পুরাণাশ্রিত চরিত্র হলেও বীরাঙ্গনার নারীগণ মূলত আধুনিক @HeartAcademy
পুরাণাশ্রিত চরিত্র হলেও বীরাঙ্গনার নারীগণ মূলত আধুনিক
কবি ও কাব্যের প্রেক্ষাপট:
উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অগ্রদূত মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিদ্রোহী ও যুগান্তকারী প্রতিভা। তাঁর পাশ্চাত্য শিক্ষা, হিন্দু কলেজের মুক্তচিন্তা এবং ‘ইয়ং বেঙ্গল’ দলের সংস্পর্শ তাঁকে এক অনন্য আধুনিক ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি দান করেছিল। মধুসূদনই প্রথম কবি যিনি মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা ও পয়ারের শৃঙ্খল ভেঙে বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন করেন, যা ভাব প্রকাশের স্বাধীনতাকে এক নতুন মাত্রা দান করে। তাঁর এই বিদ্রোহী ও সংস্কারমুক্ত কবিমানসের এক সার্থক ফসল হলো ১৮৬২ সালে প্রকাশিত ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’। ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম পত্রকাব্য, যা রোমান কবি ওভিদের ‘হিরোইনস’ (Heroides)-এর আদর্শে রচিত। মধুসূদন পুরাণের চেনা পটভূমি ও চরিত্রের আধারে এমন এক নারী সমাজ সৃষ্টি করেছেন যারা কেবল প্রাচীন সংস্কারের পুতুল নয়, বরং তারা উনিশ শতকের আধুনিক ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনার সার্থক প্রতিনিধি।
পুরাণাশ্রিত পটভূমি ও মধুসূদনের রূপান্তর:
‘বীরাঙ্গনা
কাব্য’-এর প্রতিটি পত্রের
উপাদান গৃহীত হয়েছে রামায়ণ, মহাভারত বা বিভিন্ন পুরাণ
থেকে। কিন্তু মধুসূদন এই পুরাণাশ্রিত নারীচরিত্রগুলোকে
আধুনিক মানুষের সংবেদনশীলতা ও জীবনবোধ দিয়ে
পুনর্নির্মাণ করেছেন। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সাহিত্যে
নারীরা মূলত ছিল ধর্ম, সমাজ ও স্বামীর আজ্ঞাবহ,
যেখানে তাদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর ছিল অবদমিত। মধুসূদন সেই নীরবতাকে ভেঙে নারীর অন্তরের অবরুদ্ধ বেদনা, প্রেম ও বিদ্রোহকে ভাষার
মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি পুরাণকে আধুনিক জীবনের দর্পণে প্রতিফলিত করেছেন, যেখানে দেবত্ব অপেক্ষা মানবত্বই প্রধান হয়ে উঠেছে। কাব্যের নাম ‘বীরাঙ্গনা’ রাখার সার্থকতা এখানেই যে, এখানকার নারীরা তাদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা, তাদের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ এবং অধিকারের কথা সাহসের সাথে উচ্চারণ করতে পেরেছে; তারা কেবল লাঞ্ছিত বা উপেক্ষিত নয়,
বরং বাকসিদ্ধ ও প্রতিবাদী।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও শকুন্তলার অধিকার সচেতনতা:
মধুসূদনের
বীরাঙ্গনাদের মধ্যে যে আধুনিকতা পরিলক্ষিত
হয়, তার মূলে রয়েছে ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ’
(Individualism)। আধুনিক যুগের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের স্বকীয়তা ও অনন্যতাকে স্বীকৃতি
দেয়া।‘বীরাঙ্গনা কাব্য’-এ শকুন্তলা, তারা,
দ্রৌপদী বা জনার মনস্তত্ত্ব
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব আবেগ ও যুক্তির দ্বারা
চালিত।
‘বীরাঙ্গনা কাব্য’-এর প্রথম পত্র
‘দুষ্মন্তের প্রতি শকুন্তলা’-য় আমরা দেখি
তপোবন-কন্যা শকুন্তলা কোনো অসহায় নারী হিসেবে রোদন করছেন না, বরং তিনি রাজা দুষ্মন্তের কাছে তাঁর প্রাপ্য অধিকার দাবি করছেন । দুষ্মন্ত কর্তৃক
পরিত্যক্ত শকুন্তলা যখন তাঁর বঞ্চনার কৈফিয়ত চান, তখন তাঁর কণ্ঠস্বর আধুনিক অধিকারবোধে দীপ্ত হয়ে ওঠে। তিনি প্রশ্ন করেন—
"চির-অভাগিনী
আমি!
জনক
জননী
ত্যজিলা
শৈশবে
মোরে,
না
জানি
কি
পাপে!
পরাণ
বাঁচিল
প্রাণ—পরের
পালনে!
এ
নব
যৌবনে
এবে
ত্যজিলা
কি
তুমি,"
(চরণ: ১৪১-১৪৪)
এখানে শকুন্তলা কেবল এক বিরহিণী নারী নন, বরং তিনি সমাজ ও পুরুষের কাছে নিজের অস্তিত্বের জবাবদিহি চাইছেন, যা ফেমিনিজম বা নারীবাদের এক আদিম অথচ আধুনিক বহিঃপ্রকাশ।
তারা দেবীর বিদ্রোহ ও আদিম মনস্তত্ত্ব:
বীরাঙ্গনা
কাব্যের অন্যতম সাহসী চরিত্র তারা দেবী। ‘সোমের প্রতি তারা’ অংশে আমরা দেখি গুরুপত্নী তাঁর স্বামীর শিষ্যের প্রতি প্রেম নিবেদন করছেন। তৎকালীন সমাজের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত গর্হিত কাজ হলেও কবির আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তা নারীর অবদমিত
কামনার এক সৎ প্রকাশ।
মধুসূদন এখানে মানুষের অবচেতন মনের জটিলতা বা ‘ইনার রিয়ালিটি’ (Inner Reality)
আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন, যা আধুনিক মনস্তত্ত্ববিদ
ফ্রয়েডের তত্ত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। তারা দেবী যখন কুল-মান জলাঞ্জলি দিয়ে তাঁর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে স্থান দেন, তখন তিনি সমাজের তৈরি করা কৃত্রিম নৈতিকতাকে অস্বীকার করেন—
"এস তবে,
প্রাণসখে;
দিনু
জলাঞ্জলি
কুলমানে
তব
জন্যে,—ধর্ম্ম,
লজ্জা,
ভয়!
কুলের
পিঞ্জর
ভাঙ্গি,
কুল-বিহঙ্গিনী
উড়িল
পবন-পথে,
ধর
আসি
তারে,"
(চরণ: ১৭-২০)
এই
পঙক্তিগুলোর মাধ্যমে তারা কেবল প্রেম নিবেদন করছেন না, বরং সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তি পাওয়ার এক আধুনিক আকাঙ্ক্ষা
ব্যক্ত করছেন।
দ্রৌপদীর ঈর্ষা ও রক্ত-মাংসের নারীসত্তা:
মহাভারতের
দ্রৌপদী এক মহিমময়ী দেবীপ্রতিম
চরিত্র হলেও মধুসূদনের ‘অর্জুনের প্রতি দ্রৌপদী’ পত্রে তিনি এক অতি সাধারণ
কিন্তু আধুনিক রক্ত-মাংসের মানবী হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন। অর্জুনের দ্বিতীয় পত্নী সুভদ্রার প্রতি আকর্ষণে দ্রৌপদীর মনে যে আধুনিক ঈর্ষা
ও অভিমান জেগেছে, তা তাঁকে দেবত্বের
আসন থেকে নামিয়ে মানবিক উচ্চতায় বসিয়েছে। অর্জুন যখন ইন্দ্রালয়ে সুভদ্রাকে নিয়ে মত্ত, তখন দ্রৌপদী তীব্র শ্লেষের সাথে তাঁর একনিষ্ঠ প্রেমের অভাবকে তুলে ধরেন—
"হে ত্রিদশালয়-বাসি,
পড়ে
কভু
মনে
এ
পাপ-সংসার
আর?
কেন
বা
পড়িবে?
কি
অভাব
তব,
কান্ত,
বৈজয়ন্ত-ধামে?
দেবভোগ-ভোগী
তুমি,
দেবসভা-মাঝে"
(চরণ: ১-৪)
এখানে দ্রৌপদীর অভিমান কেবল ব্যক্তিগত বিরহ নয়, বরং স্বামীর ওপর একচ্ছত্র অধিকার দাবি করা এক আধুনিক স্ত্রীর প্রতিবাদ।
কেকয়ীর রাজনৈতিক সচেতনতা ও তেজোস্বিতা:
বীরাঙ্গনা
কাব্যের নারীরা কেবল প্রেম বা বিরহে মগ্ন
নয়, বরং তারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন এবং আত্মমর্যাদাবোধে প্রবল। ‘দশরথের প্রতি কেকয়ী’ পত্রে কবি কেকয়ীকে কোনো কূটকৌশলী নারী হিসেবে নয়, বরং রাজাকে তাঁর প্রতিশ্রুতি পালনে বাধ্য করার মতো এক তেজোস্বিনী রূপ
দান করেছেন। সতীন-পুত্র রামের অভিষেক নিয়ে কেকয়ীর কণ্ঠে প্রকাশিত হয় এক দুর্জয়
ঘৃণা ও শ্লেষ। তিনি
দশরথকে সরাসরি মিথ্যাবাদী বলতে দ্বিধাবোধ করেন না—
"হা ধিক্!
কি
কবে
দাসী—গুরুজন
তুমি।
নতুবা
কেকয়ী,
দেব,
মুক্তকণ্ঠে
আজি
কহিত,—'অসত্য-বাদী
রঘুকুল-পতি!
নির্লজ্জ!
প্রতিজ্ঞা
তিনি
ভাঙ্গেন
সহজে!"
(চরণ: ৩৭-৪০)
এই পঙক্তিমালায় কেকয়ীর যে আধুনিক দৃঢ় রূপ ফুটে উঠেছে, তা প্রাচীন যুগের পুরুষের অন্ধ অনুগামিনী নারীর ঠিক বিপরীত।
জনার পুত্রশোক ও দেশপ্রেমের আধুনিক রূপ:
কাব্যের
শেষ স্বর্গ ‘নীলধ্বজের প্রতি জনা’ বীরাঙ্গনাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। পুত্র প্রবীরের হত্যাকারী অর্জুনের সাথে যখন রাজা নীলধ্বজ সন্ধি স্থাপন করেন, তখন বীরাঙ্গনা জনার ক্ষোভ ও ঘৃণা চরম
সীমায় পৌঁছায়। তিনি স্বামীকে পুরুষত্বের অভাবের জন্য তিরস্কার করেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পুত্রের বীরত্বকে গর্বের সাথে স্মরণ করেন। শোকাতুরা জনা যখন দেখেন তাঁর স্বামী পুত্রহন্তার সেবায় মত্ত, তখন তাঁর আত্মমর্যাদাবোধ জেগে ওঠে—
"…………………… ভুলিব এ
জ্বালা,
এ
বিষম জ্বালা, দেব, ভুলিব সত্বরে!
জন্মে
মৃত্যু;—বিধাতার
এ
বিধি
জগতে।
ক্ষত্রকুল-রত্ন
পুত্র
প্রবীর
সুমতি,
সম্মুখসমরে
পড়ি,
গেছে
স্বর্গধামে,—"
(চরণ: ১৬-১৯)
জনা এখানে কেবল একজন মা নন, বরং তিনি একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকও বটে। তাঁর এই দেশপ্রেম ও ক্ষত্রিয়োচিত তেজ আধুনিক যুগের জাতীয়তাবাদী চেতনারই প্রতিফলন বলে মনে হয়।
উপসংহার
পরিশেষে
বলা যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’-এ পুরাণের নারীচরিত্রগুলোকে
কেবল আধুনিক ছাঁচেই ঢালেননি, বরং তাদের দিয়েছেন এক বিশ্বজনীন মানবিক
আবেদন। তাঁর বীরাঙ্গনারা আধুনিক এই অর্থে যে,
তারা আত্মসচেতন, যুক্তিবাদী এবং নিজেদের ভাগ্যবিধাতা হিসেবে নিজেরাই কথা বলতে শিখেছে। পুরাণ ও আধুনিকতার এই
অপূর্ব মেলবন্ধনে মধুসূদনের কবিমানস সার্থকতা লাভ করেছে। সাহিত্যের আধুনিকতা কেবল সময় বা যুগের ওপর
নয়, বরং মনোভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। মধুসূদন প্রমান করেছেন যে, পুরাণাশ্রিত নারী হলেও তাদের হৃদয়ের স্পন্দন চিরকালীন আধুনিক । ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’
উনিশ শতকের সেই নব্য-শিক্ষিত ও প্রগতিশীল চিন্তারই
এক মহত্তম স্মারক, যা আজও বাংলা
সাহিত্যে নারীর শৃঙ্খলমুক্তির কণ্ঠস্বর হিসেবে অমলিন ও প্রাসঙ্গিক।
No comments