শহীদুল জহিরের গল্পে জাদুবাস্তবতার প্রতিফলন । Echoes of Magical Realism in Shahidul Zahir’s Fiction
শহীদুল জহিরের গল্পে জাদুবাস্তবতার প্রতিফলন
ম্যাজিক রিয়েলিজম বা জাদুবাস্তবতা: সংজ্ঞা ও স্বরূপ:
জাদুবাস্তবতা শব্দটির প্রথম ব্যবহার ঘটে ১৯২৫ সালে জার্মান শিল্প সমালোচক ফ্রাঞ্জ রোহের মাধ্যমে, যিনি চিত্রশিল্পে দৈনন্দিন জীবনের সাথে অতিপ্রাকৃতের উপস্থাপনা বোঝাতে এটি ব্যবহার করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৯ সালে আলেহো কারপেন্টিয়ারের প্রবন্ধ এবং ১৯৫৫ সালে অ্যাঞ্জেল ফ্লোরেসের প্রয়োগের মাধ্যমে ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যে এটি একটি স্বতন্ত্র আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘নিঃসঙ্গতার একশো বছর’ এই ধারাটিকে বিশ্বসাহিত্যে অনন্য উচ্চতায় নিয় যায়। বাংলা সাহিত্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসে এর সার্থক প্রয়োগ ঘটালেও ছোটগল্পে এই ধারার সবচেয়ে প্রবল ও সফল ব্যবহার দেখা যায় শহীদুল জহিরের লেখায়।
ম্যাজিক রিয়েলিজমের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
জাদুবাস্তবতাকে চিনে নেওয়ার জন্য তাত্ত্বিকরা বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যের
কথা উল্লেখ করেছেন:
১. যুক্তিহীনতা ও
আকস্মিকতা: এই ধারায় ঘটনা বা পরিস্থিতি প্রথাগত যুক্তির
তোয়াক্কা না করে এগিয়ে যায়। অলৌকিক কোনো ঘটনাকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে আখ্যানে নিয়ে
আসা হয়।
২. বাস্তব ও অতিপ্রাকৃতের
মিলন: এটি বাস্তববাদ ও ফ্যান্টাসির একটি সূক্ষ্ম মিশেল,
যেখানে অতিপ্রাকৃত উপাদানগুলো বাস্তবের মতোই বিস্তৃত থাকে।
৩. ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক
প্রেক্ষাপট: ফ্যান্টাসির সাথে এর মূল পার্থক্য হলো এটি সবসময়
গভীর সামাজিক, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিষয়াদিকে প্রতিফলিত করে।
৪. সময়ের সরলরৈখিক
ধারণা ভেঙে দেওয়া: এখানে সময় একরৈখিক বা লিনিয়ার নয়। চরিত্রগুলো
ভবিষ্যতের মতো করেই অতীতে বিচরণ করতে পারে, যা আখ্যানে এক ধরনের গোলকধাঁধা তৈরি করে।
৫. চরিত্রদের স্বাভাবিক
প্রতিক্রিয়া: জাদুবাস্তব সাহিত্যে অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটলে গল্পের
চরিত্ররা বিস্মিত হয় না, বরং সেটিকে খুবই স্বাভাবিক ও সম্ভবপর বলে মেনে নেয়।
৬. পুনরাবৃত্তি ও বৃত্তীয় আখ্যান: একই ঘটনা বা সংলাপের বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটে, যা জীবন ও সমাজের অসংগতিগুলোকে চিহ্নিত করে।
শহীদুল জহিরের গল্পে জাদুবাস্তবতার প্রতিফলন:
শহীদুল জহিরের গল্পে জাদুবাস্তবতা কেবল অলঙ্কার নয়, বরং তা তাঁর জীবনদর্শন ও সমাজবাস্তবতা প্রকাশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর প্রয়োগশৈলীর বিশেষ দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
সময়ের বিবর্তন ও গোলকধাঁধা: শহীদুল জহির তাঁর গল্পে সময়ের প্রথাগত ফ্রেম ভেঙে দেন। তাঁর চরিত্ররা স্মৃতির অতীতে বিচরণ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। 'প্রথম বয়ান' গল্পে আব্দুল রহমান ৪০ বছর আগের একটি রাস্তার বাতির খাম্বা খুঁজে বেড়ায়, যা তার স্মৃতিকাতরতা ও মানসিক বিভ্রান্তির এক অদ্ভুত মিশ্রণ। লেখক নিজেই বলেছেন, তিনি সময়ের একতল থেকে অন্যতলে অনায়াসে যাতায়াত করতে চেয়েছিলেন কারণ লিনিয়ার ধারাবাহিকতা তাঁর কাছে ক্লান্তিকর মনে হয়েছিল।
পুনরাবৃত্তি ও ভাষার কারুকাজ: একই সংলাপের বারবার ব্যবহার শহীদুল জহিরের একটি অনন্য কৌশল। 'কোথায় পাবো তারে' গল্পে আব্দুল আজিজ ব্যাপারী ও আব্দুল করিমের ডালপুরি খাওয়ার দৃশ্যটি বারবার ফিরে আসে। ডালপুরি খেতে খেতে করিমের বিখ্যাত উক্তি— "ডাইলপুরির মইদ্দে ডাইল নাইকা, হুদা আলু!" —একদিকে যেমন হাসির উদ্রেক করে, অন্যদিকে তেমনি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির রূঢ় বাস্তবতাকে তুলে ধরে। এই পুনরাবৃত্তি পাঠককে এক ধরনের ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়।
অবিশ্বাস্য বাস্তব ও সামাজিক নিষ্পেষণ: 'আমাদের বকুল' গল্পে জাদুবাস্তবতার একটি চরম রূপ দেখা যায় যখন বকুলকে লাল পিঁপড়েরা খেয়ে ফেলে। আক্ষরিক অর্থে এটি অসম্ভব হলেও এর অন্তর্নিহিত লক্ষ্য হলো সমাজের ক্ষমতাবানদের দ্বারা সাধারণ মানুষের নিষ্পেষণ ও লাঞ্ছনাকে প্রতিকায়িত করা। এখানে লাল পিঁপড়ারা মূলত শোষক শ্রেণির প্রতীক, যারা সাধারণ মানুষের সম্পদ ও জীবনকে হরণ করে। আকালুর স্ত্রী ফাতেমার অন্তর্ধান এবং বকুলের করুণ পরিণতি একই সূত্রে গাঁথা।
প্রতীকী চরিত্র ও রাজনৈতিক বাস্তবায়ন: 'ইন্দুর-বিলাই খেলা' গল্পে লেখক ছক কেটে রাজনীতির এক ভয়াবহ রূপ দেখিয়েছেন। এখানে মুক্তিযোদ্ধা বা সাধারণ মানুষ কখনো 'ইন্দুর' (ইঁদুর) আর রাজাকার বা পাকিস্তানি বাহিনী 'বিলাই' (বিড়াল) হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে সাথে এই ভূমিকাগুলোও বদলে যায়। একইভাবে 'মহল্লায় বান্দর, আব্দুল হালিম এর মা এবং আমরা' গল্পে বানরেরা যখন আস্ত পিস্তল চুরি করে নিয়ে যায়, তখন তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও পেশী শক্তির আস্ফালনকে ইঙ্গিত করে। বানর এখানে সমাজের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের এক অদ্ভুত ছদ্মবেশ।
রহস্যময়তা ও সমাপ্তিহীনতা: 'ডলু নদীর হাওয়া' গল্পে তৈমুর আলী ও সমর্থ বানুর দাম্পত্য জীবনের হীরের আংটি ও বিষ মেশানো পানির খেলাটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রহস্য। ৪০ বছর ধরে চলা এই খেলায় তৈমুর আলীর মৃত্যু হয়, কিন্তু গল্পের শেষে দেখা যায় আংটিটি হীরের নয় বরং কাঁচের ছিল। এই আকস্মিক পরিবর্তন পাঠককে নতুন এক বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়—তৈমুরের মৃত্যু কি সত্যিই বিষে নাকি সাধারণ হৃদরোগে? এই রহস্যময়তাই জহিরের জাদুবাস্তবতার প্রাণ।
শহীদুল জহিরের জাদুবাস্তবতার মূল লক্ষ্য:
শহীদুল জহিরের গল্পে জাদুবাস্তবতার প্রয়োগের
পেছনে বেশ কিছু গভীর লক্ষ্য নিহিত ছিল:
পেশাগত সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবাদের ভাষা: শহীদুল জহির পেশায় একজন উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা বা সচিব ছিলেন। সরকারি চাকুরিজীবী হওয়ায় তাঁর পক্ষে সরাসরি সরকারের সমালোচনা বা সমাজের নগ্ন অসঙ্গতিগুলো প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না। তাই তিনি জাদুবাস্তবতার আড়ালে সমাজের নেতিবাচক দিক, স্বৈরশাসন ও অরাজকতাকে শৈল্পিকভাবে তুলে ধরেছেন। এটি তাঁর প্রতিবাদের এক স্বতন্ত্র ভাষা।
বাস্তবতার রূঢ়তম প্রকাশ: জহির বিশ্বাস করতেন মানুষের জীবন স্বপ্নের মধ্য দিয়েই কাটছে এবং সংস্কার-কুসংস্কার বাস্তবতারই অংশ। তিনি তথাকথিত 'বাস্তবতা'র বাইরে গিয়ে জীবনের গভীর সত্যকে ধরতে চেয়েছেন। তাঁর মতে, যা অলৌকিক বলে মনে হয়, তা আসলে বাস্তবতারই এক ভিন্নতর রূপ। বকুলকে পিঁপড়ে খেয়ে ফেলা বা বানরের পিস্তল চুরির মাধ্যমে তিনি সেই কঠিন সত্যকেই সামনে এনেছেন যা সরাসরি বলা সম্ভব ছিল না।
ইতিহাস ও চেতনার পুনর্জাগরণ: তাঁর অনেক গল্পে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ফিরে ফিরে আসে স্মৃতির মলাটে। জহির অনুভব করেছিলেন যে বর্তমানের অস্থিরতা থেকে মুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনায় ফিরে যাওয়া প্রয়োজন। জাদুবাস্তবতার মাধ্যমে তিনি ইতিহাসের সেই ট্রমা বা ক্ষতগুলোকে বর্তমানের সাথে যুক্ত করেছেন।
আঞ্চলিক ও ভাষিক পরিচিতি: পুরনো ঢাকার জনজীবন, ভাষা এবং মানুষের মনস্তত্ত্বকে এক অখণ্ড রূপে উপস্থাপন করাও তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ছিল। তাঁর গল্পে একক কোনো নায়ক নেই, বরং অসংখ্য চরিত্রের সমাবেশে একটি 'যৌথ জীবন' ফুটে ওঠে, যা অনেকটা মিখাইল বাখতিনের কার্নিভাল তত্ত্বের মতো।
পরিশেষে বলা যায়, শহীদুল জহিরের গল্পে
জাদুবাস্তবতা কেবল কোনো বিদেশী তত্ত্বের অনুকরণ নয়, বরং এটি বাংলার নিজস্ব লোকগাথা,
সংস্কার এবং রূঢ় সমাজবাস্তবতার এক অনবদ্য সংশ্লেষ। তিনি এমন এক শিল্পভাষা নির্মাণ করেছেন
যেখানে অবাস্তব বর্ণনাই সবচেয়ে বড় বাস্তব হয়ে ধরা দেয় এবং পাঠককে সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির
গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। বাংলা ছোটগল্পে জাদুবাস্তবতার এই প্রয়োগ শহীদুল
জহিরকে এক অনন্য ও কালজয়ী আসনে আসীন করেছে।
No comments