' রাজসিংহ ' উপন্যাসের নামকরণ এর যৌক্তিকতা:
VIDEO
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ( ১৮৩৮ – ১৮৯৪) তাঁর
সাহিত্যিক জীবনে
বহু
উপন্যাস রচনা
করলেও
' রাজসিংহ ' (১৮৮২) উপন্যাসটিকে তিনি
নিজেই
তাঁর
একমাত্র ' ঐতিহাসিক উপন্যাস ' হিসেবে দাবি
করেছেন। ইতিপূর্বে রচিত
' দুর্গেশনন্দিনী ' বা
' চন্দ্রশেখর '- কে
তিনি
ঐতিহাসিক আখ্যা
দিতে
রাজি
ছিলেন
না। একটি উপন্যাসের নামকরণ
সাধারণত তার
কেন্দ্রীয় চরিত্র
বা
মূল
ঘটনার
ওপর
ভিত্তি
করে
করা
হয়।
' রাজসিংহ ' উপন্যাসের ক্ষেত্রে মেবারের রানা
রাজসিংহের চরিত্রটি কীভাবে
পুরো
কাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করেছে
এবং
কেন
এই
নামকরণ
সার্থক ,
তা
নিচে
আলোচনা
করা
হলো।
উপন্যাসের নামকরণ
সার্থক
হওয়ার
প্রথম
কারণ
হলো
এর
ঐতিহাসিক পটভূমি। কাহিনীটি সপ্তদশ
শতাব্দীর ভারতবর্ষের মোগল - রাজপুত সংঘাতের ওপর
ভিত্তি
করে
রচিত।
সম্রাট
ঔরঙ্গজেব যখন
তাঁর
ধর্মান্ধতা ও
সাম্রাজ্যলিপ্সার চূড়ান্ত পর্যায়ে , তখন
তাঁর
বিপরীতে বীরত্বের প্রাচীর হয়ে
দাঁড়িয়েছিলেন মেবারের রানা
রাজসিংহ। ঐতিহাসিক যদুনাথ
সরকারের মতে ,
ঔরঙ্গজেবের এই
রাজপুতানা অভিযানই ছিল
মোগল
সাম্রাজ্যের পতনের
সূচনা।
উপন্যাসে লেখক
রাজসিংহকে কেবল
একজন
যোদ্ধা
হিসেবে
নয় ,
বরং
হিন্দু
শক্তির
পুনরুত্থানের প্রতীক
হিসেবে
দেখিয়েছেন।
উপন্যাসের কাহিনীর সূচনা
হয়
রূপনগরের রাজকন্যা চঞ্চলকুমারীর একটি
সাহসী
কাজ
থেকে।
তিনি
মোগল
সম্রাট
ঔরঙ্গজেবের ছবিতে
পদাঘাত
করেন
এবং
রানা
রাজসিংহের ছবিকে
সসম্মানে রক্ষা
করেন
।
তসবিরওয়ালীর ভাষায়
এই
ঘটনার
গুরুত্ব ফুটে
ওঠে :
" এ প্রণাম
রাজকুলকে নহে — এ প্রণাম সৌন্দর্যকে। "
এই
' সৌন্দর্য ' কেবল
বাহ্যিক নয় ,
বরং
রাজসিংহের বীরত্ব
ও
আদর্শের প্রতি
চঞ্চলকুমারীর শ্রদ্ধার প্রতিফলন। রাজসিংহ যখন
জানতে
পারেন
এক
রাজপুত
কন্যা
তাঁর
কাছে
সাহায্য চেয়েছে ,
তিনি
বিন্দুমাত্র দ্বিধা
না
করে
যুদ্ধের পথে
পা
বাড়ান
।
চঞ্চলকুমারীর কথায়
রাজসিংহের প্রতি
এই
অমোঘ
আকর্ষণের কারণ
স্পষ্ট
হয় :
" বাহুতেই
বল আছে , রাজপুতকন্যার কাছে সেই যুবা। "
চঞ্চলকুমারী ঔরঙ্গজেবের মহিষী
হওয়ার
প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন
।
তাঁর
মতে ,
মোগল
সম্রাটের কাছে
যাওয়া
মানে
হলো
নিজের
ধর্ম
ও
সম্মান
বিসর্জন দেওয়া।
তিনি
রাজসিংহকে উদ্ধারকারী হিসেবে
বেছে
নেন
কারণ
তিনি
জানতেন
রাজসিংহই একমাত্র পুরুষ
যিনি
মোগল
শক্তির
দম্ভ
চূর্ণ
করতে
পারেন।
চঞ্চলকুমারীর তীব্র
ঘৃণা
ও
রাজসিংহের প্রতি
আনুগত্য এই
সংলাপে
প্রকাশ
পায় :
" হংসী কি বকের সেবা করে ?"
পুরো
কাহিনীতে রাজসিংহ চঞ্চলকুমারীর এই
বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা
করেছেন। তিনি
কেবল
তাঁকে
উদ্ধারই করেননি ,
বরং
মোগল
বাহিনীকে রণকৌশলে পর্যুদস্ত করে
নিজের
শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ
করেছেন।
উপন্যাসটির নামকরণ
' রাজসিংহ ' হওয়ার
অন্যতম
শক্তিশালী কারণ
হলো
ঔরঙ্গজেবের চরিত্রের বিপরীতে রাজসিংহের নৈতিক
বিজয়।
লেখক
রাজসিংহকে দেখিয়েছেন ' ধর্ম '
এবং
ঔরঙ্গজেবকে ' অধর্ম '
বা
নৈতিক
পতনের
প্রতীক
হিসেবে। রাজসিংহের রণকৌশল
এবং
মোগল
বাহিনীর অবরুদ্ধ হওয়া
কেবল
সামরিক
জয়
নয় ,
বরং
আদর্শিক জয়।
ঔরঙ্গজেবের চরিত্র
সম্পর্কে লেখক
বলেছেন :
" ঔরঙ্গজেব
মহাপাপী ছিলেন — তাঁহার ন্যায় ধূর্ত , কপিটাচারী , স্বার্থপর ও প্রজাপীড়ক খুব কমই পাওয়া যায়। "
এর
বিপরীতে রাজসিংহকে দেখানো
হয়েছে
একজন
পরোপকারী এবং
ন্যায়নিষ্ঠ শাসক
হিসেবে। উপন্যাসের মূল
দর্শনের সারমর্ম বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই
দিয়েছেন এভাবে :
" যাহারা
ধার্মিক নহে — হিন্দু হউক , মুসলমান হউক — সে ই অনিষ্টকর। রাজসিংহ ধার্মিক , তাই তিনি জয়ী হইলেন। "
উপন্যাসের প্রতিটি প্রধান
মোড়
রাজসিংহের সিদ্ধান্তের ওপর
নির্ভরশীল। চঞ্চলকুমারীর পত্র
পাওয়া ,
নড়ন
গিরিপথের যুদ্ধ ,
ঔরঙ্গজেবের অবরোধ
এবং
শেষ
পর্যন্ত সন্ধি
স্থাপন — সবই রাজসিংহকে কেন্দ্র করে
আবর্তিত হয়েছে
।
যদিও
উপন্যাসে জেবুন্নিসা , মোবারক
এবং
দরিয়া
বিবির
একটি
সমান্তরাল উপকাহিনী রয়েছে ,
তবুও
রাজসিংহের বীরত্ব
ও
তাঁর
মেবার
রক্ষা
করার
মূল
কাহিনীই উপন্যাসের মেরুদণ্ড। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এই
উপন্যাসের গতি
সম্পর্কে বলেছিলেন যে
রাজসিংহে ঘটনার
দ্রুত
গতির
কাছে
লেখক
যেন
আত্মসমর্পণ করেছেন
।
এই
' গতি '
রাজসিংহের সামরিক
অভিযানেরই গতি।
' রাজসিংহ ' শব্দের আক্ষরিক অর্থ
' সিংহের
ন্যায়
রাজা '
বা
' রাজাদের মধ্যে
সিংহ ' । উপন্যাসে রাজসিংহের চরিত্রটি ঠিক
এই
অর্থকেই ধারণ
করে।
তিনি
যেমন
নির্ভীক , তেমনই
বুদ্ধিমান ও
কৌশলী।
তাঁর
চারিত্রিক দৃঢ়তা
এবং
শত্রুর
প্রতি
দয়ার
উদাহরণ
( যেমন :
ঔরঙ্গজেবকে জীবন
ভিক্ষা
দেওয়া
এবং
মোগল
রাজকুমারী ও
বেগমদের সসম্মানে মুক্তি
দেওয়া )
তাঁকে
মহিমান্বিত করেছে।
তাঁর
চরিত্রের এই
বিশালতার কারণেই
উপন্যাসের নাম
তাঁর
নামে
হওয়া
অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
অনেকে মনে
করেন
উপন্যাসে জেবুন্নিসা বা
চঞ্চলকুমারীর চরিত্রগুলো রাজসিংহের চেয়েও
বেশি
প্রাণবন্ত বা
বৈচিত্র্যময়। তবুও
রাজসিংহ উপন্যাসের মূল
চালিকাশক্তি। তাঁর
ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং
নৈতিক
দৃঢ়তাই
পুরো
কাহিনীকে একটি
সার্থক
ঐতিহাসিক উপন্যাসের রূপ
দিয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ
দিকের
উপন্যাসগুলোতে ধর্মতত্ত্বের যে
প্রভাব
দেখা
যায় ,
রাজসিংহ চরিত্রে তার
সার্থক
প্রতিফলন ঘটেছে।
লেখক
ইতিহাসকে বিকৃত
না
করে
বরং
ঐতিহাসিক সত্যের
ওপর
দাঁড়িয়ে রাজসিংহকে একজন
আদর্শ
নায়কের
মূর্ত
রূপ
দিয়েছেন।
পরিশেষে বলা
যায় ,
' রাজসিংহ ' নামকরণটি কেবল
একটি
ব্যক্তির নাম
নয় ,
বরং
তা
একটি
আদর্শ ,
বীরত্ব
এবং
ধর্মের
জয়ের
প্রতীক। উপন্যাসের শুরু
থেকে
শেষ
পর্যন্ত রাজসিংহের উপস্থিতি কাহিনীকে একটি
সুসংহত
রূপ
দিয়েছে। তাঁর
চারিত্রিক ঔদার্য
মোগল
শক্তির
অন্ধকার ছায়ার
বিপরীতে মেবারকে যে
আলোর
দিশা
দিয়েছিল , বঙ্কিমচন্দ্র নিপুণভাবে তা
চিত্রিত করেছেন। ঔরঙ্গজেবের দম্ভ
চূর্ণ
করার
মাধ্যমে রাজসিংহ কেবল
চঞ্চলকুমারীকে উদ্ধার
করেননি ,
বরং
ভারতের
জাতীয়
সংহতি
ও
বীরত্বের এক
অনন্য
নজির
স্থাপন
করেছেন। তাই
উপন্যাসের নামকরণ
হিসেবে
' রাজসিংহ ' কেবল
যৌক্তিক নয় ,
বরং
অপরিহার্য।
উপন্যাসটির মূল
সুরটি
লেখকের
এই
উক্তিতেই প্রতিধ্বনিত হয় :
" রাজসিংহ
ধার্মিক , এজন্য তিনি ক্ষুদ্র রাজ্যের অধিপতি হইয়াও মোগল বাদশাহকে পরাস্ত করিতে পারিয়াছিলেন। "
এভাবেই
রাজসিংহের চরিত্রটি কাহিনীর প্রতিটি স্তরে
ব্যাপ্ত হয়ে
নামকরণের যৌক্তিকতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।
VIDEO
No comments