ads

‘রাখালী’ কাব্য: নিসর্গ চেতনা এবং লোকজ জীবন

‘রাখালী’ কাব্য: নিসর্গ চেতনা এবং লোকজ জীবন 

ভূমিকা: বাংলা সাহিত্যের বিশাল বিস্তৃত ধারায় পল্লীকবি জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) এক অনন্য স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর ১৯২৭ সালে যখন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'রাখালী' প্রকাশিত হয়, তখন বাংলা কবিতার আকাশে রবীন্দ্র-প্রভাব ছিল অত্যন্ত প্রবল। সেই নাগরিক আভিজাত্যের যুগে দাঁড়িয়ে জসীমউদ্দীন অত্যন্ত সাহসের সাথে বেছে নিয়েছিলেন গ্রাম-বাংলার ধুলোমাটি, মেঠো পথ আর সাধারণ মানুষের জীবনগাঁথা। তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মৃত্তিকাসংলগ্ন কবি, যাঁর রচনায় পল্লী প্রকৃতি কেবল পটভূমি হিসেবে আসেনি, বরং তা পল্লীর লোকসংস্কৃতি মানুষের হৃদস্পন্দনের সঙ্গে একীভূত হয়ে মিশে গেছে। 'রাখালী' কাব্যের মাধ্যমেই তিনি প্রমাণ করেছেন যে, গ্রামের অতি সাধারণ রূপ মানুষের প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কবিতার এক অক্ষয় অমূল্য খনি।


নিসর্গ চেতনা:

প্রকৃতির মানবিক রূপ বিরহ চেতনা: 

'রাখালী' কাব্যে প্রকৃতি কোনো জড় বা প্রাণহীন দৃশ্যপট নয়; কবি এখানে প্রকৃতিকে দেখেছেন এক সজীব সংবেদনশীল সত্তা হিসেবে। কাব্যের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে বাঁশবন, হিজল ফুলের ঘ্রাণ, শিশিরভেজা ধানের পাতা এবং বিস্তৃত বালুচর। পল্লী প্রকৃতির এই স্নিগ্ধ রূপ গ্রামীণ মানুষের যাপিত জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কবির নিসর্গ চেতনায় প্রকৃতির যেমন স্নিগ্ধ রূপ রয়েছে, তেমনি রয়েছে এক বিষাদময় রহস্য। গ্রামীণ কিশোরীর রূপ বর্ণনায় কবি মেঠো ফুলকে বেছে নেন, আবার প্রিয়জন হারানোর শোকে তিনি গাছের পাতাদেরও ব্যথিত হতে দেখেন। তাঁর এই নিসর্গ চেতনা পাঠককে মাটির খুব কাছাকাছি নিয়ে যায়, যেখানে প্রতিটি ঘাসের ডগায় কিংবা ডাহুকের ডাকে পল্লী বাংলার শাশ্বত রূপ ফুটে ওঠে, যেখানে বুনো পথের নির্জনতায় মানুষের শোকগাথা মূর্ত হয়ে ওঠে। যেমন 'কবর' কবিতায় বৃদ্ধের স্বজন হারানোর বেদনায় প্রকৃতিও যেন শোকাতুর হয়ে পড়ে:

এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম-গাছের তলে,

তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।

এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,

পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।

( কবর)

এই চরণে কবির নিসর্গ চেতনা লোকজীবনের এক গভীর মেলবন্ধন ঘটেছে। ডালিম গাছ পল্লী প্রকৃতির এক অতি সাধারণ অনুষঙ্গ, যার ছায়াতলে কবির প্রিয়তমা শায়িত। এখানে ডালিম গাছটি কেবল একটি উদ্ভিদ নয়, বরং তিন দশকের শোকের এক নীরব সাক্ষী। লোকজীবনের সারল্য ফুটে উঠেছে "পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে" বাক্যাংশটির মাধ্যমে, যা গ্রামীণ কিশোরীদের অতি সহজ মনস্তত্ত্বকে নির্দেশ করে। প্রিয় মানুষের স্মৃতিকে কবি প্রকৃতির এক স্নিগ্ধ আশ্রয়ে চিরস্থায়ী রূপ দিয়েছেন।

নিসর্গের রহস্যময় বিষাদময় ছবি: 

পল্লী প্রকৃতির এক থমথমে রহস্যময় আবহে জসীমউদ্দীনের নিসর্গ চেতনা এক অনন্য রূপ লাভ করেছে। বিশেষ করে গভীর রাতের নিস্তব্ধতা এবং প্রকৃতির নানা শব্দ কীভাবে মানুষের মনে শঙ্কার উদ্রেক করে, কবি তা নিপুণভাবে অঙ্কন করেছেন। 'পল্লী জননী' কবিতায় প্রকৃতির এই রহস্যময় রূপটি দেখা যায়, যা মূলত মায়ের মনে সন্তানের মৃত্যুভীতিকে আরও তীব্র করে তোলে:

বাঁশ বনে বসি ডাকে কানাকুয়ো, রাতের আঁধার ঠেলি,

বাদুড় পাখার বাতাসেতে পড়ে সুপারির বন হেলি।

চলে বুনো পথে জোনাকী মেয়েরা কুয়াশা কাফন ধরি,

দুঃ ছাই! কিবা শঙ্কায় মার পরাণ উঠিছে ভরি।

(পল্লী জননী)

এখানে নিসর্গ চেতনা এক গা ছমছমে আবহে মূর্ত হয়েছে।কানাকুয়ো ডাক গ্রামীণ মানুষের কাছে অমঙ্গলের সংকেত হিসেবে পরিচিত। জোনাকির আলোকে কুয়াশার মধ্যেকাফন ধরাহিসেবে কল্পনা করা লোকজ বিশ্বাসের এক অন্ধকার বিষাদময় দিককে তুলে ধরে। প্রকৃতির এই রূপ মায়ের মনের গভীর শঙ্কাকে কবির নিসর্গ চেতনার এক চরম উৎকর্ষে রূপান্তর করেছে।

উপমায় নিসর্গ সৌন্দর্যের সারল্য: গ্রামের সাধারণ কিশোরী বা পল্লী ললনার রূপ বর্ণনায় কবি কোনো কৃত্রিম অলংকারের আশ্রয় না নিয়ে প্রকৃতির সাধারণ উপাদানকেই বেছে নিয়েছেন। তাঁর কবিতায় মাঠের ফুল বা লতা হয়ে উঠেছে সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠ মানদণ্ড। নিসর্গ চেতনা এখানে এতটাই প্রগাঢ় যে, মানুষের হাসি বা রূপকে কবি প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেছেন:

মুখখানি কাঁচা কাঁচা, না সে সোনার না সে আবীর,

না সে করুণ সাঁঝের গাঙে আধ আলো রঙীন রবির।

কেমন যেন গাল দুখানি, মাঝে রাঙা ঠোঁটটি তাহার,

মাঠে-ফোটা কলমি ফুলে কতটুক তার খেলে বাহার।

(রাখালী)

কবি গ্রাম্য বালিকার সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে কোনো নাগরিক অলংকার ব্যবহার করেননি। তার হাসির বাহারকে তিনি তুলনা করেছেনমাঠে-ফোটা কলমি ফুলে সাথে। এই নিসর্গ চেতনা পল্লী প্রকৃতির সাথে মানুষের চেহারার এক অনন্য সংযোগ তৈরি করে। প্রকৃতির অতি তুচ্ছ ফুলও যে সুন্দরের কত বড় আধার হতে পারে, কবি এখানে তা অত্যন্ত সহজ সাবলীল ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।

লোক সংস্কৃতি লোকজীবন:

কৃষিভিত্তিক সমাজ জীবনসংগ্রাম: 

জসীমউদ্দীন কেবল প্রকৃতির কবি নন, তিনি লোকজ মনন গ্রামীণ ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ রূপকার। 'রাখালী' কাব্যে গ্রামীণ সমাজের লোকবিশ্বাস, কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা এবং দৈনন্দিন আচার-আচরণ অত্যন্ত জীবন্তভাবে ফুটে উঠেছে। চাষিদের লাঙল চালানো, নিড়ানি দেওয়া এবং মাঠের মাঝখানে প্রকৃতির কোলে বসে মেঠো সুরে গান গাওয়ার ছবিগুলো লোকসংস্কৃতির এক সজীব দলিল। কৃষকের এই যাপিত জীবনের চিত্র কবির লেখনীতে অত্যন্ত প্রাণবন্ত:

ওই যে দেখ নীল-নোয়ান সবুজ-ঘেরা গাঁ,

কলার পাতা দোলায় চামর শিশির ধোয়ায় পা;

সেথায় আছে ছোট্ট কুটির সোনার পাতা ছাওয়া,

সাঁঝ আকাশে ছড়িয়ে পড়া আবীর রঙে নাওয়া;”

(রাখাল ছেলে)

এই বর্ণনায় কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ জীবনের এক শান্ত মায়াবী রূপ ফুটে উঠেছে। কলার পাতাকেচামরএর সাথে তুলনা করা এবং শিশিরকে পা ধোয়ানোর উপাদান হিসেবে কল্পনা করা কবির গভীর পর্যবেক্ষণ লোকজ ভাবনার পরিচয় দেয়। গ্রামকেআবীর রঙে নাওয়াবলার মধ্য দিয়ে গোধূলি বেলার মায়া গ্রামীণ আবহের প্রতি কবির গভীর মমতা লোকসংস্কৃতির নান্দনিক রূপ প্রকাশ পায়।

লোকবিশ্বাস ধর্মীয় সংস্কার: 

গ্রামীণ মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বিশ্বাস থেকে জন্ম নেওয়া নানা লোকসংস্কার জসীমউদ্দীনের কাব্যের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। অশুভ শক্তি থেকে বাঁচতে তাবিজ ধারণ করা কিংবা রোগমুক্তির জন্য পীরের দরগায় মানত করার মতো লৌকিক রীতিগুলো কবির কবিতায় অত্যন্ত বিশ্বস্তভাবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে 'পল্লী জননী' বা 'রাখালী' কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় এই লোকজ বিশ্বাসের প্রয়োগ লক্ষণীয়। অশুভ শক্তির হাত থেকে বাঁচতে গ্রামীণ কিশোরী বা শিশুদের পীরের দেওয়া তাবিজ পরানোর রীতি সম্পর্কে কবি বলেন:

বাহুতে তার তাবিজ বাঁধা গেঁয়ো পীরের দান,

ঝুমকো টেড়ির-প্রেম-আলাপন শুনছে নিতুই কান।

বারে বারে ঘোমটা খসে লাজ-মেশা-নিলাজ,

পুতুলটিরে বউ সাজাতে নিজেরও বউ সাজ।

----(রাখালী)

গ্রামীণ মানুষের মজ্জাগত সংস্কার যেমন পীরের দোয়া, মসজিদে মোমবাতি দেওয়া এবং ধর্মীয় বিশ্বাস কীভাবে তাদের সংকটকালে মানসিক শক্তি জোগায়, কবি তা অতি নিপুণভাবে চিত্রিত করেছেন। এই লৌকিক সংস্কারগুলো পল্লী জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক অংশ।

লোকজ উৎসব, সংগীত জীবনযাপনের সামগ্রী: 

লোকজ ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গ্রামীণ মরমী জীবন, লোকসংগীত এবং তাদের প্রাত্যহিক উৎসব। 'রাখালী' কাব্যের অনেক কবিতা যেমন ভাটিয়ালি, ঘাটু বা মরমী গানের সুরকে ধারণ করে রচিত। বৈরাগী বোষ্টমীর প্রেম এবং তাদের যাপিত জীবনের আচারগুলো গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির এক প্রাচীন স্বতন্ত্র ধারাকে প্রতিনিধিত্ব করে:

হাতে তাহার খুব ঘুমাঘুম বাজে রসের একতারা,

বৈরাগী বউর রূপের গাঙ্গে মুর্চ্ছি সে সুর হয় হারা।

বৈরাগী যে চলছে পথে চলছে রসের রূপখানি,

বৈরাগী তার একতারাতে চলছে তারি সুর হানি।

----- (বৈরাগী আর বোষ্টমী যায়)

একতারার সুর লোকজ গানের ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। কবি এখানে তাদের পোশাক, অলংকার বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখের মাধ্যমে লোকসংস্কৃতির এক প্রামাণ্য ছবি এঁকেছেন। এছাড়াও গ্রামীণ বিবাহকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আচার-অনুষ্ঠান, যেমন গায়ে-হলুদ, বিয়ের গান এবং ধান-দূর্বা বরণ-কুলা দিয়ে বরণ করার লৌকিক রীতিগুলো এই কাব্যে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

আবার,

“শোন মা! আমার লাটাই কিন্তু রাখিও যতন করে,

রাখিও ঢ্যাঁপের মোয়া বেঁধে তুমি সাত-নরি শিকা পরে।

খেজুরে-গুড়ের নয়া পাটালিতে হুড়ুমের কোলা ভরে,

ফুলঝুরি সিকা সাজাইয়া রেখো আমার সমুখ পরে”

---- (পল্লী জননী) 

লাটাই, ঢ্যাঁপের মোয়া, সাত-নরি শিকা বা খেজুর গুড়ের পাটালির মতো সাধারণ ঘরোয়া উপকরণের উল্লেখ পল্লী বাংলার মাটির ঘ্রাণকে মূর্ত করে তোলে।

নিসর্গ লোক সংস্কৃতির সমন্বয়:

 'রাখালী' কাব্যের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই যে, কবি প্রকৃতি এবং লোকজীবনকে আলাদা করে দেখেননি। গ্রামীণ মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতিটি ধাপে প্রকৃতি ছায়ার মতো মিশে আছে। কৃষকের ঘাম যখন মাটিতে পড়ে, তখন সেই মাটিই তাকে অন্ন দেয়এই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কই কবির কবিতার মূল উপজীব্য। লোকসংস্কৃতির প্রতিটি আচারসে রোগমুক্তির জন্য দোয়া হোক বা বিয়ের গানসবকিছুই পল্লী প্রকৃতির স্নিগ্ধ আবহে লালিত হয়। প্রকৃতি এখানে মানুষের শোকের সময় ঝরা পাতা হয়ে কাঁদে, আবার আনন্দের সময় হিজল ফুলের সুবাস ছড়ায়। এই সমন্বয় জসীমউদ্দীনের কাব্যে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে, যা নাগরিক বাংলা কবিতায় বিরল।

উপসংহার:

জসীমউদ্দীনেররাখালীকেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি পল্লী বাংলার এক মরমী জীবন-দলিল। কবির সহজ-সরল প্রাঞ্জল ভাষা পল্লী জীবনকে যেমন জীবন্ত করেছে, তেমনি তাঁর নিপুণ নিসর্গ চেতনা বাংলার মাটিকে দিয়েছে এক বিশ্বজনীন আবেদন। লোকসংস্কৃতির উপাদানগুলোকে তিনি যেভাবে আধুনিক কাব্যের আঙ্গিকে মহিমান্বিত করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত। 'রাখালী' কাব্যে প্রকৃতি এবং গ্রামীণ মানুষ একে অপরের পরিপূরক হয়ে একাত্ম হয়ে গেছে।রাখালী মাধ্যমে জসীমউদ্দীন প্রমাণ করেছেন যে, শাশ্বত বাংলার প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে তার প্রকৃতির শ্যামল ছায়ায় এবং সাধারণ মানুষের সহজ জীবনবোধের গভীরে। বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় তাঁর এই সৃজনশীল অবদান অনাগতকাল ধরে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে মাটির ঘ্রাণ হয়ে টিকে থাকবে।

S M A Hanif
BA (Hon's) Bangla, MA
Banglsdesh Open Univesity

No comments

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.