ads

‘চতুর্দশপদী কবিতবলী’ অবলম্বনে মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রার্থনামূলক কবিতাসমূহের পরিচয় দাও।

‘চতুর্দশপদী কবিতবলী’ অবলম্বনে মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রার্থনামূলক কবিতাসমূহের পরিচয় দাও।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বৈপ্লবিক প্রতিভা। তিনি যেমন মহাকাব্য নাটকে আধুনিকতার প্রবর্তন করেছেন, তেমনিচতুর্দশপদী কবিতাবলী মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে সনেটের জনক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ফ্রান্সের ভার্সাই নগরে প্রবাস জীবনের চরম অর্থকষ্ট, একাকীত্ব এবং ফেলে আসা স্বদেশের প্রতি গভীর অনুরাগের মুহূর্তে কবির অন্তরের যে ব্যাকুল আর্তি ফুটে উঠেছে, তার একটি বড় অংশই হলো তাঁর প্রার্থনামূলক কবিতাসমূহ।

 

আত্মনিবেদন প্রার্থনার স্বরূপ: 

মধুসূদনের প্রার্থনামূলক কবিতার মূলে রয়েছে এক ধরণের কনফেশনবা স্বীকারোক্তি জীবনের এক দীর্ঘ সময় তিনি পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণে নিজের ভাষা সংস্কৃতিকে অবহেলা করেপরধনেরলোভে বিদেশের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছিলেন। কিন্তু প্রবাস জীবনের নিঃসঙ্গতায় তিনি উপলব্ধি করেন যে তাঁর প্রকৃত পরিচয় শান্তি নিহিত রয়েছে নিজের দেশ এবং মাতৃভাষার শেকড়ে। এই উপলব্ধি থেকেই তাঁর আধ্যাত্মিক মানসিক রূপান্তরের প্রার্থনা শুরু হয়।

তাঁর এই প্রার্থনা কেবল প্রথাগত ঈশ্বরকেন্দ্রিক আরাধনা নয়; বরং তা শৈশবের স্মৃতি, জন্মভূমি, মাতৃভাষা এবং জাতীয় ঐতিহ্যের কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার এক গভীর আকুতি। তিনি যখনই আধ্যাত্মিক সংকটে পড়েছেন, তখনই তাঁর মনে এক ধরণের দ্রবীভূতঅবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যেখান থেকে তিনি অতীতের ভুল সংশোধন করে মাতৃভূমির ক্ষমা ভিক্ষা করেছেন। নিজের শিল্পসত্তাকে সার্থক করার জন্য এবং কাব্যপ্রতিভাকে বিকশিত করার জন্য তিনি ঐশ্বরিক আশীর্বাদ পূর্বসূরী মহাকবিদের করুণা প্রার্থনা করেছেন। 

সৃষ্টিকর্তা (ঈশ্বরের প্রতি আকুলতা): 

সৃষ্টিকর্তাকবিতায় মধুসূদন এই বিশাল রহস্যময় বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধিপতির স্বরূপ সন্ধানে ব্যাকুল হয়েছেন। তিনি প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের কাছে প্রশ্ন করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই মহান শক্তির চরণে নিজেকে সঁপে দিয়ে সত্যকে জানার দীক্ষা চেয়েছেন। কবির বিনম্র আর্তি এখানে আধ্যাত্মিক দার্শনিক রূপ লাভ করেছে। 

কে সৃজিল সুবিশ্বে, জিজ্ঞাসিব কারে

রহস্য কথা, বিশ্বে আমি মন্দমতি?

পার যদি, তুমি দাসে কহ, বসুমতি ; —

দেহ মহা-দীক্ষা, দেবি, ভিক্ষা চিনিবারে

----(সৃষ্টিকর্তা) 

এখানে কবি নিজেকেমন্দমতিঅধমহিসেবে উপস্থাপন করে সৃষ্টিকর্তার মহিমা বুঝতে চেয়েছেন এবং দেবী বসুমতীর কাছে সত্যের দীক্ষা প্রার্থনা করেছেন। 

কপোতাক্ষ নদ (স্মৃতিকাতরতা ক্ষমা প্রার্থনা): 

স্মৃতিকাতরতা এবং প্রার্থনার এক অনন্য মিশেল হলো কবির শৈশবস্মৃতিবিজড়িতকপোতাক্ষ নদ দূর প্রবাসে বসে কবি নদের কাছে প্রার্থনা করছেন যেন নদ তাঁকে তাঁরসন্তানহিসেবে মনে রাখে। স্বদেশের প্রতি তাঁর এই গভীর ভালোবাসা ভক্তির আর্তিই এখানে প্রার্থনার মূল সুর। 

সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে।

সতত তোমার কথা ভাবি বিরলে;

সতত ( যেমতি লোক নিশার স্বপনে

শোনে মায়া-মন্ত্রধ্বনি ) তব কলকলে

----(কপোতাক্ষ নদ) 

কবির ভয় হয় হয়তো আর কোনোদিন তাঁর এই প্রিয় নদের দেখা পাবেন না, তাই তিনি নদের মাধ্যমে স্বদেশের মানুষের কাছে তাঁর প্রেমের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার বিনম্র প্রার্থনা জানিয়েছেন। 

বঙ্গভাষা (মাতৃভাষা স্বদেশের কাছে নিবেদন): 

এই সনেটটি মধুসূদনের এক প্রকার মানসিক রূপান্তরের প্রার্থনা এখানে কবি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, তিনি নিজ ভাষার অমূল্য সম্পদ অবহেলা করে বিদেশের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। বঙ্গলক্ষ্মীর প্রত্যাদেশের মাধ্যমে নিজের ভুল বুঝতে পেরে তিনি মাতৃভাষার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার সংকল্প করেছেন। 

হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন ; —

তা সবে, ( অবোধ আমি! ) অবহেলা করি,

পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ

পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।

----(বঙ্গভাষা) 

মাতৃভাষার অবহেলার জন্য যে গ্লানি কবির মনে জমেছিল, তা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে তিনি এই সনেটে নিজের অনুশোচনা প্রার্থনা ব্যক্ত করেছেন। 

কমলে কামিনী (সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বন্দনা): 

কমলে কামিনীকবিতায় মধুসূদন বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীরচণ্ডীমঙ্গলকাব্যের অলৌকিক রূপকল্পকে তিনি তাঁর আধুনিক সনেটে বন্দনা করেছেন। এটি মূলত বাংলা কাব্য-ঐতিহ্যের কাছে কবির এক বিনম্র নিবেদন ভক্তিপ্রার্থনা। 

 অমর করিলা তোমা অমরকারিণী

বাগ্দেবী! ভোগিলা দুখ জীবনে, ব্রাহ্মণ,

এবে কে না পূজে তোমা, মজি তব গানে?—

বঙ্গ-হৃদ-হ্রদে চণ্ডী কমলে কামিনী॥

----(কমলে কামিনী) 

এই পঙক্তিগুলোর মাধ্যমে মধুসূদন আসলে প্রকাশ করেছেন যে, শিল্পের সাধনায় যে দৈব আশীর্বাদ থাকে, তা জাগতিক সকল দুঃখ-কষ্টকে ছাপিয়ে শিল্পীকে অমর করে রাখে। তিনি মুকুন্দরামের গানের মধ্য দিয়ে বাংলার শাশ্বত রূপকে নিজের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা করার প্রার্থনা জানিয়েছেন। 

কবি (কবি-সত্তার প্রার্থনা): 

    মধুসূদনের কবিতায় শিল্প এবং কবি-সত্তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।কবিশীর্ষক সনেটে তিনি কোভিদ প্রকৃত স্বরূপ এবং যশের অনিশ্চয়তা নিয়ে প্রার্থনা করেছেন। তিনি মনে করেন কবিকে এমন হতে হবে যাঁর কল্পনার ছোঁয়ায় মরুভূমিও জলবতী নদীতে রূপান্তরিত হয়। 

কে কবিকবে কে মোরে ? ঘটকালি করি,

শব্দে শব্দে বিয়া দেয় যেই জন,

সেই কি সে যম-দমী ? তার শিরোপরি

শোভে কি অক্ষয় শোভা যশের রতন ?”

----(কবি) 

এখানে কবির প্রার্থনা হলো দেবী সরস্বতী যেন তাঁর মনে কল্পনার বাগান বিকশিত করেন এবং তাঁর কাব্যকে অক্ষয় যশের মর্যাদা দেন। 

কবিতা (শিল্প সত্তার প্রার্থনা): 

কবিতাশীর্ষক সনেটে মধুসূদন দেবী সরস্বতী বা বাগদেবীর কাছে প্রার্থনা করেছেন যাতে তাঁর হৃদয়ে কাব্যরসের সঞ্চার ঘটে। কবির মতে, যাঁর হৃদয় সংবেদনশীল নয়, সে কখনও কবিতার অমৃত আস্বাদন করতে পারে না। 

অন্ধ যে কি রূপ কবে তার চক্ষে ধরে

নলিনী? রধিলা বিধি কর্ণ-পথ যার

লভেনি কি সে সুখ কভু বীণার সুস্বরে?

 কি কাক, কি পিকধ্বনি, সম-ভাব তার

----(কবিতা) 

এখানে কবির প্রার্থনা হলো দেবী যেন তাঁর মনে কাব্যের উদ্যান বিকশিত করেন এবং পাঠককে সেই কাব্যের সৌন্দর্য উপলব্ধি করার ক্ষমতা দেন। 

মহাভারত (পৌরাণিক ঐতিহ্যের বন্দনা): 

    মধুসূদন প্রাচীন মহাকবিদের ঋণের কথা কখনও ভুলতে পারেননি।মহাভারতসনেটে তিনি বেদব্যাস বা সত্যবতী-সুত কবির প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা প্রার্থনা নিবেদন করেছেন। মহাভারতের মহিমা তাঁকে নতুন কাব্য রচনার প্রেরণা জুগিয়েছে।

কল্পনা-বাহনে সুখে করি আরোহণ,

উতরিনু, যথা বসি বদরীর তলে,

করে বীণা, গাইছেন গীত কুতূহলে

সত্যবতী-সুত কবি,—ঋষিকুল-ধন !”

----(মহাভারত) 

এই কবিতার মাধ্যমে কবি আসলে তাঁর নিজের কাব্য-প্রতিভার সার্থকতা কামনায় প্রাচীন মহাকবিদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছেন। 

মেঘদূত (সাহিত্যিক ঐতিহ্যের বন্দনা): 

    সংস্কৃত মহাকবি কালিদাসেরমেঘদূতমধুসূদনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। প্রবাস জীবনের বিরহী মুহূর্তে তিনি মেঘদূতের যক্ষের মতো নিজের ব্যথার বার্তা পৌঁছানোর জন্য কালিদাসের শরণাপন্ন হয়েছেন। এটি কবির কাব্য-ঐতিহ্যের কাছে এক প্রকার শিল্পিত প্রার্থনা। 

কামী যক্ষ দগ্ধ, মেঘ, বিরহ-দহনে,

দ্রুত-পদে বরি পূর্ব্বে, তোমায় সাধিল

বহিতে বারতা তার অলকা-ভবনে,

যথা ক্ষুণ্ণ মনে প্রিয়া শূন্যঘরে ছিল।

----(মেঘদূত) 

কালিদাসের মেঘদূতের বিরহী যক্ষের আকুলতা যেমন কবিকে মুগ্ধ করেছে, তেমনি তিনি কালিদাসের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছেন তাঁর নিজের কাব্যসৃষ্টিকে সার্থক করতে। 

শিল্পমূল্য উপসংহার: 

    বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই প্রার্থনামূলক সনেটগুলো কেবল আধ্যাত্মিক আরাধনা নয়, বরং এগুলো কবির নিজস্ব আত্মানুসন্ধানের দলিল তাঁর প্রার্থনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গভীর অনুশোচনা, দেশপ্রেম এবং শিল্পের প্রতি পরম নিষ্ঠা। মধুসূদন তাঁর এই সনেটগুলোর মাধ্যমেই প্রথম দেখিয়েছেন যে, ব্যক্তিগত শোক, তাপ এবং প্রার্থনাকে কীভাবে ধ্রুপদী চতুর্দশ চরণের বাঁধুনিতে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়া যায়।

মধুসূদনের এই প্রার্থনামূলক ভাবনাগুলো বাংলা সনেটকে কেবল আঙ্গিকগতভাবে নয়, বরং আধ্যাত্মিক মানসিক গাম্ভীর্যের দিক থেকেও সমৃদ্ধ করেছে। প্রবাস জীবনের সেই অন্ধকার দিনগুলোতে এই প্রার্থনাই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার মূল রসদ, যা আজও পাঠকের হৃদয়ে সমভাবে আবেদন সৃষ্টি করে। এভাবেই মধুসূদনেরচতুর্দশপদী কবিতাবলীবাংলা সাহিত্যে আত্মনিবেদন প্রার্থনার এক অনন্য শিল্পিত স্মারক হিসেবে অমর হয়ে আছে।

S M A Hanif
BA (Hon's) Bangla, MA
Banglsdesh Open Univesity

No comments

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.