ads

রক্তকরবী নাটকের নন্দিনী চরিত্র বিশ্লেষণ

রক্তকরবী নাটকের নন্দিনী চরিত্র বিশ্লেষণ

বাংলা সাহিত্যের মুকুটহীন সম্রাট বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) তাঁর গভীর জীবনবোধ দার্শনিক চিন্তার মাধ্যমে আমাদের নাট্যসাহিত্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রতীকী রূপক নাট্যধারায় তাঁর সুনিপুণ লেখনীর এক শ্রেষ্ঠ কালোত্তীর্ণ নিদর্শন হলো রক্তকরবী’ (১৯২৬) নাটকটি। এই নাটকের সমগ্র ভাববস্তু, দ্বন্দ্ব দার্শনিক সত্য যাঁর চারপাশ ঘিরে আবর্তিত হয়েছে, সে হলো নাটকের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রনন্দিনী নন্দিনী কেবল একটি রক্তমাংসের চরিত্র নয়, সে যান্ত্রিক সভ্যতার যূপকাষ্ঠে পিষ্ট মেদিনী মানবাত্মার অবিনশ্বর ক্রন্দন এবং তার সমান্তরালে এক অমল মুক্তির গান। নাট্যকার এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে একদিকে শোষিত মানবতার মুক্তি এবং অন্যদিকে প্রকৃতির সহজ সুন্দরের অমোঘ বিজয়কে অত্যন্ত সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।


উচ্ছল যৌবন মুক্ত প্রাণের প্রতীক

নন্দিনী যক্ষপুরীর ধূসর, তামাটে প্রাণহীন প্রেক্ষাপটে এক পশলা বসন্তের হাওয়া কিংবা শরতের অমল আলো। যেখানে মানুষ দিনরাত মাটির বুক চিরে সোনার তাল আহরণ করার এক অন্ধ নিরন্তর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, সেখানে নন্দিনী তার সহজ রূপ, চঞ্চল গতিময়তা জীবনের জয়গান নিয়ে আবির্ভূত হয়। তার অঙ্গে শোভা পায় রক্তকরবী ফুলের লাল মঞ্জরি, যা তার ভেতরের অদম্য প্রাণশক্তি গভীর ভালোবাসার কথাই মনে করিয়ে দেয়। যক্ষপুরীর কঠিন পাথর কাটার নির্মম বাস্তবতার মাঝেও সামান্য কিশোর কায়িক শ্রমের দাসত্ব ভুলে নন্দিনীর জন্য ফুল খুঁজে আনার আকুতি প্রকাশ করে। কিশোরের সংলাপে এই সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে:

"সমস্তদিন তো কেবল সোনার তাল খুঁড়ে আনি, তার মধ্যে একটু সময় চুরি করে তোমার জন্যে ফুল খুঁজে আনতে পারলে বেঁচে যাই।" (উৎস: রক্তকরবী)

যক্ষপুরীর যান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার চরম শোষণের মধ্যেও মানুষের ভেতরের সহজ সৌন্দর্যবোধ ভালোবাসার সুকুমার বৃত্তিগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় না। নন্দিনীর সান্নিধ্য প্রেরণা কিশোরের মতো অবদমিত হৃদয়েও প্রাণের স্পর্শ এনে দেয়। জড়বস্তু সোনার তালের চেয়ে সজীব সুন্দর ফুলের মূল্য যে অনেক বেশি, কিশোরের এই উপলব্ধির মাধ্যমেই নন্দিনীর মুক্ত প্রাণের অমোঘ প্রভাব প্রতিফলিত হয়।

প্রেম নিবিড় মানবতাবাদ

নন্দিনী চরিত্রের অন্যতম প্রধান বৈচিত্র্য হলো তার গভীর মানবপ্রেম সহমর্মিতা। সে কেবল তার আরাধ্য নায়ক রঞ্জনকেই ভালোবাসে না, বরং যক্ষপুরীর প্রতিটি নিপীড়িত, লাঞ্ছিত অসহায় মানুষের প্রতি তার হৃদয়ে রয়েছে এক নিবিড় মমত্ববোধ। ফাগুলাল, চন্দ্রা কিংবা বিশু পাগলের দুঃখ-কষ্টে সে সমব্যথী হয়ে ওঠে। নন্দিনীর এই প্রেম সুন্দরের অতীন্দ্রিয় প্রকাশ যক্ষপুরীর নিষ্ঠুর শুষ্ক শাসক রাজাকেও ভেতর থেকে নাড়া দেয়। ক্ষমতার চূড়ায় বসেও রাজা নিজের একাকীত্ব রিক্ততা অনুভব করতে পারেন নন্দিনীকে দেখে। রাজার সেই হাহাকার আকুতি নাটকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে প্রকাশিত হয়েছে:

"আমি প্রকাণ্ড মরুভূমিতোমার মতো একটি ছোট ঘাসের দিকে হাত বাড়িয়ে বলছি, আমি শুষ্ক, আমি রিক্ত, আমি ক্লান্ত।" (উৎস: রক্তকরবী)

বৈষয়িক সম্পদ, বিজ্ঞান পাশবিক শক্তির বিপুল দম্ভ মানুষকে সাময়িক ক্ষমতা দিতে পারে, কিন্তু তা অন্তরের প্রশান্তি দিতে পারে না। রাজা বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়েও আসলে এক তৃষ্ণার্ত মরুভূমি, যাঁর প্রাণের সবুজকে জাগিয়ে তোলার কোনো ক্ষমতা নেই। অন্যদিকে নন্দিনী হলো সহজ সজীব একটি ছোট ঘাস, যার মধ্যে প্রবহমান রয়েছে জীবনরসের অমল ধারা। পুঁজিবাদী শাসক বুঝতে পারেন যে তাঁর জড়শক্তি নন্দিনীর এই প্রাণময়তার কাছে অত্যন্ত তুচ্ছ এবং অসহায়।

যক্ষপুরীর যান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের রূপকার

যক্ষপুরীর শাসক সর্দাররা মিলে যে শোষণের জাল বুনেছে, নন্দিনী তার বিরুদ্ধে এক জীবন্ত নির্ভীক বিদ্রোহ। সে যক্ষপুরীর নিয়ম শৃঙ্খলাকে তোয়াক্কা করে না, বরং শোষক সর্দারদের চোখের ওপর দাঁড়িয়ে সত্য কথা বলে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এক অশুভ হাতিয়ার হলো মেকি ধর্ম। ধর্মব্যবসায়ী গোঁসাই যখন শাস্ত্রের বাণী শুনিয়ে শ্রমিকদের অধিকারের লড়াই থেকে বিচ্যুত করতে চায় এবং তাদের মনকে অবশ করার চেষ্টা করে, তখন নন্দিনী তার মুখোশ উন্মোচন করে দেয়। গোঁসাইয়ের এই কপট আধ্যাত্মিকতার মুখে আঘাত করে নন্দিনী অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ভাষায় বলেছে:

"মানুষের প্রাণ ছিঁড়ে নিয়ে তাকে নাম দিয়ে ভোলাবার ব্যবসা তোমার।" (উৎস: রক্তকরবী)

শোষক গোষ্ঠী চিরকালই সাধারণ মানুষের জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ অধিকার কেড়ে নিয়ে তাকে বিভিন্ন তাত্ত্বিক ধর্মীয় সান্ত্বনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখতে চায়। নন্দিনী এই পুঁজিবাদী পুরোহিততন্ত্রের অশুভ আঁতাতকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। সে মানুষকে কোনো সংজ্ঞায় বা সংখ্যায় খণ্ডিত করতে দেয় না, বরং তাদের পূর্ণাঙ্গ মানুষের মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে লড়াই করে। যক্ষপুরীর খণ্ডিতকরণ পদ্ধতির বিরুদ্ধে নন্দিনী চিরকাল অখণ্ড মানবসত্তার মানবিক মর্যাদার এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর।

যক্ষপুরীর চরিত্রগুলোর সাথে নন্দিনীর বহুমাত্রিক সম্পর্ক

রক্তকরবী নাটকে নন্দিনীর চরিত্রটি সম্পর্কের বৈচিত্র্যে অনন্য মাত্রা পেয়েছে। প্রতিটি চরিত্রের সাথে তার যোগসূত্র নাটকটির রূপক অর্থকে পূর্ণতা দেয়।

রঞ্জনের সাথে সম্পর্ক: রঞ্জন নন্দিনীর প্রেম অদম্য যৌবনের রূপক। রঞ্জনের গতি সাহসের ওপর নন্দিনীর গভীর আস্থা রয়েছে। তাই সর্দারদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সে বুক ফুলিয়ে বলে:

"আজ আমার রঞ্জন আসবে, আসবে, আসবেকিছুতে তাকে ঠেকাতে পারবে না।" (উৎস: রক্তকরবী)

মানুষের ভেতরের মুক্ত প্রাণশক্তিকে বন্দি রাখা গেলেও তাকে চিরতরে বিনাশ করা যায় না। রঞ্জন যৌবনের অমোঘ অগ্রদূত, যার বিজয় অনিবার্য।

রাজার সাথে সম্পর্ক: রাজার সাথে নন্দিনীর দ্বান্দ্বিক সম্পর্কটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জালের আড়াল থেকে রাজা নন্দিনীর কোমলতাকে স্পর্শ করতে চান, কিন্তু নিজের জড়শক্তির খাঁচায় ছটফট করেন। নন্দিনীকে উদ্দেশ্য করে রাজার মুগ্ধতা মৃত্যুর সত্য প্রকাশিত হয় এভাবে:

"সামনে তোমার মুখে চোখে প্রাণের লীলা, আর পিছনে তোমার কালো চুলের ধারা মৃত্যুর নিস্তব্ধ ঝরনা।" (উৎস: রক্তকরবী)

নন্দিনী জীবন মৃত্যুর পরম সমন্বয়। সে যেমন প্রেমের মাধ্যমে বাঁচার প্রেরণা দেয়, তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আত্মবিসর্জনের ডাক দেয়।

বিশু পাগল গোকুলের সাথে সম্পর্ক: বিশু পাগল লাঞ্ছিত মানবাত্মার প্রতীক, যে নন্দিনীর গানে সান্নিধ্যে মুক্তির আনন্দ খুঁজে পায়। সে নন্দিনীকেস্বপনতরীর নেয়েবলে। অন্যদিকে শোষকযন্ত্রের অন্ধ দাস গোকুল নন্দিনীকে অলক্ষণ ভাবে, কারণ পুঁজিবাদী যান্ত্রিক মন সুন্দরের তেজ সহ্য করতে পারে না।

ট্র্যাজিক অথচ বিজয়ী বীরত্ব

নাটকের চূড়ান্ত পরিণতিতে নন্দিনী এক অনন্য ট্র্যাজিক বীরত্বে সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সর্দারদের কুচক্রে রঞ্জনের বুকের রক্তে যখন যক্ষপুরীর মাটি লাল হয়ে ওঠে, তখন নন্দিনী কান্নায় ভেঙে না পড়ে রুখে দাঁড়ায়। সে বুঝতে পারে যে শোষণের এই দানবীয় প্রাচীর ভাঙতে হলে তার নিজের জীবনকেও উৎসর্গ করতে হবে। সে রাজার লোহার জালের দরজায় সজোরে আঘাত করে এবং রাজাকে তাঁর নিজের তৈরি দুর্গ ধ্বংস করার আহ্বান জানায়। নন্দিনী নির্ভীক কণ্ঠে ঘোষণা করে:

"আমার অস্ত্র নেই, আমার অস্ত্র মৃত্যু।" (উৎস: রক্তকরবী)

সাধারণ অর্থে অস্ত্র বলতে আমরা যা বুঝি, তা দিয়ে হয়তো মানুষের শরীরকে আঘাত করা যায়, কিন্তু ভাবাদর্শকে বা মুক্ত আত্মাকে ধ্বংস করা যায় না। নন্দিনীর কাছে মৃত্যুর ভয় নেই; সে নিজের মৃত্যুকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে বেছে নেয়। তার এই আত্মত্যাগ যক্ষপুরীর মানুষের মনে জমাট বাঁধা ভয়কে দূর করে দেয়। নন্দিনীর অদম্য প্রতিবাদের শক্তি দেখেই নাটকের শেষভাগে প্রকাশ পায়:

"এতদিন যাদের ভয় দেখিয়ে এসেছ তারা ভয় পেতে একদিন লজ্জা করবে।" (উৎস: রক্তকরবী)

শোষক যখন তার সমস্ত পাশবিক শক্তি প্রয়োগ করেও মানুষের আত্মাকে বশ করতে পারে না, তখন শোষিতের মন থেকে ভয়ের অবসান ঘটে। নন্দিনী তার জীবনের বিনিময়ে যক্ষপুরীবাসীর মনের সেই ভয়ের খাঁচাকে চিরতরে ভেঙে চূর্ণ করে দেয়। রঞ্জনের মৃত্যুর পর নন্দিনী রাজার যৌথ যাত্রা যক্ষপুরীর শোষণযন্ত্রের পতনকে নিশ্চিত করে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেররক্তকরবীনাটকের নন্দিনী চরিত্রটি বাংলা নাট্যসাহিত্যে কেবল একটি অনন্য চরিত্রই নয়, বরং এটি চিরন্তন মানবাত্মা মুক্ত প্রকৃতির এক অমল প্রতীক। রূপক নাটকের সমস্ত শিল্পগুণ নন্দিনী চরিত্রের সার্থক রূপায়ণের মধ্য দিয়ে চরম পূর্ণতা লাভ করেছে। সে যেমন একদিকে সুন্দরের উপাসক, অন্যদিকে তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক বিপ্লবী শক্তি। লোভ লালসার অন্ধকার থেকে মানুষকে আলোর জগতে ফিরিয়ে আনার এই যে মহতী প্রচেষ্টা, তারই এক সার্থক অবিনশ্বর রূপকার হলো নন্দিনী।

No comments

"আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখে জানান। আপনার যেকোনো পরামর্শ সাদরে গৃহীত।"

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.