ads

চক্রবাক: কাজী নজরুল ইসলামের রোমান্টিক চেতনার স্মারক

চক্রবাক: কাজী নজরুল ইসলামের রোমান্টিক চেতনার স্মারক

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বাংলা সাহিত্যের এক চিরবিস্ময়কর প্রতিভা, যিনি একাধারে দ্রোহ প্রেমের কবি হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তার লেখনীতে যেমন অন্যায় শোষণের বিরুদ্ধে রণতূর্য বেজেছে, তেমনি প্রেমের করুণ মধুর সুর তার কবিতাকে দান করেছে এক অনন্য মাত্রা। নজরুলের কবি-মানসের এই প্রেম বিরহচেতনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক স্মারক হলো তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ চক্রবাক’ (১৯২৯) ১৯২৯ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থটি নজরুলের কাব্যজীবনের এক সন্ধিক্ষণের পরিচয় দেয়, যেখানে কবিরঅগ্নি-বীণা সেই প্রলয়োল্লাস স্তিমিত হয়ে বিরহের এক শান্ত গভীর মরমী আবহ তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম সফরের স্মৃতি এবং ব্যক্তিগত জীবনের অপূর্ণ প্রেমের হাহাকার এই কাব্যের পরতে পরতে মিশে আছে।

 তোমার কণ্ঠে রাখিয়া এসেছি মোর কণ্ঠের গান-

এইটুকু শুধু রবে পরিচয়? আর সব অবসান?

অন্তরতলে অন্তরতর যে ব্যথা লুকায়ে রয়,

গানের আড়ালে পাও নাই তার কোনদিন পরিচয়? (কবিতা: গানের আড়াল)

নজরুলেরচক্রবাককাব্যগ্রন্থটি মূলত কবির ব্যক্তিগত জীবনের গভীর বিরহবোধ এবং প্রকৃতির সাথে প্রেমের এক অপূর্ব সংশ্লেষ। নজরুলের কাব্যে এর আগে আমরা যে পৌরুষদীপ্ত বিদ্রোহ দেখেছি, চক্রবাকে এসে তা এক বিষণ্ণ অন্তর্মুখী রূপ পরিগ্রহ করেছে।চক্রবাকশব্দের আভিধানিক অর্থ হলো একটি বিশেষ প্রজাতির পাখি, যারা লোককথা অনুযায়ী রাতে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে এবং বিরহে কাতর হয়। নজরুল নিজেকে সেই বিরহী চক্রবাকের প্রতীকে উপস্থাপন করেছেন, যা তার রোমান্টিক একাকীত্ব অতৃপ্ত প্রেমের প্রতীকী রূপ।

বিরহচেতনা হৃদয়ের আর্তি:

চক্রবাককাব্যের মূল সুরটি হলো বিরহ। তবে নজরুলের এই বিরহ কেবল রক্ত-মাংসের মানবীর জন্য নয়, বরং তা এক চিরন্তন অতৃপ্তির হাহাকার। কবি এখানে নিজেকে একজন নিঃসঙ্গ পথিকের মতো উপস্থাপন করেছেন, যিনি প্রেমের অর্ঘ্য সাজিয়ে বসে আছেন কিন্তু তার প্রিয়তমা ধরাছোঁয়ার বাইরে। কাব্যেরঅপরাধ শুধু মনে থাককবিতায় কবির এই অভিমানী বিসর্জনমুখী সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি নিজের দুঃখকে প্রিয়তমার ওপর চাপিয়ে না দিয়ে বরং নিজেই সেই যাতনা সহ্য করতে চেয়েছেন।

মোর অপরাধ শুধু মনে থাক!

আমি হাসি, তার আগুনে আমারই

অন্তর হোক পুড়ে খাক!

অপরাধ শুধু মনে থাক! (কবিতা: অপরাধ শুধু মনে থাক)

এই চরণে কবির আত্মবিসর্জনের এক মহৎ রূপ প্রকাশিত হয়েছে। নজরুল এখানে প্রেমকে কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে দেখেননি, বরং বিরহের দহনের মাধ্যমে প্রেমকে পবিত্র করতে চেয়েছেন। তার কাছে প্রেম মানে কেবল মিলন নয়, বরং মিলনের চেয়ে বিরহের সত্যই বেশি প্রবল। এই বিরহচেতনা তার রোমান্টিকতাকে এক দার্শনিক গভীরতা দান করেছে। কবির এই একাকীত্ব এবং অতৃপ্ত হৃদয়ের আর্তিই চক্রবাকের প্রাণভোমরা।

প্রকৃতি প্রেমের নিবিড় সংশ্লেষ:

নজরুলের রোমান্টিক চেতনার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের মাঝে প্রিয়তমার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া।চক্রবাককাব্যে প্রকৃতি কেবল পটভূমি হিসেবে আসেনি, বরং তা কবির বিরহী হৃদয়ের সহচর হয়ে উঠেছে। কবির কাছে জানালার পাশের গুবাক তরুর সারি কেবল গাছ নয়, বরং তারা তার নিশীথ রাতের পরম বন্ধু।বাতায়নে পাশে গুবাক-তরুর সারিকবিতায় কবি প্রকৃতিকে তার প্রেমাস্পদের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখেছেন। ঝিলিমিলি জানালার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুপারি গাছের সারির মধ্যে তিনি তার প্রিয়ার দেহের রেখা চোখের কাজল খুঁজে পান।

তোমার পাতায় দেখেছি তাহার আঁখির কাজল-লেখা,

তোমার দেহেরই মতন দীঘল তাহার দেহের রেখা।

তব ঝির্-ঝির্ মির্-মির্ যেন তারই কুণ্ঠিত বাণী,

তোমার শাখায় ঝুলানো তাহার শাড়ির আঁচলখানি! (কবিতা: বাতায়ন-পাশে গুবাক তরুর সারি)

এখানে কবি প্রকৃতি নারীকে একাকার করে দিয়েছেন। এটি রোমান্টিক কবিতার একটি চিরায়ত বৈশিষ্ট্য, যেখানে কবি তার অন্তরের অনুভূতিকে বহির্জগতের প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর আরোপ করেন। গুবাক তরুর পাতার মর্মর ধ্বনি কবির কাছে তার প্রিয়তমার মৃদু কণ্ঠস্বর মনে হয়। এই যে প্রকৃতিকে মানবীয় অনুভূতিতে রাঙিয়ে তোলা, এটাই নজরুলের রোমান্টিকতার সার্থকতা। তার বিরহী মন বাইরের জগতের রূপ-রস-গন্ধের মাঝে কেবল প্রিয়তমার স্মৃতিকেই খুঁজে ফেরে।

নদী বিরহের আবহ:

চক্রবাক কাব্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো নদীর অনুষঙ্গ। কবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্ণফুলী নদীকে নিয়ে যে কবিতা লিখেছেন, সেখানে তার বিরহচেতনা এক বিশ্বজনীন রূপ পেয়েছে। কর্ণফুলী নদীর প্রবাহমান ধারার মাঝে কবি তার নিজের অশ্রু বিসর্জন দিতে চেয়েছেন। কবির কাছে নদী কেবল জলরাশি নয়, বরং এক চির বিরহিণী প্রিয়া, যে যুগ যুগ ধরে মানুষের কান্না বুকে নিয়ে বয়ে চলেছে।

ওগো কর্ণফুলী,

উজাড় করিয়া দিনু তব জলে আমার অশ্রুগুলি।

যে লোনা জলের সিন্ধু-সৈকতে নিতি তব আনাগোনা,

আমার অশ্রু লাগিবে না সখী তার চেয়ে বেশি লোনা! (কবিতা: কর্ণফুলী)

এই পঙক্তিমালায় কবির হৃদয়ের হাহাকার নদীর বিশালতার সাথে মিশে গেছে। নজরুল এখানে কালিদাসেরমেঘদূত’-এর বিরহী যক্ষের মতো এক আধুনিক বিরহী সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। যক্ষ যেমন মেঘের মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, নজরুল তেমনি কর্ণফুলী বা গুবাক তরুর মাধ্যমে তার অব্যক্ত বেদনা প্রকাশ করেছেন। নদীর লোনা জলের সাথে নিজের চোখের জলের তুলনা কবির রোমান্টিক যন্ত্রণাকে অত্যন্ত কাব্যিক করে তুলেছে।

অভিমান আত্মবিসর্জন:

নজরুলের রোমান্টিকতা কেবল কান্নায় পর্যবসিত নয়, এর মধ্যে এক ধরণের বলিষ্ঠ অভিমান আছে। তিনি তার প্রেমাস্পদকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু সেই ভুলে যাওয়ার চেষ্টাই তাকে বারবার স্মৃতির কাছে ফিরিয়ে আনে।তুমি মোরে ভুলিয়াছকবিতায় কবির এই তীব্র অভিমানী রূপটি ফুটে ওঠে। তিনি প্রিয়াকে ভুলে যাওয়ার পূর্ণ অধিকার দেন, কিন্তু নিজের মনের মণিকোঠায় তার স্মৃতি অম্লান করে রাখেন।

তুমি মোরে ভুলিয়াছ তাই সত্য হোক!—

সেদিন যে জ্বলেছিল দীপালি-আলোক

তোমার দেউল জুড়িভুল তাহা ভুল!

সেদিন ফুটিয়াছিল ভুল করে ফুল। (কবিতা: তুমি মোরে ভুলিয়াছ)

এখানে কবির রোমান্টিকতা এক উচ্চতর স্তরে পৌঁছেছে যেখানে তিনি প্রিয়ার প্রত্যাখ্যানকেও মাথা পেতে নিয়েছেন। নজরুলের এইভুল করে ফুল ফোটানো রূপকটি অত্যন্ত জীবনমুখী। মানুষের জীবনে প্রেম অনেক সময় ভুল পথে আসে, কিন্তু সেই ভুলের মধ্যেও যে সৌন্দর্য মাদকতা থাকে, নজরুল তাকেই এখানে উদযাপন করেছেন। মিলনের চেয়ে বিরহের এই গৌরবই রোমান্টিকতার প্রকৃত নির্যাস।

রূপক প্রতীকী ব্যঞ্জনা:

চক্রবাককাব্যের নামকরণের মধ্যেই একটি গভীর রূপক লুকিয়ে আছে। চক্রবাক চক্রবাকী পাখির পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, তারা কখনো রাতে একত্রে থাকতে পারে না। নজরুলের ব্যক্তিগত জীবনের অপ্রাপ্তি চিরস্থায়ী বিরহ এই প্রতীকের মাধ্যমে অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। কাব্যের নামকবিতাচক্রবাক’- কবি বলছেন:

এপার ওপার জুড়িয়া অন্ধকার

মধ্যে অকূল রহস্য-পারাবার,

তারই এই কূলে নিশি নিশি কাঁদে জাগি

চক্রবাক সে চক্রবাকীর লাগি। (কবিতা: চক্রবাক)

এই অন্ধকার অকূল রহস্য-পারাবার মূলত মানুষের জীবনের সীমাবদ্ধতা অজানার প্রতীক। আমরা যাকে ভালোবাসি, তাকে পরিপূর্ণভাবে পাওয়া বা বোঝার মাঝে যে দুর্লঙ্ঘ্য বাধা থাকে, নজরুল সেই শাশ্বত বিরহকেই এখানে চিত্রিত করেছেন। তার রোমান্টিক চেতনা এখানে কেবল ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের গণ্ডি পেরিয়ে এক আধ্যাত্মিক মহাজাগতিক রূপ ধারণ করেছে। কবির এই আকুতি নিখিল বিশ্বের বিরহী আত্মার চিরন্তন আর্তি হিসেবেই প্রতিধ্বনিত হয়।

উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলামেরচক্রবাককাব্যগ্রন্থটি তার রোমান্টিক কাব্য-প্রতিভার এক অতুলনীয় নিদর্শন। এই কাব্যে তিনি বিদ্রোহীর রণসাজ ছেড়ে শান্ত বিরহী প্রেমিকের বেশ ধারণ করেছেন। তার বিরহ কেবল কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য নয়, বরং তা জীবন জগতের এক গভীর একাকীত্বের প্রকাশ। প্রকৃতিকে তিনি প্রিয়ার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং নদীর কলতানে নিজের হৃদয়ের স্পন্দন শুনেছেন।চক্রবাকনজরুলকে কেবল বিপ্লবী কবি হিসেবে নয়, বরং বাঁশির করুণ সুরের এক নিপুণ শিল্পী হিসেবে আমাদের সামনে নতুন করে পরিচিত করে তোলে। নজরুলের এই বিরহ-বিধুর রোমান্টিকতা বাংলা কবিতার ইতিহাসে চিরকাল এক উজ্জ্বল স্বতন্ত্র স্থান দখল করে থাকবে। এই কাব্যের প্রতিটি কবিতা যেন এক একটি অশ্রুবিন্দু, যা কবির হৃদয়ের গহীন তলদেশ থেকে উঠে এসে পাঠকদের হৃদয়কেও প্লাবিত করে দেয়। নজরুলের রোমান্টিকতা এখানে কেবল আবেগ নয়, বরং তা এক শাশ্বত জীবনদর্শন, যেখানে পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়ার বেদনা অনেক বেশি সুন্দর মহিমান্বিত।

 

বাদল-রাতের পাখি!

কবে পোহায়েছে বাদলের রাতি, তবে কেন থাকি থাকি

কাঁদিছ আজিও ‘বউ কথা কও’ শেফালির বনে একা,

শাওনে যাহারে পেলে না, তারে কি ভাদরে পাইবে দেখা? --- (কবিতা: বাদল-রাতের পাখি)


No comments

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.