ads

রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’: বিংশ শতাব্দীর নতুনের আহ্বান ও গতিতত্ত্ব

রবীন্দ্রনাথের বলাকাবিংশ শতাব্দীর নতুনের আহ্বান


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বলাকা কাব্যগ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। ১৯১৬ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের কবিমানসের এক যুগান্তকারী বিবর্তনের ফসল। ১৯ শতকের শান্ত, স্নিগ্ধ আধ্যাত্মিকতা থেকে বেরিয়ে এসে ২০ শতকের গতিময়তা এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ এখানে এক নতুন সত্যের জয়গান গেয়েছেন। নিচে বিংশ শতাব্দীর নতুনের আহ্বানেবলাকাকাব্যের ভূমিকা এবং এর অন্তর্নিহিত দর্শন বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।


 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঐতিহাসিক পটভূমি ও বিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপট:

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একজন কবি বা সাহিত্যিক ছিলেন না, তিনি নিজে ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর জীবন সাহিত্যকে বুঝতে হলে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে যে সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছিল, তা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীল সত্তাকে সমৃদ্ধ করেছিল।

 

রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ ৮০ বছরের জীবনকে মূলত দুটি অংশে ভাগ করা যায়১৯ শতক এবং ২০ শতক। ১৯ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত তাঁর লেখায় মূলত গ্রাম-বাংলা, লোকজ সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির শান্ত রূপ ফুটে উঠেছিল। কিন্তু ২০ শতকের প্রথমার্ধে তাঁর চিন্তা দর্শনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। বলাকা কাব্যের রচনাকাল ১৯১৪ থেকে ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়। এই সময়টি ছিল বিশ্ব ইতিহাসের এক অত্যন্ত সংকটপূর্ণ সময়। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি তাঁকে বিশ্বদরবারে এক আধ্যাত্মিক সাধক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও, ১৯১৪ সালে শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কবির মনে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে। সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণ এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে গতির জয়গান গাওয়াই হয়ে ওঠে তাঁর কাব্যের মূল সুর। এই সুরের সার্থক শিল্পরূপই হলোবলাকা

 

জরাজীর্ণতা ভেঙে নবীনের আবাহন:

 

বলাকাকাব্যের প্রধান সুর হলো স্থবিরতাকে অস্বীকার করে নতুনের আবাহন। রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন যে, প্রাচীন প্রথা রক্ষণশীল মানসিকতা সমাজকে পঙ্গু করে রাখে। সমাজ জীবনের এই জড়তা কাটাতে তিনি তরুণদের অর্থাৎসবুজকাঁচাপ্রাণের দলকেই উপযুক্ত মনে করেছেন। কাব্যের প্রথম কবিতাতেই তিনি গেয়েছেন:

পুরাণাশ্রিত চরিত্র হলেও বীরাঙ্গনার নারীগণ মূলত আধুনিক
 

“ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,

ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,

আধ-মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।

রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে

আজকে যে যা বলে বলুক তোরে,

সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ করে

পুচ্ছটি তোর উচ্ছে তুলে নাচা।

আয় দুরন্ত, আয় রে আমার কাঁচা।”

 

এখানে কবিকাঁচাবাসবুজবলতে কেবল বয়সে তরুণদের বোঝাননি, বরং মনের দিক থেকে যারা সজীব সাহসী, তাদের আহ্বান জানিয়েছেন। আমাদের সমাজে একদল মানুষ আছে যারা অতীতকে আঁকড়ে ধরে পরিবর্তনের ভয়ে কুঁকড়ে থাকে; কবি তাদেরআধ-মরাবলেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতে, এই জরাজীর্ণ সমাজকে বাঁচাতে হলে নবীনের দলকেই আঘাতে আঘাতে জাগিয়ে তুলতে হবে। তরুণরাঅবুঝকারণ তারা লাভ-ক্ষতির হিসেব কষে না; তারা দুরন্ত গতিতে এসে পুরনো প্রথার খাঁচা ভেঙে দেয়। এই নবজীবন সঞ্চারের চেতনা বিংশ শতাব্দীর সেই আধুনিক মননের বহিঃপ্রকাশ, যা সকল অন্ধকার কাটিয়ে আলোর পথে যাত্রা করতে শেখায়।

 

গতির দর্শন বা গতিতত্ত্ব:

 

বলাকাকাব্যের মূল চালিকাশক্তি হলো এর গতিতত্ত্ব রবীন্দ্রনাথ যখন শ্রীনগরে অবস্থান করছিলেন, তখন সন্ধ্যার অন্ধকারে ঝিলম নদীর ওপর দিয়ে একঝাঁক উড়ন্ত হাঁসের (বলাকা) ডানার ধ্বনি শুনেছিলেন। সেই ডানার শব্দ কবির কানে মহাবিশ্বের গতির সংকেত হিসেবে পৌঁছেছিল। তিনি উপলব্ধি করলেন, মহাবিশ্বের কোনো কিছুই স্থির নয়; পাহাড়, নদী, নক্ষত্রসবই এক অদৃশ্য গতির টানে সম্মুখপানে ধাবমান। কাব্যের নম্বর কবিতাচঞ্চলা’-তে এই গতির দর্শন অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে:

 

হে বিরাট নদী,

অদৃশ্য নিঃশব্দ তব জল

অবিচ্ছিন্ন অবিরল

চলে নিরবধি।

 

এখানেবিরাট নদীমূলত মহাকালেরই প্রতীক। ফরাসি দার্শনিক হেনরি বার্গসঁ-এঁলা ভিতাল’ (Elan Vital) বা সৃজনশীল বিবর্তনবাদের সাথে রবীন্দ্রনাথের এই গতিতত্ত্বের গভীর মিল পাওয়া যায়। কবি বলছেন যে, সৃষ্টির প্রবাহ অবিরত সামনের দিকে বয়ে চলছে। পাহাড় স্থির মনে হলেও তার ভেতরেও গতির স্পন্দন আছে। বিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিজ্ঞান যেমন শিখিয়েছে যে পরমাণুর ভেতরে কণাগুলো সর্বদা ঘূর্ণায়মান, রবীন্দ্রনাথও তেমনি নিখিল বিশ্বের এই নিরন্তর গতির খেলায় মত্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর দর্শনে স্থবিরতা মানেই মৃত্যু, আর গতি মানেই জীবন।

 

স্থবিরতা ভাঙার তারুণ্যের উদ্দীপনা:

 

বলাকা কাব্যে রবীন্দ্রনাথ তরুণদের একলা চলার এবং ভয়কে জয় করার উদ্দীপনা দিয়েছেন। তিনি নম্বর কবিতায় স্পষ্ট করে বলেছেন যে, যারা সময়ের পিছুটানে আটকে থাকবে, তারা পরাজিত হবে। জীবনের পথে চলতে গেলে সংকট আসবে, বাধা আসবে, এমনকি রক্ত ঝরার সম্ভাবনাও আছে, কিন্তু তবুও থেমে যাওয়া চলবে না। তাঁর ভাষায়:

 

আমরা চলি সম্মুখ পানে

কে আমাদের বাঁধবে,

রইল যারা পিছুর টানে

কাঁদবে তারা কাঁদবে।

 

এই কবিতায় কবি রক্ষণশীল পশ্চাৎপদ মানুষদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, যারা নতুন যুগের আহ্বানে সাড়া দিয়ে পথে নামবে না, তারা নতুনের অমৃত আস্বাদ থেকে বঞ্চিত হবে। কবি এখানেরুদ্রবা মহাদেবের শঙ্খধ্বনির রূপক ব্যবহার করেছেন, যা মানুষকে জীর্ণ ঘর ছেড়ে বাইরে আসার ডাক দেয়। এই যে অজানাকে জানার নেশা এবং অজানার দেশে পাড়ি জমানোর সাহস, এটিই বিংশ শতাব্দীর আধুনিক মানুষের মূল বৈশিষ্ট্য।

  

মুক্তির পথে মহাপ্রাণের যাত্রা:

 

রবীন্দ্রনাথের গতির দর্শন কেবল বস্তুজগতে সীমাবদ্ধ নয়, তা মানুষের আত্মিক মুক্তির সাথেও জড়িত। তিনি মনে করেন, মানুষের লক্ষ্য হওয়া উচিতহেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে ৩৬ নম্বর কবিতায় কবি এক নিরুদ্দেশ যাত্রার কথা বলেছেন যেখানে মানুষের আত্মা কোনো এক জায়গায় থমকে থাকতে চায় না:

 

শুনিলাম মানুষের কত বাণী দলে দলে

অলক্ষিত পথে উড়ে চলে

অস্পষ্ট অতীত হতে অস্ফুট সুদূর যুগান্তরে।

শুনিলাম আপন অন্তরে

অসংখ্য পাখির সাথে

দিনরাতে

এই বাসাছাড়া পাখি ধায় আলো-অন্ধকারে

কোন্ পার হতে কোন্ পারে।

 

এই পঙ্ক্তিগুলোতে মানুষের চিরকালীন আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। মানুষ জন্ম-জন্মান্তরের মধ্য দিয়ে এক রহস্যময় যাত্রার অভিযাত্রী। বিংশ শতাব্দীর সংকটকালে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন যে, মানুষ কেবল রক্ত-মাংসের দেহ নয়, তার ভেতরে রয়েছে এক অমর প্রাণশক্তি যা ক্রমাগত নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে চায়। এইবাসাছাড়া পাখিহলো মানুষের মন, যা সীমার গণ্ডি ছাড়িয়ে অসীমের পানে ছুটে চলে।

 

যৌবনের জয়গান আধ্যাত্মিক মুক্তি:

 

কাব্যের ৪৪ নম্বর কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যৌবনকে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করেছেন। তিনি চান না যৌবন কেবল সুখের খাঁচায় বন্দি থাকুক। তিনি যৌবনকে প্রতিকূলতার সমুদ্রে পাড়ি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন:

 

‘চতুর্দশপদী কবিতবলী’ অবলম্বনে মাইকেল
মধুসূদনের প্রার্থনামূলক কবিতাসমূহের পরিচয়
যৌবন রে,

তুই কি রহিবি সুখের খাঁচাতে।

তুই যে পারিস কাঁটাগাছের উচ্চ ডালেরপরে

পুচ্ছ নাচাতে।

………………………......................................

 তুই পথহীন সাগরপারের পান্থ,

তোর ডানা যে অশান্ত অক্লান্ত,

অজানা তোর বাসার সন্ধানে রে

অবাধ যে তোর ধাওয়া,

ঝড়ের থেকে বজ্রকে নেয় কেড়ে

তোর যে দাবি - দাওয়া।

 

যৌবন মানেই হলো ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা। কবি বলছেন, সুখের নিরাপদ কোণে বসে থাকা যৌবনের ধর্ম নয়। বরং ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যে অজানার সন্ধানে উড়াল দেওয়াই তার সার্থকতা। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ এই মৃত্যুঞ্জয়ী জীবনের জয়গান গেয়েছেন। তাঁর মতে, মৃত্যু কোনো শেষ নয়, বরং গতির এক নতুন রূপান্তর। মৃত্যুর সাগর মন্থন করেই জীবনের অমৃতরস খুঁজে আনতে হবে।

 

উপসংহার:

 

পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বলাকা কাব্যগ্রন্থটি কেবল কতগুলো কবিতার সংকলন নয়, এটি বিংশ শতাব্দীর এক অসামান্য ঘোষণাপত্র। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী বিভীষিকা এবং ঔপনিবেশিক স্থবিরতার পটভূমিতে রবীন্দ্রনাথ গতির যে বাণী শুনিয়েছেন, তা ছিল সম্পূর্ণ আধুনিক সময়োপযোগী। তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন যে, জগৎ স্থির নয় এবং মানুষের আত্মাও কোনো এক জায়গায় থমকে থাকতে পারে না।

বলাকাকাব্যে ধ্বনিত হওয়া নতুনের এই আহ্বানযা জরাকে ভেঙে যৌবনকে বরণ করে নেওয়া এবং গতিতত্ত্বের মাধ্যমে মহাবিশ্বের রহস্যকে উপলব্ধি করাতা আজও আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। রবীন্দ্রনাথের বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি কাব্যটিকে সমকালীন গণ্ডি ছাড়িয়ে চিরকালীন আধুনিকতার মর্যাদা দিয়েছে।

No comments

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.