আলাউদ্দিন আল আজাদের 'জেগে আছি' মার্কসবাদী ও রাজনৈতিক চেতনার এক শিল্পরূপ । Jege Achi: Azad's Marxist consciousness @HeartAcademy
আলাউদ্দিন
আল আজাদের 'জেগে আছি' মার্কসবাদী ও রাজনৈতিক চেতনার এক শিল্পরূপ:
আলাউদ্দিন আল আজাদের (১৯৩২-২০০৯) প্রথম গল্পগ্রন্থ 'জেগে আছি' (১৯৫০) বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্পের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। মাত্র সতেরো-আঠারো বছর বয়সের এক তরুণের কলমে তৎকালীন সমাজ বাস্তবতার যে নগ্ন রূপ এবং শোষিত মানুষের জাগরণের চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কেবল বিস্ময়করই নয়, বরং তা গভীর মার্কসবাদী ও রাজনৈতিক চেতনার এক শিল্পরূপ। এই গ্রন্থে লেখক কেবল গল্প বলেননি, বরং সমাজের শ্রেণি-দ্বন্দ্ব, শোষণ-বঞ্চনা এবং নিম্নবর্গীয় মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের এক রাজনৈতিক ইশতেহার তুলে ধরেছেন। নিম্নে 'জেগে আছি' গল্পগ্রন্থের আলোকে আলাউদ্দিন আল আজাদের মার্কসবাদী ও রাজনৈতিক চেতনার স্বরূপ আলোচনা করা হলো:
মার্কসবাদী
দর্শনের ভিত্তি ও শ্রেণি-সংগ্রাম:
আলাউদ্দিন আল আজাদের রাজনৈতিক চেতনার মূলে ছিল মার্কসবাদী দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ শোষক ও শোষিত— এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত এবং এই দুই শ্রেণির দ্বন্দ্বই ইতিহাসের মূল চালিকাশক্তি। 'জেগে আছি' গ্রন্থের অধিকাংশ গল্পে এই দর্শনের নিবিড় প্রতিফলন দেখা যায়। এখানে শোষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জমিদার, জোতদার, পুলিশ এবং সুবিধাবাদী মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি, আর শোষিত হিসেবে চিত্রিত হয়েছে কৃষক, মজুর, প্রাথমিক শিক্ষক এবং প্রান্তিক কিশোররা। লেখক নিজেই বলেছেন যে এই গল্পগুলোর শ্রেণি-সংগ্রাম মূলত তার নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতারই অংশ।
শোষিত মানুষের
জাগরণ ও সম্মিলিত প্রতিরোধ:
মার্কসবাদী দর্শনের একটি প্রধান দিক
হলো শোষিত শ্রেণির ঐক্যবদ্ধ হওয়া। আজাদের গল্পে এই সম্মিলিত প্রতিরোধ বারবার ফিরে এসেছে।
'মুখোমুখী' গল্পে আমরা দেখি ধান কাটার মজুররা যখন তাদের
ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়, তখন তারা জোতদার ও পুলিশের রাইফেলের সামনে রুখে দাঁড়ায়।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বৃদ্ধ রহিম বক্স সাহসের প্রতীক হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। তার
বলিষ্ঠ উক্তি— "আমি বুড়া মানুষ, মরলেও কোন ক্ষতি
নাই, আমি সামনে দাঁড়াই"— নিম্নবর্গীয় মানুষের অপরাজেয়
চেতনার এক অমর সংলাপে পরিণত হয়েছে। এটি কেবল ব্যক্তিক বীরত্ব নয়, বরং একটি শ্রেণির
সম্মিলিত জাগরণের ইঙ্গিত।
'সৃষ্টি' গল্পে মাহমুদ পণ্ডিত নামক এক দরিদ্র শিক্ষকের মাধ্যমে লেখক বুর্জোয়া ও শোষক শ্রেণির হীন মানসিকতাকে তুলে ধরেছেন। জোতদার কাসেম আলী চৌধুরী যখন স্কুল ঘরকে গোয়াল ঘরে পরিণত করতে চায়, তখন শিক্ষক তার প্রতিবাদ করেন এবং নির্যাতিত হন। শেষ মুহূর্তে জ্ঞান ফেরার পর তার উপলব্ধি— "এখানে বড় বেদনা আমার বেদনা তোমাদের বেদনা হয়ে উঠুক এই আমি চাই"— ব্যক্তিগত দুঃখকে সমষ্টিগত বিদ্রোহে রূপান্তরের মার্কসবাদী আহ্বানকেই স্পষ্ট করে।
রাষ্ট্রীয়
শোষণ ও কিশোর বিদ্রোহ:
লেখক দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রযন্ত্র এবং
তার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব সময় শোষক শ্রেণির লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করে।
'ফেরার' গল্পে এই রাজনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত তীব্র। ১৫
বছরের কিশোর হারুন কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হওয়ার কারণে তার সরকারি কর্মকর্তা বাবা
তাকে ঘরে অন্তরীণ করে রাখেন এবং নির্মমভাবে প্রহার করেন, কারণ তার রাজনৈতিক আদর্শ বাবার
চাকরির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। হারুন পালিয়ে গিয়ে মজুরদের সঙ্গে কাজ করে এবং অসুস্থ
অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। মৃত্যুর পর পুলিশের আগমনে যে ব্যাঙ্গাত্মক চিত্র লেখক এঁকেছেন,
তা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নগ্ন স্বরূপ প্রকাশ করে। হারুনের সেই তেজস্বী উক্তি— "স্ট্রাইক
শেষ নয় এ হলো সবে মাত্র লড়াইয়ের শুরু"— বিপ্লবের
মন্ত্র হয়ে ধ্বনিত হয়।
'কয়লা কুড়ানোর দল' গল্পে দেখা যায় শহরের উপকণ্ঠে কিশোরদের বেঁচে থাকার চরম লড়াই, যেখানে জঠরজ্বালা মেটাতে তারা জীবনের ঝুঁকি নেয়, যা পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের এক অন্ধকার দিক।
দেশবিভাগ,
দাঙ্গা ও রাজনৈতিক শেকড়:
আলাউদ্দিন আল আজাদের রাজনৈতিক চেতনায়
দেশবিভাগ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কেবল ধর্মীয় বিষয় ছিল না, বরং তা ছিল অর্থনৈতিক ও শ্রেণিগত
শোষণের একটি হাতিয়ার।
'শিকড়' গল্পে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে শোষক শ্রেণি (বড় মিয়া)
ধর্মকে পুঁজি করে কানাই ও হাফিজের মতো প্রান্তিক মানুষের জমি দখল করার চক্রান্ত করে।
হাফিজ যখন বুঝতে পারে যে দেশবিভাগের ফলে আসলে গরিব মানুষেরই ভিটেমাটি হারাতে হয়, তখন
সে প্রতিরোধের শপথ নেয়। এখানে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে শোষিতরা এক কাতারে এসে দাঁড়ায়,
যা লেখকের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দর্শনের পরিচায়ক।
'ছুরি' গল্পে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার বিপরীতে মানবতাবোধের জয় ঘোষিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় চরিত্র মনসুর প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়েও শেষ পর্যন্ত শুভবোধের দ্বারা চালিত হয় এবং ভিন্নধর্মী একটি পরিবারকে রক্ষা করে নিজের বাবার ছুরিকাঘাতে আহত হয়। এটি প্রমাণ করে যে আজাদের রাজনৈতিক চেতনায় মানুষের পরিচয় ধর্মের ঊর্ধ্বে।
শহুরে প্রান্তিক মানুষের অধিকার সচেতনতা:
রাজনৈতিক চেতনার বিস্তার কেবল গ্রামে
সীমাবদ্ধ থাকেনি, আজাদের কলমে তা শহরের রেলস্টেশন ও বস্তিতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
'একটি কথার জন্ম' গল্পে কালু মিয়ার চায়ের স্টলে রাজনৈতিক পোস্টার লাগানো এবং অনৈতিক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলার অপরাধে তাকে উচ্ছেদ করা হয়। তবে কালু মিয়ার অবিচল ঘোষণা— "যেখান থেকেই তাড়াও না কেন জেনে রাখো জায়গা আমাদের ফুরাবে না"— প্রমাণ করে যে শোষিতের লড়াই কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ নয়।
ভাষার অলংকার ও প্রকৃতির রাজনৈতিক ব্যবহার:
আলাউদ্দিন আল আজাদের গল্পের একটি বিশেষত্ব হলো তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে প্রকৃতির বর্ণনাকে রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে ব্যবহার করেছেন। 'ফেরার' গল্পে হারুনের ভাষণের পর মানুষের মনে যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়, তাকে লেখক তুলনা করেছেন পাথরের ফাঁকে পাহাড়ী ঝড়ের হিসহিসানির সঙ্গে। আবার 'মুখোমুখী' গল্পে রাতের হিমেল বাতাসকে এক বিরহীর আলাপের সঙ্গে তুলনা করে আসন্ন সংগ্রামের এক থমথমে পরিবেশ তৈরি করেছেন। এই শিল্পকৌশল তার রাজনৈতিক বক্তব্যকে আরও গভীর ও ইঙ্গিতবাহী করেছে।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, আলাউদ্দিন আল আজাদের
'জেগে আছি' গল্পগ্রন্থটি কেবল একটি গল্প সংগ্রহ নয়, বরং এটি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের শোষিত
মানুষের জেগে ওঠার এক শিল্পময় দলিল। মার্কসবাদী দর্শনে দীক্ষিত আজাদ অত্যন্ত দক্ষতার
সঙ্গে গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের দুঃখ-দুর্দশাকে শ্রেণি-সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছেন।
তার রাজনৈতিক চেতনা কেবল তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল প্রান্তিক মানুষের
হাড়-মজ্জার লড়াইয়ের চিত্রায়ণ। 'জেগে আছি' গল্পের চরিত্রগুলো তাই কেবল ব্যক্তিগত আশা-নিরাশার
কথা বলে না, তারা উচ্চস্বরে ঘোষণা করে এক বৈষম্যহীন নতুন পৃথিবীর সম্ভাবনা, যেখানে
শেষ পর্যন্ত জয় হবে শ্রমজীবী মানুষের। এই গ্রন্থটি পাঠ করলে অনুধাবন করা যায় যে, একজন
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ লেখক কীভাবে তার প্রথম রচনার মাধ্যমেই সমাজের জরাজীর্ণ কাঠামোর আমূল
পরিবর্তনের ডাক দিতে পারেন।
No comments