ads

নজরুলের‘বিষের বাঁশী’: ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ভাঙ্গার সুর

নজরুলের ‘বিষের বাঁশী’: ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ভাঙ্গার সুর

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)বাংলা সাহিত্যের এমন এক বিরল প্রতিভা, যাঁর প্রতিটি সৃজন ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক একটি অগ্নিগর্ভ মন্ত্র। বিংশ শতাব্দীর ২০-এর দশকের সেই উত্তাল সময়ে, যখন ভারতবর্ষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কঠোর নিগড়ে বন্দি, তখন নজরুলেরবিষের বাঁশীকাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালে। এই কাব্যটি কেবল শব্দের সমষ্টি ছিল না, বরং তা ছিল শৃঙ্খলিত এক জাতির আত্মজাগরণের হাতিয়ার। ব্রিটিশ শাসকরা এই কাব্যের তেজ সহ্য করতে না পেরে প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, যা প্রমাণ করে যে নজরুলের এই সুর কতটা শক্তিশালী ব্রিটিশ রাজদণ্ডের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল। নজরুলেরবিদ্রোহীসত্তার এই প্রকাশ ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলা ভাঙার এক অনন্য দালিলিক রূপ।


বিষের বাঁশীকাব্যের নামকরণের মধ্যেই কবির মূল দর্শনটি নিহিত রয়েছে। বাঁশি সাধারণত প্রেম, বিরহ বা শান্তির সুরের জন্য পরিচিত, কিন্তু নজরুল তাকে করেছেনবিষের বাঁশী এই বিষ মূলত সেই তেজোদীপ্ত সত্য, যা শোষক অত্যাচারীর জন্য বিষের মতো যন্ত্রণাদায়ক, কিন্তু শোষিত মানুষের জন্য তা সঞ্জীবনী সুধা। নজরুল মনে করতেন, ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলা ভাঙার জন্য জাতির হৃদয়ে এমন এক বিষের সুর ছড়াতে হবে, যা তাদের দীর্ঘদিনের দাসত্ব ভীরুতাকে ধ্বংস করে দেবে। কাব্যের প্রথম কবিতাটির মধ্য দিয়েই কবি তাঁর এই রণহুঙ্কার ঘোষণা করেছেন:

জীবনের সদর্থক ভাবনায় ভাস্বর রবীন্দ্রনাথের 'শেষলেখা'

আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ!

গাইবি আবার কণ্ঠ-ছেঁড়া বিষ-অভিশাপ-সিক্ত গান।

আয় রে চির-তিক্ত প্রাণ!                                                   

আয় রে আমার বাঁধন-ভাঙ্গার তীব্র সুখ

জড়িয়ে হাতে কালকেউটে গোখরো নাগের

পীত চাবুক

(আয় রে আবার আমার চির-তিক্ত প্রাণ)

এখানেবাঁধন-ভাঙ্গার তীব্র সুখবলতে কবি পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির পরম আনন্দের কথাই বুঝিয়েছেন। নজরুল বিশ্বাস করতেন, যতক্ষণ পর্যন্ত মনের গভীর থেকে দাসত্বের ভীতি দূর না হবে, ততক্ষণ বাহ্যিক শৃঙ্খলা ভাঙা সম্ভব নয়। তাই তিনি তাঁর কাব্যে এমন এক অস্থির প্রতিবাদী সুরের অবতারণা করেছেন, যা মানুষকে সম্মুখ সংগ্রামের জন্য অস্থির করে তোলে।

ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নজরুলের লড়াই ছিল বহুমাত্রিক। তিনি ঔপনিবেশিক শাসনযন্ত্রের অন্যতম হাতিয়ার অর্থাৎ কারাগার বা জিন্দানখানাকে বিপ্লবের উৎস হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ব্রিটিশরা মনে করত মানুষকে বন্দি করে তাদের কন্ঠ রোধ করা সম্ভব, কিন্তু নজরুলশিকল-পরার গানকবিতায় দেখিয়েছেন যে কারাবরণ আসলে পরাধীনতার শিকল বিকল করার একটি রণকৌশল মাত্র। কবির ভাষায়:

এই শিকল-পরা ছল মোদের এই শিকল-পরা ছল।

এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল॥

তোদের বন্ধ কারায় আসা মোদের বন্দী হতে নয়,

ওরে ক্ষয় করতে আসা মোদের সবার বাঁধন-ভয়॥(শিকল-পরার গান, চরণ -)

এই পঙক্তিগুলোর মাধ্যমে নজরুল ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলা ভাঙার এক তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করেছেন। শাসক যে শৃঙ্খল দিয়ে মানুষকে আটকে রাখতে চায়, সেই শৃঙ্খলকেই নজরুল বিপ্লবের অলংকার হিসেবে দেখেছেন। কারাগারকে তিনি ভয়ের স্থান না বানিয়ে একেবাঁধন-ভয়দূর করার এক পাঠশালায় রূপান্তর করেছেন। এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনযন্ত্রের মনোবলের ওপর এক সরাসরি আঘাত।

নজরুল জানতেন যে, ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল সাম্প্রদায়িক বিভেদ এবং ব্রিটিশদেরভাগ কর শাসন করনীতি। ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলা কেবল রাজপথে ছিল না, তা ছিল সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ধর্মের নামে কুসংস্কার অস্পৃশ্যতার মাধ্যমে। নজরুল অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে এই সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙার ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত একটি জাতি কখনও শক্তিশালী বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে জয়ী হতে পারে না।জাতের বজ্জাতিকবিতায় তিনি এই সংকীর্ণতার মূলে কুঠারাঘাত করে লিখেছেন:

জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছে জুয়া,

ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া।

হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি, ভাবলি এতেই জাতির জান,

তাই তো বেকুব, করলি তোরা এক জাতিকে একশো-খান!” (জাতের বজ্জাতি, চরণ -)

নজরুলের এই আক্রমণাত্মক সুর ছিল প্রকৃতপক্ষে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ভাঙারই অংশ। তিনি মানুষকে কেবলমানুষহিসেবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যাতে সেই সম্মিলিত শক্তির আঘাতে সাম্রাজ্যবাদের ভিত কেঁপে ওঠে। তিনি হিন্দু মুসলিম উভয় ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন যাতে বিপ্লবের ভাষাটি সর্বজনীন হয় এবং কেউ যেন নিজেকে এই লড়াই থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করে।

বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন সত্যের পথে অবিচল বীর সেনানীদের। নজরুলসেবককবিতায় সেই সব মুক্তিপাগল যুবকদের আহ্বান জানিয়েছিলেন যারা সত্যের টানে মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অত্যাচারীর মুখোমুখি হতে পারে। ঔপনিবেশিক শাসকরা যেখানে আইনের দোহাই দিয়ে অন্যায়কে টিকিয়ে রাখত, সেখানে নজরুল বজ্রকণ্ঠে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, এই অন্যায় শৃঙ্খল কি কেউ ভাঙবে না? তাঁর কবিতার ভাষ্য অনুযায়ী:

সত্যকে হায় হত্যা করে অত্যাচারীর খাঁড়ায়

নেই কি রে কেউ সত্যসাধক বুক খুলে আজ দাঁড়ায়?

শিকলগুলো বিকল করে পায়ের তলায় মাড়ায়,-

বজ্র-হাতে জিন্দানের ওই ভিত্তিটাকে নাড়ায়?” (সেবক, চরণ -)

এইজিন্দানবা জেলখানার ভিত্তি নাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই কবি ঔপনিবেশিক শাসনের সামগ্রিক পতনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। নজরুল তাঁর কাব্যে শোষকের তলোয়ারের চেয়ে সত্যের কণ্ঠস্বরকে অনেক বেশি শক্তিশালী বলে দাবি করেছেন। তাঁর এই উদ্দীপনামূলক গীতিধর্মিতা এবং শব্দের ঝঙ্কার তৎকালীন ছাত্র যুবসমাজের রক্তে এক ধরনের উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল, যা সরাসরি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে।

নজরুলের লড়াই কেবল বর্তমানকে নিয়ে ছিল না, তিনি শহীদের আত্মত্যাগকে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেছেন।বন্দনা-গানকবিতায় তিনি দেখিয়েছেন যে, যারা স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাদের রক্ত বৃথা যাবে না। তৎকালীন ভারতবর্ষের ত্রিশ কোটি মানুষকে তিনি সেই শহীদের রক্তের উত্তরাধিকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শৃঙ্খলিত জাতির বুকে আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করতে তিনি লিখেছেন:

শিকলে যাদের উঠেছে বাজিয়া বীরের মুক্তি-তরবারি,

আমরা তাদেরই ত্রিশ কোটি ভাই, গাহি বন্দনা-গীতি তারই।

তাদেরই উষ্ণ শোণিত বহিছে আমাদেরও এই শিরা-মাঝে,

তাদেরই সত্য-জয়-ঢাক আজি মোদেরই কণ্ঠে ঘন বাজে। (বন্দনা-গান, চরণ -)

এই কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে, বিপ্লবীদের হাতের শিকলের শব্দ আসলে ছিল মুক্তির তরবারির রণধ্বনি। তিনি শহীদদের রক্তকে বর্তমান প্রজন্মের ধমনীতে প্রবাহিত হতে দেখে এক অবিনাশী জাতীয় চেতনার ছবি এঁকেছেন। এই যে বিশাল জনশক্তির ধারণা, এটিই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ। নজরুল তাঁর বাণীর মাধ্যমে সেই ঘুমন্ত ত্রিশ কোটি মানুষকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন।

পরিশেষে নজরুলেরবিজয়-গানকবিতায় সেই অনাগত স্বাধীনতার এক উজ্জ্বল ছবি ফুটে ওঠে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, পরাধীনতার অন্ধকার রজনী শেষে স্বাধীনতার লাল সূর্য উদিত হবেই। সেই জয়ের প্রত্যাশায় তিনি গেয়েছেন:

ওই অভ্র-ভেদী তোমার ধ্বজা

উড়ল আকাশ-পথে।

মা গো, তোমার রথ-আনা ওই

রক্ত-সেনার রথে (বিজয়-গান, চরণ -)

নজরুল এখানে স্বাধীনতাকেমাবা দেশমাতার মূর্তিতে কল্পনা করেছেন এবং বিজয়ের ধ্বজাকে আকাশে উড়তে দেখেছেন। এটি কেবল কবির কল্পনা ছিল না, বরং তা ছিল পরাধীন জাতির জন্য এক চরম দিকনির্দেশনা।

সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘বিষের বাঁশীকাব্যগ্রন্থটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক ত্বরিত প্রলয়ঙ্করী প্রতিবাদ। এই কাব্যের প্রতিটি চরণে নজরুল শৃঙ্খলা ভাঙ্গার যে সুর ধ্বনিত করেছেন, তা ছিল একাধারে রাজনৈতিক, সামাজিক মানসিক মুক্তির ডাক। ব্রিটিশ সরকার কাব্যটি বাজেয়াপ্ত করেও এর তেজ দমন করতে পারেনি, কারণ নজরুলের এই সুর ততদিনে কোটি মানুষের হৃদয়ে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। নজরুলের বাঁশি কোমল ছিল না, তা ছিল রণভেরীর মতো উচ্চকিত। শৃঙ্খল পরে শৃঙ্খল বিকল করার যে দুর্জয় সাহস নজরুল এই কাব্যে দেখিয়েছেন, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরকাল ঔপনিবেশিক শাসন শোষণের বিরুদ্ধে এক শ্রেষ্ঠ প্রতিবাদী দলিল হিসেবে স্বীকৃত হয়ে থাকবে। নজরুলের এই আপসহীন বিদ্রোহ এবং মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসাইবিষের বাঁশীকে কালজয়ী কালোত্তীর্ণ কাব্যের মর্যাদা দান করেছে।

No comments

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.