ads

কৃষ্ণকান্তের উইল: এক সুখি দম্পত্তির জীবনের বিচ্ছেদ বেদনার চিত্র @HeartAcademy

কৃষ্ণকান্তের উইল: এক সুখি দম্পত্তির জীবনের বিচ্ছেদ বেদনার চিত্র

    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) 'কৃষ্ণকান্তের উইল' (১৮৭৮) বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী ট্র্যাজেডি, যেখানে লেখক এক সুখী দম্পতির জীবনের ছন্দপতন বিচ্ছেদের এক মর্মস্পর্শী চিত্র অঙ্কন করেছেন। গোবিন্দলাল ভ্রমরের দাম্পত্য জীবনের যে মাধুর্য উপন্যাসের শুরুতে আমরা দেখি, তা বিধিলিপির মতো উইলের মারপ্যাঁচে এবং মানুষের রিপুর তাড়নায় এক গভীর বিষাদে পর্যবসিত হয়েছে। এই বিচ্ছেদের বেদনা কেবল বাহ্যিক দূরত্ব নয়, বরং তা ছিল বিশ্বাসভঙ্গ এবং মানসিক যন্ত্রণার এক দীর্ঘ দহন।

    সুখের স্বর্গোদ্যান বারুণীর তীর: উপন্যাসের শুরুতে গোবিন্দলাল ভ্রমরের দাম্পত্য জীবন ছিল এক শান্ত, স্নিগ্ধ সরোবরের মতো। বারুণী পুষ্করিণীর তীরে তাদের ভালোবাসার যে পৃথিবী গড়ে উঠেছিল, সেখানে কোনো অভাব ছিল না। ভ্রমর ছিলেন পতির প্রতি একান্ত অনুরক্ত এবং তার আদর্শে স্বামীকে এক উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাদের পারস্পরিক প্রেম ছিল অত্যন্ত গভীর। ভ্রমর ছিলেন সুন্দরী না হলেও গুণে অতুলনীয়া, আর গোবিন্দলাল ছিলেন রূপবান উদার। বঙ্কিমচন্দ্র তাদের সম্পর্কের মাধুর্য বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, "ভ্রমর গোবিন্দলালকে দেখিয়া মনে করিতএত রূপএবং গোবিন্দলাল তন্বী স্ত্রীকে দেখিয়া ভাবিতেনএত গুণ" রূপ আর গুণের এই সার্থক মেলবন্ধনে তাদের সংসার ছিল এক টুকরো স্বর্গ।

     রোহিণীর প্রবেশ বিশ্বাসের ছন্দপতন: এই সুখের সংসারে প্রথম ভাঙন ধরে রূপসী বিধবা রোহিণীর আগমনে। কৃষ্ণকান্তের উইল চুরিকে কেন্দ্র করে যে নাটকের সূচনা হয়, তাতে জড়িয়ে পড়েন গোবিন্দলাল। এই নন্দনকাননে কালনাগিনী হয়ে প্রবেশ করে বিধবা রোহিণীর অলৌকিক রূপলাবণ্য। কৃষ্ণকান্তের উইল বদলানোর ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে গোবিন্দলাল যখন রোহিণীর প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে শুরু করেন, তখন থেকেই শুরু হয় দাম্পত্যের ছন্দপতন। রোহিণীর প্রতি অনুকম্পা দেখাতে গিয়ে তিনি কখন যে তার রূপের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন, তা তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি। গোবিন্দলালের এই চারিত্রিক পদস্খলন ভ্রমরের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। ভ্রমরের একনিষ্ঠ পতিপ্রেমে প্রথম কুয়াশা ঘনায় অবিশ্বাসের। যে ভ্রমর স্বামীকে দেবতার মতো ভক্তি করতেন, সেই স্বামীর প্রতি অবিশ্বাস তার হৃদয়ে বজ্রপাতের মতো আঘাত হানে।

    অভিমানের অগ্নিশিখা পিত্রালয় গমন: স্বামীর প্রতি অবিশ্বাসের বিষে নীল হয়ে ভ্রমর যখন পিত্রালয়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন সেই বিচ্ছেদ কেবল দুটি বাড়ির দূরত্ব ছিল না, ছিল দুটি হৃদয়ের মহাপ্রস্থান। অভিমানী ভ্রমরের সেই অমোঘ উক্তি— "এখন তোমার উপর আমার ভক্তি নাই, বিশ্বাসও নাই। তোমার দর্শনে আমার আর সুখ নাই।" এই একটি বাক্যেই প্রকাশ পায় এক সুখী নারীর হৃদয়ের আমূল ভেঙে পড়ার আর্তি। গোবিন্দলালের বিচ্যুতি কেবল একটি ভুল ছিল না, তা ছিল ভ্রমরের অস্তিত্বের মূলে এক চরম আঘাত। ভ্রমর যখন পিত্রালয়ে চলে যান, গোবিন্দলাল তখন রোহিণীর রূপতৃষ্ণায় অন্ধ। বঙ্কিমচন্দ্র এই পর্যায়টিকে বর্ণনা করেছেন এক নিদারুণ মানসিক সংঘাতের মাধ্যমে।

    প্রসাদপুরের ভোগ-পঙ্কিল জীবন মানসিক দূরত্ব: গোবিন্দলাল যখন ভ্রমরকে ত্যাগ করে রোহিণীকে নিয়ে প্রসাদপুরে চলে যান, তখন থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণাদায়ক বিচ্ছেদ। এই বিচ্ছেদ কেবল ভৌগোলিক ছিল না, ছিল আদর্শিক মানসিক। প্রসাদপুরে গোবিন্দলাল রোহিণীর সাথে বসবাস করলেও সেখানে শান্তি ছিল না। রোহিণীর প্রতি তার আকর্ষণ ছিল কেবল রূপতৃষ্ণা, যা তাকে কখনোই ভ্রমরের সেই পবিত্র নিঃস্বার্থ প্রেমের স্বাদ দিতে পারেনি। রূপতৃষ্ণা কি কখনো হৃদয়ের তৃষ্ণা মেটাতে পারে? ভোগবিলাসের মাঝে থেকেও গোবিন্দলাল প্রতি মুহূর্তে অনুভব করতেন ভ্রমরের সেই পবিত্র প্রেমের অভাব। এই বিচ্ছেদ ছিল একদিকে শারীরিক কামনার দহন, অন্যদিকে আত্মিক রিক্ততার হাহাকার। রোহিণীর চঞ্চল স্বভাব এবং অবিশ্বস্ততা গোবিন্দলালের মনে সন্দেহের উদ্রেক করে। তিনি বুঝতে পারেন, তিনি কী হারিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়, রোহিণীর প্রতি গোবিন্দলালের এই আকর্ষণ ছিল "মন্দার-ঘর্ষণপীড়িত বাসুকিনিঃশ্বাসনিঃসৃত হলাহল" গোবিন্দলালের এই উপলব্ধি তাকে দগ্ধ করতে থাকে, কিন্তু ফেরার পথ তখন অনেক দূরে চলে গেছে। রোহিণীর প্রতি ঘৃণা নিজের কৃতকর্মের অনুশোচনায় গোবিন্দলাল যখন উন্মত্ত হয়ে রোহিণীতে হত্যা করেন, তখন থেকেই তার প্রকৃত দণ্ড নির্বাসিত জীবনের শুরু হয়।

ভ্রমরের তিল তিল ক্ষয় বিরহ-তপস্যা: পিত্রালয়ে ভ্রমর দিনের পর দিন শুকিয়ে যেতে থাকেন, তার সেই প্রাণোচ্ছলতা বিলীন হয়ে যায়। স্বামীর অবিশ্বস্ততার বিষে তার জীবন বিষময় হয়ে ওঠে। রোগের যন্ত্রণার চেয়েও স্বামীর বিচ্ছেদের জ্বালা ছিল তার কাছে অনেক বেশি প্রখর। তাঁর প্রকৃত রোগ ছিল 'বিরহ' অবিশ্বাসী স্বামীর জন্য তাঁর হৃদয়ে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল, তা কোনো ওষুধি মেটাতে পারেনি। সাত বছরের এই দীর্ঘ বিচ্ছেদকাল ভ্রমরের জন্য ছিল এক অগ্নিলীলা। তিনি জানতেন গোবিন্দলাল ফিরবেন, আর সেই ফেরার প্রতীক্ষাতেই তিনি প্রাণটুকু প্রদীপের শিখার মতো ধরে রেখেছিলেন।

    উইলের অভিশাপ রাজকীয় বঞ্চনা: কৃষ্ণকান্তের বারবার উইল পরিবর্তন এই বিচ্ছেদের বেদনাকে আরও ঘনীভূত করেছিল। শেষ উইলে গোবিন্দলালকে রিক্ত করে সমস্ত সম্পত্তি ভ্রমরকে দিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তাদের সম্পর্কের মাঝে বৈষয়িক দেয়ালও তুলে দেওয়া হয়। গোবিন্দলাল হয়ে পড়েন ভিটেমাটিহীন এক যাযাবর, আর ভ্রমর হয়ে ওঠেন এক রিক্ত হৃদয়ের সম্রাজ্ঞী।

    চূড়ান্ত মিলন চিরবিদায়: উপন্যাসের সবথেকে করুণ মুহূর্তটি আসে তখন, যখন সাত বছর পর রিক্ত, নিঃস্ব গোবিন্দলাল ফিরে আসেন মৃত্যুশয্যায় শায়িত ভ্রমরের কাছে। বিচ্ছেদের সমস্ত অভিমান চোখের জলে ধুয়ে মুছে যায়। স্বামীর প্রতি তার দাবি ছিল চিরন্তন। মৃত্যুশয্যায় শায়িত ভ্রমরের সেই আকুলতা পাঠককে অশ্রুসিক্ত করে। তিনি জানতেন, গোবিন্দলাল হয়তো একদিন ফিরবেন, আর সেই বিশ্বাসেই তিনি প্রাণটুকু ধরে রেখেছিলেন। মৃত্যুর আগে যখন গোবিন্দলালের সাথে তার শেষ দেখা হয়, তখন সমস্ত অভিমান ধুয়ে মুছে গিয়ে কেবল প্রেমই অবশিষ্ট থাকে। ভ্রমরের সেই চিরকালীন দাবিটি আজও পাঠক হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়: "তুমি আমারইরোহিণীর নও।" এই উক্তির মাধ্যমে তিনি মৃত্যুর ওপাড়েও স্বামীকে নিজের করে পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে যান। এই একটি বাক্যের মধ্যেই নিহিত আছে তার জীবনের সমস্ত সাধনা বিচ্ছেদের হাহাকার।

    সন্ন্যাসী গোবিন্দলাল স্মৃতির ভ্রমর: ভ্রমরের মৃত্যুর পর গোবিন্দলালের জীবনে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তার জীবনে নেমে আসে এক চরম রিক্ততা। যে ভ্রমরকে তিনি অবহেলা করেছিলেন, বিচ্ছেদের পর সেই ভ্রমরই তার জীবনের ধ্রুবতারা হয়ে ওঠেন। সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়ে তিনি বারো বছর কাটিয়ে দেন। বারো বছর পর যখন তিনি পুনরায় ফেরেন, তখন তাঁর কাছে পার্থিব কোনো উইল বা সম্পত্তির মূল্য নেই। তার হৃদয়ে ভ্রমরের স্মৃতি ছিল অক্ষয়। উপন্যাসের শেষে তার সেই করুণ স্বীকারোক্তি বিচ্ছেদের যন্ত্রণাকে এক আধ্যাত্মিক উচ্চতায় নিয়ে যায়: "এখন তিনিই আমার সম্পত্তিতিনিই আমার ভ্রমরভ্রমরাধিক ভ্রমর।"

     বঙ্কিমচন্দ্র এই দম্পত্তির কাহিনীর মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, রিপুর বশবর্তী হয়ে মানুষ যখন আপনজনের বিশ্বাস ভঙ্গ করে, তখন তার পরিণতি হয় ভয়াবহ। গোবিন্দলাল ভ্রমরের বিচ্ছেদ কেবল একটি সম্পর্কের সমাপ্তি নয়, এটি ছিল একটি সুন্দর স্বপ্নের অপমৃত্যু। ভ্রমরের তিল তিল করে নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়া এবং গোবিন্দলালের সারা জীবন অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হওয়াএই দুই মিলিয়ে বিচ্ছেদের যে পূর্ণাঙ্গ রূপ লেখক চিত্রিত করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল।

     পরিশেষে বলা যায়, 'কৃষ্ণকান্তের উইল' উপন্যাসে দাম্পত্য বিচ্ছেদের এই চিত্রটি কেবল একটি কাহিনী নয়, এটি মানব মনের এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। সুখের শিখর থেকে দুঃখের পাতালে পতন এবং বিচ্ছেদের মাধ্যমে প্রেমের যে মহিমা পবিত্রতা বঙ্কিমচন্দ্র ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আমাদের শেখায় যে সত্যিকারের প্রেম কেবল ভোগে নয়, বরং ত্যাগ এবং আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়েই পূর্ণতা পায়। গোবিন্দলাল ভ্রমরের বিচ্ছেদের বেদনা তাই কেবল এক দম্পতির বিরহগাথা হয়ে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে মানুষের চিরন্তন রূপতৃষ্ণা আত্মিক বন্ধনের এক কালজয়ী মহাকাব্য।

No comments

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.