মানবতন্ত্র কী? মানবতাবোধ বা মানবতন্ত্র বলতে আবুল ফজল কী বুঝিয়েছেন?
মানবতন্ত্র কী? মানবতাবোধ বা মানবতন্ত্র বলতে আবুল ফজল কী বুঝিয়েছেন?
আবুল ফজলের লেখনী ও জীবনদর্শনে 'মানবতন্ত্র' কেবল একটি শব্দ নয়, বরং এটি একটি গভীর জীবনবোধ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি আদর্শিক ভিত্তি। তাঁর আপলোডকৃত প্রবন্ধসমূহ এবং অডিও সোর্সগুলোর ওপর ভিত্তি করে মানবতন্ত্র ও মানবতাবোধের স্বরূপ নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
মানবতন্ত্রের সংজ্ঞা ও স্বরূপ:
আবুল ফজল
'মানবতন্ত্র' শব্দটিকে একটি
আধুনিক
রাজনৈতিক ও
সামাজিক পরিভাষা হিসেবে
ব্যবহার করেছেন। অডিও
সোর্সে
উল্লেখ
করা
হয়েছে
যে,
যেমন
আমরা
'তন্ত্র'
বলতে
'গণতন্ত্র' (জনগণের
বিধান)
বা
'সমাজতন্ত্র' (সমাজের
বিধান)
বুঝি,
আবুল
ফজল
তেমনি
মানুষের ওপর
ভিত্তি
করে
'মানবতন্ত্র' শব্দটি তৈরি
করেছেন
[৩১৯]। তাঁর মতে,
রাষ্ট্র ও
সমাজের
মূল
কেন্দ্রবিন্দু হওয়া
উচিত
'মানুষ'
এবং
মানুষের কল্যাণ।
তাঁর 'মানবতন্ত্র' প্রবন্ধের শুরুতে
তিনি
অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ঘোষণা
করেছেন:
"জাতীয় আদর্শের ধারণা
সকলের
এক
নয়।
সাহিত্যিকের কাছে
সত্যই
বড়
কথা।
সত্যের
সঙ্গে
যদি
জাতীয়
আদর্শ,
ধর্ম
বা
শাস্ত্রের বিরোধ
ঘটে
নিঃসন্দেহে বিনা
দ্বিধায় সাহিত্যিক সত্যের
পক্ষাবলম্বন করবে।"
আবুল ফজলের দৃষ্টিতে মানবতন্ত্রের স্বরূপ হলো এমন এক ব্যবস্থা যেখানে ধর্ম বা রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে মানুষের রক্ত-মাংসের অস্তিত্ব এবং তার মর্যাদা বড় হয়ে ওঠে। তিনি মনে করেন, কোনো রাষ্ট্র যদি শুধু ধর্মের দোহাই দিয়ে চলে কিন্তু সেখানে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা না থাকে, তবে তা ব্যর্থ। তাঁর ভাষায়: "কোনো রকম ধর্মতন্ত্র নয়, মানবতন্ত্রকেই করতে হবে আজ সব দেশের ও সব রাষ্ট্রের আদর্শ।"
মানবতাবোধ: অন্তরের ধর্ম বনাম আনুষ্ঠানিকতা:
আবুল ফজলের
কাছে
মানবতাবোধ কোনো
বিমূর্ত ধারণা
নয়,
বরং
এটি
মানুষের প্রতি
মানুষের মমত্ববোধ এবং
শ্রদ্ধাবোধ। তিনি
তথাকথিত 'পোশাকি
ধর্ম'
বা
'সাম্প্রদায়িকতা'র
বিপরীতে খাঁটি
মানবতাকে স্থান
দিয়েছেন। তিনি
লক্ষ্য
করেছেন
যে,
দাঙ্গার সময়
মানুষ
আল্লার
নাম
নিয়েই
অন্য
মানুষকে হত্যা
করে।
এই
অমানবিকতার বিরুদ্ধে তিনি
বার্নাড শ'র একটি বিখ্যাত উক্তিকে কিছুটা
পরিবর্তন করে
ব্যবহার করেছেন:
"যাদের আল্লাহ
শুধু ঠোঁটে আর তসবিতে তাদের থেকে সাবধান!"
তিনি মনে
করেন,
ধর্মের
আনুষ্ঠানিকতা মানুষকে বিভক্ত
করে,
কিন্তু
মানবতাবোধ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে।
তাঁর
মতে,
ধর্ম
যদি
মানুষের মনুষ্যত্বের পরিপূরক না
হয়,
তবে
ধর্মের
কোনো
সার্থকতা নেই।
'মানবতন্ত্র' প্রবন্ধে তিনি
লিখেছেন:
"মানুষকে অমানুষিকতার হাত থেকে বাঁচাতে হলে মানবতাকেই করতে হবে একমাত্র অবলম্বন।"
মানবতন্ত্রের
মূল ভিত্তি: মানুষের মর্যাদা ও অস্তিত্ব:
আবুল ফজলের
মানবতন্ত্রের অন্যতম
প্রধান
স্তম্ভ
হলো
'হিউম্যান ডিগনিটি' বা মানুষের মর্যাদা। তিনি
বিশ্বাস করেন,
প্রতিটি মানুষের মধ্যে
এক
অসীম
ও
অনন্ত
সম্ভাবনার বীজ
রয়েছে
।
তিনি
অস্তিত্ববাদ বা
Existentialism-এর
প্রসঙ্গ টেনে
বলেছেন
যে,
মানুষের অস্তিত্বের স্বীকৃতিই হলো
বড়
কথা।
একজন
মানুষের যখন
আত্মমর্যাদা থাকে
না,
তখন
সে
দাতা
বা
রাষ্ট্রের অনুগ্রহপ্রার্থী হয়ে
পড়ে,
যা
তার
মনুষ্যত্বকে খর্ব
করে।
'মানব-কল্যাণ' প্রবন্ধে তিনি
এ
সম্পর্কে বলেছেন:
"মানুষের
স্বাভাবিক অধিকার আর মর্যাদার স্বীকৃতি আর প্রতিষ্ঠা ছাড়া মানব-কল্যাণ অপমানে পরিণত না হয়ে পারে না।"
তিনি আরও
মনে
করেন
যে,
বল
প্রয়োগ
বা
সামরিক
শাসন
দিয়ে
মানুষকে তাবেদার বানানো
যায়,
কিন্তু
মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা
যায়
না।
বুদ্ধির মুক্তি ও চিন্তার স্বাধীনতা:
মানবতন্ত্রের আরেকটি
অপরিহার্য ভিত্তি
হলো
'বুদ্ধির মুক্তি'।
আবুল
ফজল
১৯২৬
সালে
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে
গড়ে
ওঠা
'মুসলিম
সাহিত্য সমাজ'
এবং
'বুদ্ধির মুক্তি
আন্দোলন'-এর
একজন
সক্রিয়
কর্মী
ছিলেন।
এই
আন্দোলনের মূল
মন্ত্রটি ছিল
তাঁর
সকল
চিন্তার মূলে:
"জ্ঞান যেখানে
সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আরষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।"
তাঁর 'সভ্যতার সংকট' প্রবন্ধে তিনি বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন 'চিন্তাহীনতা' কে। তিনি আলবার্ট সোয়াইৎজারের (Albert Schweitzer) উক্তি উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন যে, মানুষ আজ যন্ত্রের বশবর্তী হয়ে নিজের চিন্তা করার শক্তি হারিয়ে ফেলছে। তিনি মনে করেন, মানুষ যখন নিজে চিন্তা করতে পারে না, তখন সে ক্ষমতাসীনদের অন্ধ প্রচারণা বা গুজবে বিশ্বাস করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মেতে ওঠে। আবুল ফজলের মতে, মানবতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের যুক্তি ও বিচারবুদ্ধিকে জাগ্রত করা প্রয়োজন।
অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মের সঠিক উপলব্ধি:
আবুল ফজল
ধর্মের
বিরোধী
ছিলেন
না,
কিন্তু
ধর্মের
নামে
ভণ্ডামি ও
সাম্প্রদায়িকতার ঘোর
বিরোধী
ছিলেন।
তাঁর
মতে,
সাহিত্যিকের আল্লাহ
হলেন
'আল্ হককুন' বা সত্য।
তিনি
পাকিস্তান ও
হিন্দুস্তানের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সমালোচনা করে
বলেছেন
যে,
রাজনীতিবিদরা এখন
ধর্মের
বুলি
আওড়াচ্ছেন কিন্তু
তারা
ধর্ম
পালনে
বিশ্বাসী নন।
তিনি অত্যন্ত সাহসের
সাথে
লিখেছেন:
"আমার বিশ্বাস
খাঁটি অর্থে যারা ধার্মিক তারা কখনো নিজের কি অপরের মনুষ্যত্বকে
আঘাত হানতে পারে না—পারে না মানবতাকে কিছুমাত্র খাটো করতে।"
তিনি মনে
করেন,
ধর্ম
ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ব্যাপার এবং
তা
সামাজিক বা
রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে টেনে
আনা
উচিত
নয়।
রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে যদি
অশরীরী
ধর্মকে
টেনে
আনা
হয়,
তবে
সেখানে
'গোঁজামিল' ও
'ফাঁকি'র সৃষ্টি হয়।
তিনি
মানুষকে হিন্দু
বা
মুসলমান পরিচয়ের আগে
'মানুষ' হিসেবে দেখার
আহ্বান
জানিয়েছেন। তাঁর
মতে,
মানুষের জন্য
ধর্ম
হওয়া
উচিত,
ধর্মের
জন্য
মানুষ
নয়।
ইহলোক বনাম পরলোক ভাবনা:
আবুল ফজলের
মানবতন্ত্রের একটি
বাস্তববাদী দিক
হলো
ইহলোককে গুরুত্ব দেওয়া।
তিনি
মনে
করেন,
মানুষ
মৃত্যুর পর
স্বর্গে গেল
কি
নরকে
গেল,
তা
নিয়ে
দুশ্চিন্তা করার
চেয়ে
সে
জীবিত
অবস্থায় সৎ
ও
সামাজিক ছিল
কি
না,
তা
অনেক
বেশি
গুরুত্বপূর্ণ ।
তিনি
লিখেছেন:
"যা পরকালের
সঙ্গে জড়িত, অর্থাৎ ধর্ম, তার ওপর জোর না দিয়ে যা এ জীবনের সঙ্গে জড়িত, অর্থাৎ মানবতার ওপর জোর দেওয়াই উচিত।"
তিনি মনে করেন, অলৌকিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সমাজ কখনোই টেকসই হয় না। সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পূর্ণ লৌকিক ব্যাপার, তাই একে লৌকিক বা পার্থিব যুক্তি দিয়েই পরিচালনা করতে হবে।
সংস্কৃতি ও সজ্জীবন:
আবুল ফজলের
দৃষ্টিতে সংস্কৃতি মানে
নিছক
নাচ-গান বা ধর্মীয়
আচার
নয়।
তাঁর
মতে,
সংস্কৃতি ও
'সজ্জীবন' (Good life) সমার্থক। 'সংস্কৃতি' প্রবন্ধে তিনি
ক্ল্যাভ বেলের
(Clive Bell) একটি
বিখ্যাত উক্তি
উদ্ধৃত
করেছেন:
"The
civilized man is made not born."।
তিনি মনে
করেন,
প্রতিদিনের সচেতন
সাধনার
মাধ্যমে মনুষ্যত্ব অর্জন
করাই
হলো
সংস্কৃতি। পোশাক-আশাক বা বাহ্যিক পরিচিতি দিয়ে
সংস্কৃতি বিচার
করা
যায়
না।
তাঁর
মতে:
"মনুষ্যত্ব
তথা মানব-ধর্মের সাধনাই সংস্কৃতি এবং একমাত্র এ সাধনাই জীবনকে করতে পারে সুন্দর ও সুস্থ।"
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, আবুল ফজলের 'মানবতন্ত্র' হলো এক উন্নততর জীবনদর্শন, যেখানে মানুষের মর্যাদা, যুক্তি, চিন্তার মুক্তি এবং অসাম্প্রদায়িকতাই শেষ কথা। তিনি এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছেন যেখানে ধর্মের চেয়ে মানুষকে বেশি ভালোবাসবে সবাই। তাঁর নিজের ভাষায়: "অন্য মানুষটাও আমার মতই মানুষ—এ বোধ ও চেতনাকে ব্যাপক ও ব্যবহারিক করে তুলতে না পারলে মানুষের রক্ষা নেই।" আবুল ফজলের এই মানবতন্ত্রী চিন্তা কেবল তাঁর সমকালেই নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও মুক্তির এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।

No comments