ads

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পল্লীসমাজ উপন্যাসের রমেশ চরিত্রের প্রকৃতি @HeartAcademy

রমেশ চরিত্রের প্রকৃতি:    

    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৭৬-১৯৩৮)পল্লীসমাজ’ (১৯১৬) উপন্যাসের নায়ক রমেশ ঘোষাল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ব্যতিক্রমী চরিত্র। সে একদিকে যেমন ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের আদর্শে উদ্দীপ্ত এক শিক্ষিত যুবক, অন্যদিকে পল্লীজীবনের অন্ধকার জড়তার বিরুদ্ধে একাকী লড়াকু এক যোদ্ধা। উপন্যাসে তার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সে প্রচলিত সমাজপতিদের মতো শোষক নয়, বরং একজন আদর্শবাদী সমাজ সংস্কারক। 

     রমেশ চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার আধুনিক শিক্ষা সংস্কারমুক্ত মন। রোয়াক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র রমেশ যখন দীর্ঘকাল পর তার গ্রাম কুঁয়াপুরে ফিরে আসে, তখন সে পল্লীজীবনের ক্ষুদ্র দলাদলি, জাতিভেদ এবং অশিক্ষা দেখে ব্যথিত হয়। সে বুঝতে পারে যে, গ্রামের মানুষের নৈতিক সামাজিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষা অপরিহার্য। তাই সে জরাজীর্ণ স্কুল সংস্কার এবং দরিদ্র মুসলমান প্রজাদের জন্য পৃথক স্কুল নির্মাণে আত্মনিয়োগ করে। জাতিভেদ প্রথা নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। জ্যাঠাইমার প্রশ্নের উত্তরে সে অকপটে বলেজাতিভেদ আছে তা মানি, কিন্তু একে ভালো বলে মানিনে। তার এই আধুনিক মনোভঙ্গিই তাকে গ্রামের রক্ষণশীল সমাজপতিদের থেকে আলাদা করে তোলে।

     রমেশ চরিত্রের অন্যতম উজ্জ্বল দিক হলো তার গভীর মানবপ্রেম পরার্থপরতা। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সে গ্রামের রাস্তাঘাট মেরামত মড়কের সময় আর্তের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়। তার চরিত্রের এই বিশালত্ব ফুটে ওঠে যখন সে চাষীদের একশো বিঘা মাঠের ফসল ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচাতে নিজের ব্যক্তিগত লাভের তোয়াক্কা না করে বাঁধ কেটে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। রমা যখন মাছের ক্ষতির আশঙ্কায় বাধা দেয়, তখন রমেশের ধিক্কারবাণী মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতাকে প্রমাণ করে: সংসারে যত পাপ আছে, মানুষের দয়ার ওপর জুলুম করাটা সবচেয়ে বেশি। সে দয়াকে কেবল দুর্বলতা মনে করেনি, বরং একে ন্যায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।

     রমেশ চরিত্রটি কেবল দয়াশীল নয়, সে অসীম সাহসী এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকঠিন। বড়দা বেণী ঘোষাল এবং গোবিন্দ গাঙ্গুলীর মতো ধূর্ত সমাজপতিরা যখন দরিদ্র কৃষকদের শোষণ করে, রমেশ তখন তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। সে কৃষকদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় এবং প্রয়োজনে গায়ের জোরে অর্থাৎ লাঠি হাতে নিয়ে তাদের অধিকার রক্ষা করে। পিরপুরের মুসলমান প্রজারা তাকে দেবতার মতো শ্রদ্ধা করার কারণ এটাই যে, রমেশ তাদের অধিকারের জন্য সমাজপতিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করতে পেরেছে। সে বুঝেছিল যে পল্লীগ্রামের মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে, তাই তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়াই তার জীবনের লক্ষ্য হয়ে ওঠে।

     রমেশের চরিত্রে এক আশ্চর্য ক্ষমাশীলতা আত্মমর্যাদার সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। সে বারংবার রমা বেণী ঘোষালের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। রমা তার বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে রমেশ ছয় মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চরম অপমানের পরও রমেশ কোনো প্রতিহিংসা গ্রহণ করেনি বা সাজা কমানোর জন্য আপিল পর্যন্ত করেনি। সে মনে করেছে, যে সমাজ সত্য চায় না, সেখানে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার লড়াই অর্থহীন। তার এই নিঃশব্দ প্রতিবাদ তার চরিত্রের গাম্ভীর্য উচ্চতা প্রকাশ করে। জেলের আদেশ শুনে তার উক্তিম্যাজিস্ট্রেট আমাকে সারাজীবন কারারুদ্ধ করবার হুকুম দিলেও আমি আপিল করে খালাস পেতে চাইনে। বোধকরি, জেল এর চেয়ে ভালো। এই উক্তিটি মূলত পচা-গলা পল্লীসমাজের প্রতি তার তীব্র ঘৃণা অভিমানেরই বহিঃপ্রকাশ।

     রমেশ চরিত্রের এক মানবিক সংবেদনশীল দিক হলো রমার প্রতি তার অবদমিত প্রেম। শৈশব থেকেই সে রমাকে ভালোবেসেছিল, কিন্তু সামাজিক বাধা পরিস্থিতির কারণে তা পূর্ণতা পায়নি। রমার বৈরী আচরণ তাকে আহত করলেও সে রমার ভেতরকার মূল সত্তাকে চিনতে ভুল করেনি। রমার প্রতি তার এই প্রেম কখনও দুর্বলতা হয়ে তার আদর্শকে বিচ্যুত করেনি, বরং তা তাকে আরও সহনশীল করে তুলেছে। উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে যখন রমা অনুতাপে দগ্ধ হয়ে গ্রাম ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়। তার হৃদয়ের কান্না “যত মন্দ বলে তিনি আমাকে জানিতেন, তত মন্দ আমি ছিলাম না। ……. আমি অনেক বেশি দুঃখ পেয়েচি।“ রমেশ তখন তার হৃদয়ের গোপন বেদনা অনুভব করে মর্মাহত হয়। তার কাছে রমার গুরুত্ব ছিল অপরিমেয়, যা সে রমাকে উদ্দেশ্য করে বলেআমার সমস্ত জীবনটা যেন তুমি এই একটা বেলার মধ্যে আগাগোড়া বদলে দিয়েছ।

     রমেশ চরিত্রের বিবর্তনে তার জ্যাঠাইমা বিশ্বেশ্বরীর প্রভাব অনস্বীকার্য। জ্যাঠাইমার প্রাজ্ঞ পরামর্শই তাকে পল্লীগ্রামের জটিল আবর্তে টিকে থাকার শক্তি জুগিয়েছে। জ্যাঠাইমাই তাকে পল্লীর অন্ধকার দূর করার জন্য জ্ঞান আলোর মশাল জ্বালাতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। যখন রমেশ দুঃখে-ক্ষোভে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছে, তখন জ্যাঠাইমাই তাকে আটকে রেখেছেন এই বলে যেতোর রাগের যোগ্য লোক এখানে আছে কে?... এরা তোর রাগ অভিমানের কত অযোগ্য!” রমেশ তার জ্যাঠাইমার এই দর্শনকে শিরোধার্য করে নিজের জন্মভূমি তার অবহেলিত মানুষের পাশে থাকার শপথ নেয়।

     উপন্যাসের শুরুতে রমেশ ছিল পল্লীসমাজের কাছে একজন বহিরাগত, কিন্তু শেষের দিকে সে হয়ে ওঠে সেই সমাজের অবিসংবাদিত নেতা। তার ছয় মাসের কারাবাস তাকে গ্রামবাসীর কাছে এক আত্মত্যাগী বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সে দেখে যে, নিচুতলার মানুষ মুসলমান প্রজারা তাকে আপন করে নিয়েছে। রমেশের এই সাফল্য কেবল তার ব্যক্তিগত জয় নয়, বরং এটি তার আদর্শ ত্যাগের জয়। এমনকি একসময় তাকে তুচ্ছজ্ঞান করা গ্রামবাসীও বিচার পাওয়ার আশায় আদালতের বদলে রমেশের কাছে ছুটে আসে। এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় যে, রমেশ সফলভাবে কুঁয়াপুর সমাজের পচন ধরা ব্যবস্থার মূলে আঘাত হানতে পেরেছে।

     পরিশেষে বলা যায়, ‘পল্লীসমাজউপন্যাসের রমেশ চরিত্রটি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সমাজ-সচেতনতার এক সার্থক সৃষ্টি। সে কেবল এক জোতদারের পুত্র নয়, সে শোষিত মানুষের ভরসা এবং পল্লী সংস্কারের এক অগ্রদূত। তার চরিত্রে একদিকে যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার যৌক্তিকতা দৃঢ়তা আছে, অন্যদিকে মা-মাটি-মানুষের প্রতি রয়েছে গভীর মমতা। রমেশের মতো আদর্শবাদী যুবকেরাই যে সমাজ পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি, শরৎচন্দ্র রমেশ চরিত্রের মাধ্যমে সেই ধ্রুব সত্যটিই তুলে ধরেছেন। তার আত্মত্যাগ, ধৈর্য এবং সত্যের প্রতি নিষ্ঠা তাকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নায়কের আসনে বসিয়েছে। রমেশ চরিত্রটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধ সংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে জ্ঞানের আলো এবং ত্যাগের সাহস প্রয়োজন।



 

No comments

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.