আবুল ফজলের দর্শনে সংস্কৃতির প্রতিফলন । Cultural Reflections in Abul Fazal’s Philosophy
আবুল ফজলের দর্শনে সংস্কৃতির প্রতিফলন:
আবুল ফজলের জীবনদর্শন ও সাহিত্যচিন্তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো 'সংস্কৃতি'। তাঁর দৃষ্টিতে সংস্কৃতি কেবল নাচ-গান, বাদ্যযন্ত্র বা কোনো নিছক আমোদ-প্রমোদের বিষয় নয়; বরং এটি মানুষের মননশীলতা ও সজ্জীবনের এক গভীর বহিঃপ্রকাশ। আপনার আপলোডকৃত প্রবন্ধসমূহ এবং অডিও সোর্সগুলোর নিবিড় বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আবুল ফজলের দৃষ্টিতে সংস্কৃতির প্রতিফলন ও স্বরূপ নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
সংস্কৃতির প্রকৃত সংজ্ঞা ও স্বরূপ:
আবুল ফজলের
কাছে
সংস্কৃতি কোনো
বাহ্যিক অলংকার
বা
উৎসব-সর্বস্ব আচার নয়। তিনি
সংস্কৃতির এক
মননশীল
ও
দার্শনিক সংজ্ঞা
প্রদান
করেছেন। তাঁর
মতে,
সংস্কৃতি ও
'সজ্জীবন' (Good life)
সমার্থক। তিনি
মনে
করেন,
যে
জীবন
সুন্দর,
সুস্থ
এবং
বুদ্ধি
দ্বারা
পরিচালিত, সেই
জীবনই
প্রকৃত
সাংস্কৃত জীবন।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বা
'কালচারড' লোক
সম্পর্কে তাঁর
ধারণা
অত্যন্ত স্বচ্ছ। তাঁর
মতে,
একজন
মানুষ
সাংস্কৃত কি
না
তা
তাঁর
ধর্ম
বা
ডিগ্রি
দিয়ে
বিচার
করা
যায়
না।
তিনি
ক্ল্যাভ বেলের
(Clive Bell) বিখ্যাত উক্তি
উদ্ধৃত
করে
বলেন:
"The
civilized man is made not born."
অর্থাৎ, সংস্কৃতি কারো
পৈতৃক
সম্পত্তি নয়
এবং
কেউ
উত্তরাধিকার সূত্রে
এটি
পায়
না।
প্রতিদিনের সচেতন
সাধনার
মাধ্যমেই সংস্কৃতিকে আয়ত্ত
করতে
হয়।
তাঁর
দৃষ্টিতে:
"মনুষ্যত্ব
তথা মানব-ধর্মের সাধনাই সংস্কৃতি এবং একমাত্র এ সাধনাই জীবনকে করতে পারে সুন্দর ও সুস্থ।" (প্রবন্ধ: সংস্কৃতি)
সংস্কৃতির প্রতিফলনের ক্ষেত্রসমূহ:
আবুল ফজল মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের নানা অনুষঙ্গের মধ্যে সংস্কৃতির প্রতিফলন লক্ষ্য করেছেন। তিনি অত্যন্ত সুচারুভাবে দেখিয়েছেন যে, মানুষ যে বিষয়গুলোকে সাধারণত 'সংস্কৃতি' বলে ভুল করে, সেগুলো আসলে সংস্কৃতির মূল কাঠামো নয়।
ক. পোশাক-আশাক ও বাহ্যিক পরিচিতি
আবুল ফজল
দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন
যে,
পোশাক
দিয়ে
মানুষের সংস্কৃতি বিচার
করা
যায়
না।
তাঁর
মতে,
ধুতি-চাদর পরা হিন্দু
সংস্কৃতি নয়,
বরং
এটি
একটি
দেশাচার বা
বিশেষ
সম্প্রদায়ের পোশাক।
তেমনি
আচকান-পায়জামা বা দাড়ি রাখা
মুসলিম
সংস্কৃতি নয়।
তিনি
বলেন,
হ্যাট-কোট বা টাই
পরাও
ইউরোপীয় সংস্কৃতি নয়,
এগুলো
কেবল
আচার
বা
পোশাক
মাত্র।
তাঁর
মতে,
কেউ
দামী
পোশাক
পরলেই
যেমন
সভ্য
হয়
না,
তেমনি
পোশাকের সাধারণত্ব কাউকে
অসভ্য
প্রমাণ
করে
না।
খ. দৈনিক আচার-আচরণ ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা
অনেকে ধর্মীয়
আচার-অনুষ্ঠানকেই সংস্কৃতির প্রতিফলন বলে মনে করেন।
কিন্তু
আবুল
ফজল
একে
কেবল
'পোশাকি
ধর্ম'
বা
আনুষ্ঠানিকতা বলে
অভিহিত
করেছেন। তাঁর
মতে,
মন্দিরে বা
মসজিদে
দীর্ঘ
সময়
কাটানো
বা
ঠোঁটে
তসবিহ
জপ
করা
সংস্কৃতির পরিচয়
নয়।
তিনি
মনে
করেন,
ধর্মের
মূল
কথা
হলো
মানবতা,
আর
সেই
মানবতার বিকাশই
সংস্কৃতির প্রকৃত
প্রতিফলন। যারা
দাঙ্গার সময়
ঈশ্বরের নাম
নিয়ে
অন্যকে
হত্যা
করে,
তাদের
মধ্যে
বিন্দুমাত্র সংস্কৃতির প্রতিফলন নেই
।
তাঁর
বিখ্যাত উক্তি:
"যাদের আল্লাহ
শুধু ঠোঁটে আর তসবিতে তাদের থেকে সাবধান!" (প্রবন্ধ: মানবতন্ত্র)
গ. চিন্তার স্বাধীনতা ও বুদ্ধির মুক্তি
আবুল ফজলের
দৃষ্টিতে সংস্কৃতির অন্যতম
প্রধান
প্রতিফলন হলো
মানুষের 'চিন্তার শক্তি' ও 'বুদ্ধির মুক্তি'।
তাঁর
'সভ্যতার সংকট' প্রবন্ধে তিনি
বর্তমান যুগের
সবচেয়ে
বড়
সংকট
হিসেবে
'চিন্তাহীনতা'কে
চিহ্নিত করেছেন। তিনি
মনে
করেন,
মানুষ
যখন
যান্ত্রিক হয়ে
পড়ে
এবং
নিজে
চিন্তা
করার
শক্তি
হারিয়ে
ফেলে,
তখন
সে
সংস্কৃতি থেকে
চ্যুত
হয়।
তাঁর
মতে,
রেডিও
বাজানো
বা
যন্ত্রের বশবর্তী হওয়া
সংস্কৃতি নয়,
বরং
যুক্তি
ও
বিচারবুদ্ধি দিয়ে
সত্যকে
উপলব্ধি করাই
হলো
সংস্কৃতি। ১৯২৬
সালে
গড়ে
ওঠা
'বুদ্ধির মুক্তি
আন্দোলন'-এর
মূল
মন্ত্রটি ছিল
তাঁর
সকল
চিন্তার মূলে:
"জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আরষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।" (প্রবন্ধ: বুদ্ধির মুক্তি)
ঘ. অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবতাবোধ
সংস্কৃতির একটি
বড়
প্রতিফলন হলো
মানুষের প্রতি
মানুষের শ্রদ্ধাবোধ এবং
অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। আবুল
ফজল
মনে
করেন,
সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতা বা
ধর্মীয়
উগ্রতা
সংস্কৃতির পরিপন্থী। প্রকৃত
সাংস্কৃত ব্যক্তি কখনো
অন্য
ধর্মের
মানুষকে ঘৃণা
করতে
পারে
না।
তিনি
মানুষকে হিন্দু
বা
মুসলমান পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে
'মানুষ'
হিসেবে
দেখার
আহ্বান
জানিয়েছেন। তাঁর
মতে,
অন্য
মানুষকে নিজের
মতো
মানুষ
মনে
করা
এবং
তার
মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়াই
হলো
সংস্কৃতির সারকথা।
ঙ. সমাজ পরিচালনা ও রাষ্ট্রীয় আদর্শ
আবুল ফজল
মনে
করেন,
একটি
রাষ্ট্রের আদর্শ
হওয়া
উচিত
'মানবতন্ত্র', যা
সংস্কৃতিরই একটি
রাজনৈতিক রূপ।
রাষ্ট্র যদি
নাগরিকদের নিরাপত্তা, অন্ন-বস্ত্র এবং অবসরের
সংস্থান করতে
না
পারে,
তবে
সেখানে
সংস্কৃতির চর্চা
সম্ভব
নয়।
তিনি
তাজমহলের উদাহরণ
টেনে
বলেন
যে,
শাহজাহান এর
নির্মাণে বিপুল
ব্যয়কে
অপব্যয়
মনে
করেননি
বলেই
তাঁর
সংস্কৃতিবোধ অমরত্ব
পেয়েছে। কিন্তু
আধুনিক
যুগে
যদি
কেউ
বই
কেনাকে
অপব্যয়
মনে
করে
জীবন
বীমার
কিস্তি
বাড়ানোকেই জীবনের
সার্থকতা মনে
করে,
তবে
তার
মধ্যে
সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটেনি।
চ. মানব-কল্যাণ
ও মর্যাদা
সংস্কৃতির প্রতিফলন কেবল
দয়া
বা
দাক্ষিণ্যের মধ্যে
নয়,
বরং
মানুষের মর্যাদা রক্ষার
মধ্যে
নিহিত।
তাঁর
'মানব-কল্যাণ' প্রবন্ধে তিনি
বলেছেন
যে,
স্রেফ
ভিক্ষা
দেওয়া
বা
রিলিফ
বণ্টন
করা
সংস্কৃতি নয়।
বরং
মানুষকে স্বাবলম্বী করে
তোলা
এবং
তার
আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করাই
হলো
সংস্কৃতির কাজ।
তাঁর
ভাষায়:
"মানুষের স্বাভাবিক অধিকার আর মর্যাদার স্বীকৃতি আর প্রতিষ্ঠা ছাড়া মানব-কল্যাণ অপমানে পরিণত না হয়ে পারে না।" (প্রবন্ধ: মানব-কল্যাণ)
৩. সংস্কৃতির
অন্তরায়: যান্ত্রিকতা ও অন্ধ বিশ্বাস
আবুল ফজল
সংস্কৃতির প্রতিফলনের পথে
সবচেয়ে
বড়
বাধা
হিসেবে
চিহ্নিত করেছেন
'যান্ত্রিকতা' এবং 'উৎকট বিশ্বাস'কে। তিনি আলবার্ট সোয়াইৎজারের (Albert Schweitzer) উক্তি উদ্ধৃত
করে
দেখিয়েছেন যে,
আধুনিক
মানুষ
চিন্তাহীনতার ব্যাধিতে আক্রান্ত। মানুষ
যখন
নিজের
বুদ্ধি
প্রয়োগ
না
করে
অন্ধভাবে কোনো
গুজব
বা
রাজনৈতিক প্রচারণা বিশ্বাস করে,
তখন
সে
সংস্কৃতির পথ
থেকে
বিচ্যুত হয়।
তিনি
মনে
করেন,
মহত্ত্ব ও
সৌন্দর্যের সাধনাই
হলো
সংস্কৃতি, আর
এই
সাধনা
প্রতিদিনের জীবনে
যাপন
করতে
হয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা
যায়,
আবুল
ফজলের
দৃষ্টিতে সংস্কৃতি কোনো
নিথর
জড়
বস্তু
নয়,
এটি
একটি
চলিষ্ণু জীবনবোধ। তিনি
সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখেছেন মানুষের যুক্তি,
বিচারবুদ্ধি, অসাম্প্রদায়িকতা এবং
সর্বোপরি মানুষের মর্যাদাবোধের মধ্যে।
তাঁর
মতে,
প্রকৃত
সংস্কৃতিবান ব্যক্তি তিনিই,
যিনি
নিজের
মনুষ্যত্বকে জাগ্রত
করেছেন
এবং
অন্য
মানুষের অধিকারের প্রতি
শ্রদ্ধাশীল।
তাঁর নিজের
ভাষায়
সংস্কৃতির চরম
উদ্দেশ্য হলো:
"সযতনে নিজের মুসলমানিত্ব কি হিন্দুয়ানিও রক্ষা করবো এবং সঙ্গে সঙ্গে ‘মানুষ’ হিসেবেও বড় ও মহৎ হবো—এ হয় না, যেমন হয় না নিজ নিজ পুকুরে গোসল করে সমুদ্র-স্নানের স্বাদ পাওয়া।" (প্রবন্ধ: মানবতন্ত্র)
আবুল ফজলের
এই
সংস্কৃতি-ভাবনা
কেবল
তাঁর
সমকালকেই পথ
দেখায়নি, বরং
বর্তমানের অসহিষ্ণু ও
যান্ত্রিক সমাজেও
মুক্তির এক
শাশ্বত
আলোকবর্তিকা হিসেবে
কাজ
করে।
তাঁর
মতে,
সংস্কৃতির সাধনাই
জীবনকে
সুন্দর
ও
সুস্থ
করতে
পারে
এবং
এই
সাধনাই
মানুষকে প্রকৃত
'মানুষ'
হিসেবে
গড়ে
তোলে।
No comments