল না,
তাকেই ভালোবাসা।”—
তখন
বোঝা যায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কতটা প্রগতিশীল ও যুক্তিনির্ভর ছিল।
কিরণময়ীর এই মানসিক পরিবর্তন
এবং তাঁর পরিণতির কাহিনী উপন্যাসের মূল ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাহিনীর গভীরতা ও দৈর্ঘ্য উভয়ই
বাড়িয়ে দিয়েছে।
উপেন্দ্র উপন্যাসের এক আদর্শবাদী চরিত্র। তিনি ধনী, রক্ষণশীল কিন্তু বন্ধুবৎসল। সতীশের প্রতি তাঁর অগাধ স্নেহ এবং কিরণময়ীর সঙ্গে তাঁর মনস্তাত্ত্বিক লড়াই উপন্যাসের এক অন্যতম দিক। উপেন্দ্রর স্ত্রী সুরবালা সতীত্বের এক প্রতিমূর্তি। সুরবালা চরিত্রটি প্রচলিত হিন্দু আদর্শের বাহক। তাঁর মৃত্যু এবং উপেন্দ্রর মানসিক ভেঙে পড়া উপন্যাসের কাহিনীতে এক বিষাদময় আবহ তৈরি করে। শরৎচন্দ্র উপেন্দ্রর মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে, একজন আদর্শবাদী মানুষও পরিস্থিতির চাপে কতটা অসহায় হয়ে পড়তে পারেন। উপেন্দ্র যখন কিরণময়ীকে চিনতে শুরু করেন, তখন তাঁর মনে এক প্রবল ঘৃণা ও বিস্ময় জন্মায়। তিনি বুঝতে পারেন যে, কেবল পুঁথিগত বিদ্যা মানুষকে প্রকৃত মানুষ করতে পারে না।
দিবাকর
চরিত্রটি উপন্যাসের এক ট্র্যাজিক চরিত্র।
তিনি শান্ত ও মেধাবী ছাত্র
হলেও কিরণময়ীর প্রভাবে তাঁর জীবন তছনছ হয়ে যায়। আরাকান যাত্রার পথে কিরণময়ী ও দিবাকরের যে
মানসিক ও শারীরিক অধঃপতনের
চিত্র শরৎচন্দ্র এঁকেছেন, তা তৎকালীন পাঠকদের
চমকে দিয়েছিল। দিবাকরের এই উপকাহিনীটি মূল
কাহিনীর সঙ্গে প্যারালাল বা সমান্তরালভাবে চলে
উপন্যাসটিকে কলেবরে বিশাল করেছে। কিরণময়ী যখন দিবাকরকে বলেন, “দিবাকর, এ
কী অধর্ম
করিস নে
তুই! তোকে
দেখবার জন্যই
তাঁর প্রাণটা
আজও আটকে
রয়েছে।”
—এই
মুহূর্তগুলোতে চরিত্রগুলোর অন্তরের হাহাকার ফুটে ওঠে।
উপন্যাসের
কাহিনীতে বেহারীর ভূমিকাও অস্বীকার করার উপায় নেই। বেহারী সতীশের অনুগত ভৃত্য হলেও তাঁর সরলতা ও সততা বারবার
সতীশের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। বেহারী কেবল একটি পার্শ্বচরিত্র নয়, বরং সে সাবিত্রী ও
সতীশের সম্পর্কের এক নীরব সাক্ষী।
সাবিত্রীর প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও মমতা চরিত্রটিকে
এক মানবিক মাত্রা দান করেছে। বেহারী যখন সাবিত্রীর দুঃখ দেখে কেঁদে ফেলে, তখন বোঝা যায় শরৎচন্দ্র সমাজের নিম্নবর্গের মানুষের অন্তরের গভীরতাকেও কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন।
শরৎচন্দ্র এই উপন্যাসে কেবল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন চরিত্র তৈরি করেননি, বরং তিনি প্রতিটি চরিত্রের জীবনকাহিনীকে একটি সুতোয় গেঁথেছেন। উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা নিয়ে শরৎচন্দ্র নিজেই সমাজকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। লেখক দেখাতে চেয়েছেন যে সমাজ যাদের ‘চরিত্রহীন’ বলে ঘৃণা করে, তাদের অনেকেরই অন্তরে দেবতার বাস। এই উপন্যাসটি আকারে বড় হয়ে ওঠার প্রধান কারণ হলো এর চরিত্রগুলোর বিচিত্র মনস্তাত্ত্বিক ঘাত-প্রতিঘাত। উপন্যাসে একের পর এক চরিত্রের আগমন কাহিনীতে নতুন নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সাবিত্রীর মেসের জীবন থেকে শুরু করে কিরণময়ীর গৃহস্থালি, উপেন্দ্রর আদর্শবাদ থেকে সতীশের উচ্ছৃঙ্খলতা—সবই এই মহৎ উপন্যাসের ভিত্তি।
একটি
গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি যা উপন্যাসের মূল
সুরকে তুলে ধরে: “সমাজে যারা শুধু দিলে, পেলে না কিছুই, যারা বঞ্চিত, যারা দুর্বল, উৎপীড়িত, মানুষ হয়েও মানুষ যাদের চোখের জলের কখনও হিসাব নিলে না।” এই
দর্শনেই শরৎচন্দ্রের সাহিত্য পরিপুষ্ট। ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসেও তিনি এই বঞ্চিত মানুষদের
জয়গান গেয়েছেন। সাবিত্রী বা কিরণময়ী সমাজতাত্ত্বিক
দিক থেকে লাঞ্ছিত হলেও শরৎচন্দ্রের কলমে তারা জীবনবোধের এক গভীর সত্যকে
উপস্থাপন করেছে। সাবিত্রী ও সতীশের প্রেম
যেমন আধ্যাত্মিক ও মানসিক স্তরে
উন্নীত হয়েছে, কিরণময়ী ও দিবাকরের সম্পর্ক
তেমনই মানুষের আদিম কামনার এক নগ্ন রূপকে
তুলে ধরেছে। এই পরস্পরবিরোধী জীবনবোধের
সমাবেশই উপন্যাসটিকে দীর্ঘ করেছে।
উপন্যাসের
উপকাহিনীগুলোর জাল এমনভাবে বোনা হয়েছে যে, মূল কাহিনীর গতি ব্যাহত না করেও তা
পাঠককে নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করে। সতীশের জীবনে সরোজিনী ও তাঁর পরিবারের
আগমন কাহিনীতে এক অভিজাত সমাজের
ছোঁয়া এনেছে। সরোজিনীর সঙ্গে সতীশের বিয়ের সম্ভাবনা এবং সাবিত্রীর প্রস্থান উপন্যাসের নাটকীয়তা বৃদ্ধি করেছে। সরোজিনী শিক্ষিত এবং আধুনিক মনস্কা নারী, তাঁর উপস্থিতিতে সতীশের চরিত্রের এক নতুন দিক
উন্মোচিত হয়। শরৎচন্দ্র এখানে দেখিয়েছেন যে, সামাজিক আভিজাত্যের আড়ালেও মানুষের মনে কত গোপন যন্ত্রণা
ও লালসা থাকতে পারে।
উপন্যাসের শেষ দিকে উপেন্দ্রর অসুস্থতা এবং সাবিত্রীর ফিরে আসা কাহিনীকে এক পূর্ণতা দান করে। উপেন্দ্রর মৃত্যুশয্যায় সাবিত্রীর সেবাপরায়ণতা এবং তাঁর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশের মুহূর্তটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। উপেন্দ্র তাঁর ভুল বুঝতে পারেন এবং সাবিত্রীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় নত হন। এই যে সম্পর্কের পরিবর্তন এবং মানুষের ভুল ভাঙার কাহিনী—তা শরৎচন্দ্র অত্যন্ত ধীরেসুস্থে বর্ণনা করেছেন, যা উপন্যাসটিকে আকারে বিশাল করেছে।
পরিশেষে
বলা যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসটি কেবল সতী-অসতী বা চরিত্রের ভালো-মন্দের বিচার নয়, এটি জীবনের এক বিশাল ক্যানভাস।
সাবিত্রী, সতীশ, কিরণময়ী, উপেন্দ্র, দিবা ও সুরবালার মতো
রক্ত-মাংসের চরিত্রগুলোর সমাবেশ এবং তাদের নিজস্ব জীবনকাহিনীর জটিল আবর্ত এই উপন্যাসটিকে এক
অনন্য উচ্চতা দান করেছে। শরৎচন্দ্র মানুষের মনের যে ‘গ্রে এরিয়া’ বা ধূসর এলাকাগুলোর
কথা বলেছেন, তা কোনো নির্দিষ্ট
ছকে বাঁধা যায় না। তাঁর নিজের ভাষায়, “ফর্ম বা
ছকে জীবনের
কোনো হিসাব
মেলে না।
উপন্যাস হচ্ছে
আমাদের প্রত্যেকের
জীবনের বহমানতা।”
চরিত্রগুলোর এই অন্তহীন জীবনপ্রবাহ
এবং সমাজব্যবস্থার সঙ্গে তাদের নিরন্তর লড়াই ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসটিকে কলেবরে বিশাল ও অর্থে মহান
করে তুলেছে। তাই উক্তিটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক যে, এত মানুষের বৈচিত্র্যময়
জীবনকাহিনীর সমাবেশই এই উপন্যাসটিকে আকারে
বড় করে তুলেছে।

বুদ্ধদেব বসুর ‘ প্রথম পার্থ ’ মিথের নব সৃষ্টিতে এক অনন্য নির্মাণ
No comments