ads

আলাউদ্দিন আল আজাদের 'জেগে আছি' গল্পগ্রন্থের নামকরণের সার্থকতা ও শোষিত মানুষের জাগরণ

আলাউদ্দিন আল আজাদের 'জেগে আছি' গল্পগ্রন্থের নামকরণের সার্থকতা ও শোষিত মানুষের জাগরণ

আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯) বাংলা সাহিত্যের পঞ্চাশের দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী, কবি প্রাবন্ধিক। অত্যন্ত অল্প বয়সে সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করে তিনি সমকালীন সমাজ বাস্তবতাকে যে নিপুণতায় তুলে ধরেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের দরবারেও প্রশংসিত হয়েছে। শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শের এক অদম্য কণ্ঠস্বর ছিলেন তিনি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত তার অমর কবিতাস্মৃতিস্তম্ভআজও বাঙালির প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। মূলত সমাজসচেতনতা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের চেতনা ছিল তার সাহিত্যকর্মের মূল চালিকাশক্তি।

আলাউদ্দিন আল আজাদের প্রথম গল্পগ্রন্থ 'জেগে আছি' (১৯৫০) যখন প্রকাশিত হয়, তখন তার বয়স ছিল মাত্র সতেরো-আঠারো বছর। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই গ্রন্থটি একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক। 'জেগে আছি' নামকরণের সার্থকতা কেবল একটি নিছক নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিম্নবর্গীয় মানুষের রুখে দাঁড়ানোর অদম্য স্পৃহা এবং মার্কসবাদী দর্শনের এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। এই নামকরণের সার্থকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ব্যক্তিগত কোনো জাগরণ নয়, বরং শোষিত বঞ্চিত শ্রমিক-কৃষক সমাজের সম্মিলিত ঘুম ভেঙে জেগে ওঠার এক মহান ইতিবৃত্ত।

নামকরণের প্রেক্ষাপট রাজনৈতিক দর্শন

'জেগে আছি' গ্রন্থের নামকরণের মূলে রয়েছে লেখকের গভীর রাজনৈতিক সচেতনতা। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গের সামাজিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় শোষক শোষিত শ্রেণির যে দান্দিক অবস্থান তৈরি হয়েছিল, লেখক তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাধারণ মানুষ যখন তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়, তখনই তারা প্রকৃত অর্থে জেগে ওঠে। এই জাগরণ কেবল দৈহিক নয়, বরং তা মনস্তাত্ত্বিক আদর্শিক। মার্কসবাদী দর্শনের আলোকে লেখক দেখিয়েছেন যে, যুগ যুগ ধরে নিপীড়িত মানুষ যখন তাদের শেকল ভাঙার প্রেরণা পায়, তখনই তারা ঘোষণা করে— 'আমরা জেগে আছি' এই জাগরণই শোষকের সিংহাসন টলিয়ে দেওয়ার প্রধান হাতিয়ার।

গল্পের আলোকে সামাজিক সচেতনতা নামকরণের সার্থকতা

গ্রন্থের প্রতিটি গল্পে নামকরণের এই সার্থকতা বিভিন্ন রূপে প্রতিফলিত হয়েছে। নিচে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি গল্পের প্রেক্ষিতে তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

সৃষ্টিগল্পে চেতনার জাগরণ: এই গল্পে আমরা মাহমুদ পণ্ডিত নামক একজন প্রাথমিক শিক্ষকের চরম দারিদ্র্য আদর্শিক লড়াইয়ের চিত্র দেখতে পাই। দীর্ঘ নয় মাস বেতন না পেয়েও তিনি শিক্ষাদান চালিয়ে যান, যা শোষক শ্রেণির উদাসীনতাকে প্রকাশ করে। যখন জোতদার কাসেম আলী চৌধুরী তার স্কুল ঘরকে গোয়াল ঘরে পরিণত করতে চায় এবং স্কুল বন্ধ করে শিশুদের কারখানায় কাজ করতে বাধ্য করতে চায়, তখন এই বৃদ্ধ শিক্ষক রুখে দাঁড়ান। তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হলেও তার চেতনা ঘুমিয়ে থাকেনি। গল্পের শেষ মুহূর্তে তার উপলব্ধি শোষিত মানুষের সম্মিলিত জাগরণকেই প্রকাশ করে। তিনি শাহু নামক তার ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন

এখানে বড় বেদনা আমার বেদনা তোমাদের বেদনা হয়ে উঠুক এই আমি চাই।” (সৃষ্টি)

এই উক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যক্তিগত কষ্টকে যখন সমষ্টিগত বেদনায় রূপান্তর করা হয়, তখনই প্রতিবাদের ভাষা সৃষ্টি হয়। মাহমুদ পণ্ডিতের এই চেতনা আসলে 'জেগে ওঠা'রই নামান্তর।

মুখোমুখীগল্পে সম্মিলিত প্রতিরোধ: এই গল্পটি সরাসরি শ্রেণি-সংগ্রামের এক অনন্য দলিল। ধান কাটার মজুররা যখন তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয় এবং জোতদারের পুলিশ তাদের ভয় দেখাতে আসে, তখন গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ রহিম বক্স সবার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধের ডাক দেয়। তার এই তেজস্বী রূপ প্রমাণ করে যে, সাধারণ মজুররা আর ঘুমিয়ে নেই। রহিম বক্সের সেই অসামান্য সংলাপ

আমি বুড়া মানুষ, মরলেও কোন ক্ষতি নাই, আমরা সামনে দাঁড়াই।” (মুখোমুখী)

এই উক্তিটি কেবল বীরত্বের প্রকাশ নয়, বরং এটি শোষিতের সেই জাগরণ যা মৃত্যুর ভয়কেও তুচ্ছ জ্ঞান করে। রহিম বক্স এখানে শোষিত শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা করছেন যে, তারা আজ শোষকের রাইফেলের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে বলতে পারেন— 'আমরা জেগে আছি'

ফেরারগল্পে বৈপ্লবিক স্পৃহা: কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত এই গল্পে হারুন নামক এক কিশোরের আত্মত্যাগের চিত্র ফুটে উঠেছে। সরকারি কর্মকর্তা বাবার কঠোর বাধা নির্যাতনের মুখেও হারুন তার রাজনৈতিক আদর্শ ত্যাগ করেনি। সে অসুস্থ শরীর নিয়ে মজুরদের ধর্মঘটে অংশ নেয়। তার মৃত্যুও যেন এক প্রকার জেগে থাকা। মৃত্যুর আগে তার দৃঢ় ঘোষণা ছিল

স্ট্রাইক শেষ নয় হলো সবে মাত্র লড়াইয়ের শুরু।” (ফেরার)

হারুন মারা গেলেও তার আদর্শের যে মশাল সে জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে, তা বস্তির ঝাড়ুদার, মেথর রিকশাচালকদের মনে এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি করে। হারুনের মৃতদেহ দেখতে আসা প্রান্তিক মানুষের ভিড় প্রমাণ করে যে, তারা আজ নেতার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে জেগে উঠেছে।

সুন্দরী সুন্দরীগল্পে একক আত্মত্যাগ: এই গল্পে সুন্দরী নামক এক বৃদ্ধার মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে যখন সমষ্টিগত স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন তারা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। গ্রামের মানুষকে পুলিশের নিপীড়ন থেকে বাঁচাতে সুন্দরী নিজে মিথ্যা অপরাধ স্বীকার করে নেয়। তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর

আগুন আমি লাগাইছিলাম।” (সুন্দরী সুন্দরী)

এখানে সুন্দরীর এই পদক্ষেপ গ্রামবাসীকে পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এক প্রকার সচেতন কৌশল। নিজের জীবন উৎসর্গ করে তিনি যে জাগরণের পরিচয় দিয়েছেন, তা 'জেগে আছি' নামকরণের সার্থকতাকে আরও জোরালো করে।

শিকড়একটি কথার জন্মগল্পে অধিকারের লড়াই: দেশবিভাগের প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের ভিটেমাটি রক্ষার সংগ্রাম ফুটে উঠেছেশিকড়গল্পে। এখানে লেখক অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছেন যে, শোষক শ্রেণির কোনো ধর্ম নেই; তাদের একমাত্র লক্ষ্য গরিবের সম্পদ লুট করা। হাফিজের উপলব্ধি-

আরে হিন্দু কও আর মুসলমানই কও গরিবের সবখানে একই হাল। ওরা যাইতেছে কোলকাতা আর আমরা আসাম। দুয়ের মধ্যে ফারাকটা কি শুনি? কিছুই নাই।” (শিকড়)

এই সচেতনতা মানুষকে সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে শ্রেণিগত ঐক্য গড়তে সাহায্য করে। অন্যদিকেএকটি কথার জন্মগল্পে রেলওয়ে স্টেশনের সাধারণ চা-বিক্রেতা কালু মিয়ার মাধ্যমে স্টেশনের প্রভাবশালী চক্রের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের চিত্র পাওয়া যায়। উচ্ছেদ হওয়ার মুহূর্তে তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর

যেখান থেকেই তাড়াও না কেন জেনে রাখো জায়গা আমাদের ফুরাবে না।” (একটি কথার জন্ম)

কালু মিয়ার এই দৃঢ়তা প্রমাণ করে যে, শোষিত মানুষের কণ্ঠরোধ করা অসম্ভব, কারণ তারা এখন তাদের অধিকারের জায়গা সম্পর্কে সচেতনভাবে জেগে উঠেছে।

নামকরণের মনস্তাত্ত্বিক শৈল্পিক বিশ্লেষণ

'জেগে আছি' নামকরণটি একই সাথে রূপক প্রতীকী। এখানে 'জাগরণ' মানে কেবল ঘুম থেকে ওঠা নয়, বরং তা হলো অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোয় ফেরা। মধ্যযুগের ভাগ্যনির্ভরতা কাটিয়ে আধুনিককালের মানুষ যখন বুঝতে পারে যে তাদের ভাগ্য তাদের নিজেদের শ্রম সংগ্রামের ওপর নির্ভরশীল, তখনই তারা প্রকৃত অর্থে জেগে ওঠে। আলাউদ্দিন আল আজাদ তার গল্পগুলোতে প্রকৃতির বর্ণনাকেও এই জাগরণের অনুসঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কোথাও পাহাড়ী ঝড়ের হিসহিস শব্দ, কোথাও ভোরের সূর্যের রক্তিম আভাএই সবই আসন্ন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

লেখক নিজেও এক জায়গায় বলেছেন যে, তার এই গল্পগুলোতে শ্রেণি-সংগ্রামের যে প্রতিচ্ছবি রয়েছে তা তার নিজের জীবন অভিজ্ঞতারই অংশ। তার ভাষায়

ছোটবেলা থেকেই আমার জীবন সাহিত্য অবিচ্ছেদ্য। সতেরো বছর বয়সে প্রকাশিত আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ 'জেগে আছি' গল্পগুলোতে যে শ্রেণিযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি তারও একই কারণ আমার সাহিত্য, আমার অভিজ্ঞতা আত্মচরিত।” 

এটি স্পষ্ট করে যে, লেখক নিজেও সেই সময়কার রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে বাস করছিলেন এবং সমাজকে বদলে দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়েই এই নামকরণটি করেছিলেন।

পরিশেষে বলা যায়, আলাউদ্দিন আল আজাদের 'জেগে আছি' গল্পগ্রন্থের নামকরণটি সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সার্থক সপ্রয়োজন। এটি কেবল একটি শিরোনাম নয়, বরং এটি শোষিত মানুষের এক সম্মিলিত বজ্রনিনাদ। গল্পের চরিত্রগুলোমাহমুদ পণ্ডিত, রহিম বক্স, হারুন বা সুন্দরীকেউ একক ব্যক্তি নয়, তারা প্রত্যেকেই শোষিত মানবতার একেকটি জাগ্রত রূপ। তারা প্রমাণ করেছেন যে, নিপীড়ন যত কঠোর হয়, প্রতিরোধের আগুন তত বেশি প্রজ্বলিত হয়।

তৎকালীন পূর্ববঙ্গের অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশে সাধারণ মানুষের মনে অধিকার সচেতনতার যে বীজ এই গ্রন্থটি বপন করেছিল, তার প্রতিফলন আজও প্রাসঙ্গিক। শোষক শ্রেণির চক্রান্ত, পুলিশের দাপট আর জোতদারদের অত্যাচারের বিপরীতে এই গল্পের মানুষগুলো পরাজয় স্বীকার করেনি, বরং তারা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই 'জেগে আছি' নামকরণটি এই গল্পের মানুষের অজেয় মনোভাব, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং সমাজ পরিবর্তনের চিরস্থায়ী আকাঙ্ক্ষাকেই সার্থকভাবে ধারণ করে আছে। এই নামকরণের মধ্য দিয়েই লেখক আলাউদ্দিন আল আজাদ বাংলা ছোটগল্পের ধারায় এক নতুন প্রগতিশীল অধ্যায়ের সূচনা করেছেন। 

S M A Hanif
BA (Hon's), MA
Bengali Language and Literature

No comments

"আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখে জানান। আপনার যেকোনো পরামর্শ সাদরে গৃহীত।"

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.