ads

বুদ্ধদেব বসুর ‘প্রথম পার্থ’ মিথের নব সৃষ্টিতে এক অনন্য নির্মাণ

বুদ্ধদেব বসুরপ্রথম পার্থ’  মিথের নব সৃষ্টিতে এক অনন্য নির্মাণ

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে পঞ্চপাণ্ডব তুল্য পাঁচজন কবির অন্যতম হলেন বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) রবীন্দ্র-উত্তর যুগে বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকতার মন্ত্রে দীক্ষিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার সমালোচক। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ থাকলেও কাব্যনাট্য রচনায় তিনি এক স্বতন্ত্র ধ্রুপদী মহিমায় উজ্জ্বল। মহাভারতের বিশাল প্রেক্ষাপট থেকে একটি বিশেষ অংশকে ছেঁকে নিয়ে তিনি রচনা করেছেন তাঁর কালজয়ী কাব্যনাট্যপ্রথম পার্থ’ (১৯৭০) এই নাটকে তিনি প্রাচীন মিথ বা পুরাণকে কেবল পুনরুক্ত করেননি, বরং আধুনিক মানুষের জীবনদর্শন, অস্তিত্বের সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে এক অনন্য মমতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। মহাভারতের বীর কর্ণকে তিনি প্রথাগত ছাঁচ থেকে বের করে এনে এক আধুনিক রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যা এই নাটকটিকে মিথের নবসৃষ্টির এক সার্থক উদাহরণ হিসেবে অমরত্ব দান করেছে।

বুদ্ধদেব বসুর এই নাট্যভাবনার মূলে রয়েছে প্রাচীন মহাকাব্যের চরিত্রগুলোকে আধুনিক চেতনায় নতুনভাবে চেনা।প্রথম পার্থনাটকের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগের দিনটিকে কেন্দ্র করে। গঙ্গার তীরে অস্তগামী সূর্যের আলোয় কর্ণ যখন একা দাঁড়িয়ে আছেন, তখন তাঁর কাছে একে একে আসেন কুন্তী, দ্রৌপদী এবং কৃষ্ণ। প্রত্যেকেই তাঁকে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করেন, কিন্তু কর্ণ তাঁর আপন ব্যক্তিত্বে অটল থাকেন। নাট্যকার এখানে মহাভারতের কর্ণের বীরত্বকে ছাপিয়ে তাঁর ভেতরের একাকীত্ব এবং আত্মপরিচয়ের সংকটকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নাটকের শুরুতেই দুই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের সংলাপে কর্ণের প্রতিভা সম্পর্কে একটি গভীর মন্তব্য উঠে আসে:

যাকে বলে প্রতিভা, তা সহজাত। আমি এই বুঝি।

এই সংলাপটির গভীর জীবনমুখী ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, নাট্যকার এখানে কর্ণের আভিজাত্য বা কুলপরিচয়ের চেয়ে তাঁর ব্যক্তিগত যোগ্যতাকে বড় করে দেখিয়েছেন। প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হয় তার বংশ বা কুল দিয়ে, কিন্তু বুদ্ধদেব বসু কর্ণের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন যে, মানুষের প্রকৃত মহিমা তার সহজাত গুণ সাধনায়। কর্ণ সূতপুত্র না রাজপুত্রসেই বিতর্কের চেয়েও বড় সত্য হলো তিনি একজন প্রতিভাবান মানুষ। এই আধুনিক জীবনবোধই নাটকের প্রথম ভিত্তি স্থাপন করে।

নাটকটিতে কুন্তী চরিত্রটি এক বিশেষ মাত্রায় ধরা দিয়েছে। তিনি কর্ণের কাছে এসেছেন মাতৃত্বের অধিকার নিয়ে নয়, বরং পাণ্ডবদের স্বার্থ রক্ষায় এক কৌশলিনী হিসেবে। কর্ণের জন্মবৃত্তান্ত প্রকাশের মাধ্যমে তিনি তাঁকে পাণ্ডব শিবিরে যোগ দিতে প্রলুব্ধ করেন। কিন্তু কর্ণ কুন্তীর এই দেরিতে আসা মাতৃত্বকে খুব সহজেই চিনে ফেলেন। কুন্তী যখন তাঁকে বলেন যে তিনি সূর্যের সন্তান এবং কুন্তীর প্রথম পুত্র, তখন কর্ণের উত্তরটি ছিল ভীষণভাবে যুক্তিবাদী আধুনিক। তিনি বলেন:

আমি শাস্ত্র মানি না: আমার ধর্মের নাম মনুষ্যত্ব। যদি পাণ্ডবেরা আমার ভ্রাতা হন, তবে কৌরবেরাও তা-ই। যদি মনু হন আদিপিতা, আমার ভাই তবে সর্বমানব।

এই সংলাপটির মাধ্যমে কর্ণের চরিত্রের এক বিশাল মানবিক রূপান্তর প্রকাশ পায়। তিনি সংকীর্ণ রক্তসম্পর্ক বা ভ্রাতৃত্বের উর্ধ্বে উঠে সারা বিশ্বের মানুষকে নিজের আত্মীয় বলে ঘোষণা করেছেন। এটি কেবল কোনো প্রাচীন যোদ্ধার কথা নয়, বরং এক বিশ্বজনীন আধুনিক মানুষের কণ্ঠস্বর। তিনি শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে নিজের পক্ষ পরিবর্তন করতে চাননি। কুন্তীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে কর্ণ প্রমাণ করেছেন যে, জন্মপরিচয়ের চেয়ে লালনপালনকারী বাবা-মায়ের প্রতি আনুগত্য এবং বিপদের দিনে আশ্রয়দাতার (দুর্যোধন) প্রতি বিশ্বস্ততাই প্রকৃত মনুষ্যত্ব।

বুদ্ধদেব বসু এই নাটকে দ্রৌপদী চরিত্রটিকে এক অনন্য রূপে সৃষ্টি করেছেন। মহাভারতের কাহিনীতে কর্ণের সাথে দ্রৌপদীর এমন কোনো একান্ত সাক্ষাৎকার যুদ্ধের আগে দেখা যায় না। নাট্যকার এখানে মিথকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে বিনির্মাণ করেছেন। দ্রৌপদী কর্ণের কাছে এসে তাঁকে পাণ্ডবদের দলে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করেন এবং পরোক্ষভাবে নিজেকেও কর্ণের প্রাপ্য হিসেবে তুলে ধরেন। কর্ণের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ দ্রৌপদী যখন তাঁকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেন, তখন কর্ণ যে উত্তর দেন তা তাঁর আত্মমর্যাদাবোধের চরম বহিঃপ্রকাশ:

আমার কাম্য নয় কোনো নারীকোনো রাজ্য / যা বিনা চেষ্টায় জন্মসূত্রে প্রাপণীয়, / আমার গ্রাহ্য নয় অর্জিত কোনো উত্তরাধিকার।

এই উক্তির সাহিত্যিক ব্যাখ্যা করলে কর্ণের চরিত্রের এক আশ্চর্য দৃঢ়তা লক্ষ্য করা যায়। তিনি এমন কোনো কিছু গ্রহণ করতে রাজি নন যা তিনি নিজের পরিশ্রমে বা বীরত্বে অর্জন করেননি। জন্মসূত্রে পাওয়া কোনো রাজত্ব বা উত্তরাধিকারের প্রতি তাঁর কোনো মোহ নেই। আধুনিক মানুষ যেমন নিজের চেষ্টায় নিজের পরিচয় তৈরি করতে চায়, কর্ণও ঠিক তেমনই। তিনি নিজেকেঅনাশ্রীয় এক আগন্তুকহিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং অনির্জিত কোনো উত্তরাধিকারের লোভকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছেন। মিথের কর্ণের এই মানসিক রূপান্তর বুদ্ধদেব বসুর মৌলিকত্বের এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

নাটকটির একেবারে শেষ পর্যায়ে কৃষ্ণের উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কৃষ্ণ এখানে পরমেশ্বর নন, বরং এক দূরদর্শী রাজনৈতিক পুরুষ এবং নিয়তির প্রতীক। তিনি যখন কর্ণের মৃত্যু অনিবার্য জেনেও তাঁকে শেষবারের মতো পাণ্ডব পক্ষে আসার আহ্বান জানান, তখন কর্ণের কাছে যুদ্ধ আর কেবল রাজ্য জয়ের বিষয় থাকে না, তা হয়ে ওঠে এক অস্তিত্বের সংগ্রাম। কর্ণের কাছে কৃষ্ণ যখন যুদ্ধের অনিবার্যতা এবং ভ্রাতৃত্বের দোহাই দেন, তখন কর্ণের উপলব্ধি হয় এক গভীর জীবনসত্যের:

সব যুদ্ধই অন্যায়। সব হত্যাই ভ্রাতৃহত্যা।

যুদ্ধবিরোধী এই চেতনাপ্রথম পার্থনাটকটিকে এক আধুনিক ধ্রুপদী সাহিত্যের মর্যাদা দিয়েছে। এই ছোট সংলাপটির ভেতরে নাট্যকার সমকালীন পৃথিবীর যুদ্ধবিগ্রহ এবং হানাহানির বিরুদ্ধে এক জোরালো ধিক্কার জানিয়েছেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই সত্য উচ্চারণ করা একমাত্র বুদ্ধদেব বসুর পক্ষেই সম্ভব ছিল। তিনি প্রাচীন মহাকাব্যকে বর্তমানের আয়নায় ফেলে দেখিয়েছেন যে, যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত মানুষের কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। সব রক্তপাতই আসলে আপনজনের রক্তপাত।

কর্ণের চরিত্রের সবচেয়ে ট্র্যাজিক এবং আধুনিক দিকটি হলো তাঁর নিঃসঙ্গতা। তিনি জানেন যে তিনি যুদ্ধে পরাজিত হবেন এবং তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত। তবুও তিনি নিজের পথ থেকে সরে আসেননি। কৃষ্ণ যখন তাঁকে জানান যে অর্জুনের হাতেই তাঁর পতন হবে, তখন কর্ণ বিচলিত না হয়ে বরং এক অদ্ভুত মুক্তি অনুভব করেন। তিনি নিজেকে চিনতে পারেন একদম ভিন্নভাবে:

আমি স্বাধীন, আমি নিঃসঙ্গ।

এই সংলাপটি আধুনিক অস্তিত্ববাদী দর্শনের (Existentialism) এক সার্থক প্রতিফলন। কর্ণ এখানে বুঝতে পেরেছেন যে পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই আসলে একা। তাঁর পরিচয় কোনো বংশে নয়, কোনো ভ্রাতৃত্বে নয়, বরং তাঁর একাকীত্বের ভেতরেই তাঁর স্বাধীনতা লুকিয়ে আছে। তিনি অর্জুনের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েই মরতে চেয়েছেন, যাতে ইতিহাসের পাতায় তাঁর পরিচয় অস্পষ্ট না থাকে। এই নিঃসঙ্গতার বোধই তাঁকে আধুনিক মানুষের প্রতিনিধি করে তুলেছে।

নাটকের শিল্পরূপ বিচারে দেখা যায়, বুদ্ধদেব বসু গদ্যছন্দের ব্যবহারে এক আশ্চর্য মায়াজাল তৈরি করেছেন। নাটকীয় সংঘাতের পাশাপাশি এখানে কাব্যের যে মাধুর্য রয়েছে, তা পাঠককে মুগ্ধ করে। দুই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের উপস্থিতি অনেকটা গ্রিক নাটকের 'কোরাস'-এর মতো কাজ করেছে, যারা নাটকের কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে গেছে এবং ঘটনার ওপর নিরপেক্ষ মন্তব্য করেছে। নাটকের স্থান, কাল পাত্রের বিন্যাস অত্যন্ত সংহত। গঙ্গার তীরের সেই বিকেলটি যেন কর্ণের জীবনের গোধূলি বেলার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, বুদ্ধদেব বসুরপ্রথম পার্থকেবল মহাভারতের একটি খণ্ডিত কাহিনী নয়, এটি এক আধুনিক মানুষের আত্মপরিচয় সন্ধানের গাথা। তিনি মিথের খোলস ব্যবহার করে তার ভেতরে সমকালীন মানুষের যন্ত্রণা, একাকীত্ব, দম্ভ এবং প্রেমকে সার্থকভাবে উপস্থাপন করেছেন। কর্ণ এখানে কেবল এক বীর যোদ্ধা নন, তিনি এক নিঃসঙ্গ বিদ্রোহী, যিনি নিয়তির লেখা লিপিকে অস্বীকার করে নিজের মৃত্যুকেই নিজের শ্রেষ্ঠ বিজয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন। মহাভারতের পুরাতন কাহিনীকে বুদ্ধদেব বসু আধুনিক জীবনবোধের রসে সিক্ত করে তুলেছেন। এখানেই নাট্যকার হিসেবে তাঁর সার্থকতা এবংপ্রথম পার্থকাব্যনাটকটির অনন্য নির্মাণশৈলী সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত। মিথের এই অসাধারণ নবসৃষ্টি বাংলা নাট্যসাহিত্যে এক চিরস্থায়ী সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে।

S M A Hanif
BA (Hon's) Bangla, MA
Bangladesh Open University

No comments

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.