ads

কাব্য নাটক হিসেবে বুদ্ধদেব বসুর 'তপস্বী ও তরঙ্গিনী'র সার্থকতা

 

কাব্য নাটক হিসেবে বুদ্ধদেব বসুর 'তপস্বী ও তরঙ্গিনী'র সার্থকতা

বাংলা সাহিত্যের পঞ্চপাণ্ডবদের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব, আধুনিক মননশীলতার অগ্রদূত এবং প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের পুরোধা পুরুষ হলেন নাট্যকার কবি বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) তিনি তাঁর অসামান্য সৃজনী প্রতিভা দিয়ে বাংলা কবিতায় যেমন এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিলেন, তেমনই বাংলা নাটকের ক্ষেত্রেও এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন। তাঁর সৃষ্টিকালীন অনন্য প্রতিভার এক চরম নিদর্শন হলো তাঁর বিখ্যাত চার অঙ্কের নাটক তপস্বী তরঙ্গিণী (১৯৬৬) এই নাটকটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাব্যনাটক বা পদ্যনাটকের এক শ্রেষ্ঠ সার্থক কীর্তি হিসেবে স্বীকৃত, যা প্রকাশের পর লাভ করেছিল সম্মানজনক সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। পুরাণকে ভিত্তি করে আধুনিক মানুষের অন্তরের চিরন্তন সংকট মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে যেভাবে তিনি এই নাটকে রূপ দিয়েছেন, তা সত্যিই অনন্য।


কাব্যনাটক কেবল পদ্যে লেখা সংলাপের কোনো নাট্যরূপ নয়, বরং এটি এমন এক বিশেষ সাহিত্যিক ধারা যেখানে নাটকের গতিময়তা এবং কাব্যের ব্যঞ্জনাময় সৌন্দর্য পরস্পরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। এখানে সংলাপ কেবল নাটকের ঘটনাকে এগিয়ে নিয়ে যায় না, বরং তা চরিত্রের অবচেতন মন ভাবজগতের গভীরতর সত্যকে উন্মোচিত করে। 'তপস্বী তরঙ্গিণী' নাটকে কবি বুদ্ধদেব বসু নাট্যমঞ্চের বাস্তবতা এবং কাব্যের গীতিময়তাকে এমন সুনিপুণভাবে মিশ্রিত করেছেন যে, এটি কাব্যনাটক হিসেবে সর্বাঙ্গীণ সার্থকতা লাভ করেছে। নিচে বিভিন্ন বিশ্লেষণাত্মক পয়েন্টের মাধ্যমে এই নাটকের সার্থকতা আলোচনা করা হলো:

পৌরাণিক পটভূমি আধুনিক জীবনচেতনা

নাটকের মূল আখ্যানভাগ গড়ে উঠেছে রামায়ণ মহাভারতের এক সুপরিচিত পৌরাণিক কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে। অঙ্গদেশের অনাবৃষ্টি দূর করার জন্য মুনি বিভাণ্ডকের একমাত্র পুত্র, আজন্ম ব্রহ্মচারী ঋষ্যশৃঙ্গকে কৌশলে নিয়ে আসার দায়িত্ব দেওয়া হয় চম্পানগরের শ্রেষ্ঠ বারাঙ্গনা তরঙ্গিণীর ওপর। পুরাণের এই অতিপ্রাকৃতিক অলৌকিক রূপকথাকে বুদ্ধদেব বসু আধুনিক জীবনচেতনার এক জটিল গভীর মনস্তত্ত্বে রূপান্তরিত করেছেন। নাট্যকারের নিজের ভাষায়, এই নাটকের ঋষ্যশৃঙ্গ তরঙ্গিণী পুরাকালের অধিবাসী হয়েও মনস্তত্ত্বে আমাদেরই সমকালীন। অঙ্গদেশের অনাবৃষ্টি এখানে কেবল প্রাকৃতিক খরা নয়, তা আসলে মানুষের আধ্যাত্মিক মানসিক বন্ধ্যাত্বের প্রতীক। নাটকের শুরুতেই গায়ের মেয়েদের সমবেত হাহাকারে এই খরার রূপটি তীব্রভাবে প্রকাশ পায়:

"আকাশে সূর্যের অটল আক্রোশ, জ্বলছে রুদ্রের রক্তচক্ষু, মাটির ফাটছে বুক, শুকনো জলাশয়, ধুকছে নির্বাক পশুরা; শস্যহীন মাঠ, বন্ধ্যা সধবারা, দিনের পরে দিন দীর্ণ, শূন্যবৃষ্টি নেই!" (উৎস: তপস্বী তরঙ্গিণী)

এই উদ্ধৃতিটির মাধ্যমে নাট্যকার কেবল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ছবি আঁকেননি, বরং এটি মানবজীবনের চরম শূন্যতা প্রাণহীনতার ইঙ্গিত দেয়। প্রেম কামের স্বাভাবিক প্রবাহ যেখানে অবরুদ্ধ, সেখানেই এমন বন্ধ্যাত্ব নেমে আসে। এই বন্ধ্যাত্ব দূর করতেই প্রয়োজন ঋষ্যশৃঙ্গ তরঙ্গিণীর মিলন, যা মূলত প্রকৃতি পুরুষের, তপস্যা লালসার মিলনের মাধ্যমে জীবনের নতুন জাগরণ ঘটায়।

এই প্রাকৃতিক সংকটের পেছনে যে ধর্মীয় শাসনতান্ত্রিক সংকট রয়েছে, তা রাজপুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

"অক্ষম আজ অঙ্গরাজ, বীর্য তাঁর নিঃশেষ, শুষ্ক তাই মৃত্তিকা, রিক্ত নভোতল। পৃথিবীর যিনি পতি, তাঁর কোষে নেই বীজবিন্দু, রুদ্ধ তাই ঋতু, নেই শস্য, গোবৎস, সন্তান।" (উৎস: তপস্বী তরঙ্গিণী)

এখানে রাজপুরোহিতের এই সংলাপের মাধ্যমে বীর্যের নিঃশেষিত হওয়া এবং বীজবিন্দুর অভাবকে অনাবৃষ্টির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি এক গভীর সত্যকে প্রকাশ করে যে, সৃষ্টির আদি চালিকাশক্তি হলো কাম জীবনরস। জীবনরস শুকিয়ে গেলে সমাজ তথা প্রকৃতি বন্ধ্যা হতে বাধ্য। পৌরাণিক এই তত্ত্বটিকে নাট্যকার আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন।

চরিত্র সৃষ্টি মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব

'তপস্বী তরঙ্গিণী' নাটকের মূল শক্তি নিহিত রয়েছে এর চরিত্র সৃষ্টি এবং তাদের অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে। ঋষ্যশৃঙ্গ তরঙ্গিণীএই দুটি চরিত্রই পরস্পরবিরোধী মেরুতে বাস করে। একজন পরম তপস্বী, অন্যজন পরম কামুকী। কিন্তু নাটকের প্রবাহে এই দুটি মেরু এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয় এবং তাদের দুজনের মধ্যেই এক গভীর রূপান্তর ঘটে।

ঋষ্যশৃঙ্গ আজন্ম অরণ্যবাসী, প্রকৃতির কোলে পালিত এক সরল কিশোর। নারী বা মানবসমাজ সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। তার কাছে প্রকৃতিই ছিল একমাত্র ঈশ্বর আত্মীয়:

"সূর্যদেব, প্রণাম। বায়ু, তুমি আমার বন্ধু। বৃক্ষ, বিহঙ্গ, বনলতা, আমি তোমাদের প্রণয়ী। তোমাদের সঙ্গে, তোমাদের আশ্রয়ে বেঁচে আছিআমি ধন্য।" (উৎস: তপস্বী তরঙ্গিণী)

ঋষ্যশৃঙ্গের এই স্বগতোক্তি প্রমাণ করে তার হৃদয়ের আদিম অকৃত্রিম সারল্য। সে নিজেকে বিশ্বপ্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে। কিন্তু এই পবিত্র সারল্যের অন্তরালে মানুষের অবদমিত আকাঙ্ক্ষাও সুপ্ত ছিল। তরঙ্গিণীর রূপ ছোঁয়ায় তার সেই অবদমিত কামনা জাগ্রত হয়। তবে এই জাগরণ তার পতন নয়, बल्कि তার পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে ওঠার প্রথম ধাপ।

অন্যদিকে, তরঙ্গিণী কেবল এক বারাঙ্গনা নয়, সে এক অনন্য শিল্পী। সে রূপ যৌবনের রহস্যে দীক্ষিত। রাজকার্যের প্রয়োজনে সে ঋষ্যশৃঙ্গের তপস্যা ভঙ্গ করতে বনে যায় বটে, কিন্তু ঋষ্যশৃঙ্গের নিষ্পাপ সান্নিধ্যে এসে তার নিজের ভেতরকার আত্মিক সত্তাটি জাগ্রত হয়। সে বুঝতে পারে যে, তার পেশাগত জীবন আসলে এক মস্ত ফাঁকি। সে ঋষ্যশৃঙ্গকে বলে:

"তপোধন, আমি তত্ত্বকথা জানি না, আমি প্রেরণার বশবর্তী। ত্যাগই আমার ভোগআমার সার্থকতা।" (উৎস: তপস্বী তরঙ্গিণী)

এই সংলাপটির মাধ্যমে তরঙ্গিণীর চরিত্রের গভীর আধ্যাত্মিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যে নিজেকে চিরকাল বোগবিলাসের পণ্য মনে করত, সে ত্যাগের অতল মহিমাকে আবিষ্কার করে। তার এই ত্যাগ কোনো শাস্ত্রীয় বাধ্যবাধকতা নয়, বরং হৃদয়ের এক গভীর জাগরণ। সে ঋষ্যশৃঙ্গকে জয় করতে গিয়ে নিজেই তাঁর প্রেমের কাছে পরাজিত সমর্পিত হয়।

কাব্যাত্মক সংলাপ

কাব্যনাটকের প্রধান সম্পদ হলো তার সংলাপ। বুদ্ধদেব বসু এই নাটকে এমন এক কাব্যাত্মক সংলাপের সৃষ্টি করেছেন যা একাধারে তীক্ষ্ণ, নাট্যোপযোগী এবং অসম্ভব গীতিময়। সংলাপগুলোর ভেতর দিয়ে চরিত্রের অবচেতন মনের জটিলতাগুলো কবিতার মতো ফুটে উঠেছে। ঋষ্যশৃঙ্গ যখন তরঙ্গিণীর স্পর্শে প্রথম কামের স্বাদ পায়, তখন তার সংলাপ হয়ে ওঠে কাম মুক্তির এক অপূর্ব যৌথ প্রকাশ:

"ঋষ্যশৃঙ্গ: আমি জেনেছি আমি কে। আমি পুরুষ।

তরঙ্গিণী: তুমি আমার প্রিয়। তুমি আমার বন্ধু। তুমি আমার মৃগয়া। তুমি আমার ঈশ্বর।" (উৎস: তপস্বী তরঙ্গিণী)

এই সংক্ষিপ্ত অথচ তীব্র সংলাপের মধ্য দিয়ে তপস্বী ঋষ্যশৃঙ্গের পৌরুষের জাগরণ ঘটেছে। এতদিন সে ছিল কেবল এক নামহীন সত্তা, এখন সে নিজের স্বরূপ জানতে পেরেছে। আর তরঙ্গিণীর কাছে সে একই সঙ্গে প্রেমিক, শিকার এবং আরাধ্য দেবতা। এই দ্বান্দ্বিক অনুভূতিই সংলাপটিকে সাধারণ নাটক থেকে উচ্চে তুলে এক অসাধারণ কাব্যের মর্যাদায় উন্নীত করে।

ছন্দ অলঙ্কার

নাট্যকার বুদ্ধদেব বসু এই কাব্যনাটকটিতে ছন্দের অসাধারণ ব্যবহার করেছেন। নাটকের বিভিন্ন অংশে বিশেষ করে গানগুলোতে তিনি গীতিময় সুর লয়ের যে মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন, তা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তরঙ্গিণী তার সখীরা যখন ঋষ্যশৃঙ্গের কুটিরের বাইরে গান গেয়ে তাঁর ধ্যানভঙ্গের উপক্রম করে, সেই গানটি ছিল সৃষ্টির আদিম কামনারই এক আবাহন:

"জাগো, সৃষ্টির আদি শিহরন,

জাগো, বিক্ষুব্ধ নাড়ীস্পন্দ!

করো ব্রহ্মার মতি চঞ্চল,

 আনো দুর্বার মায়াবন্ধ।" (উৎস: তপস্বী তরঙ্গিণী)

এই গানটি নাটকের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এটি কেবল ঋষ্যশৃঙ্গের ধ্যান ভাঙার গান নয়, এটি জড়তার বিরুদ্ধে প্রাণের, শীতলতার বিরুদ্ধে উষ্ণতার এক পরম আহ্বান। ছন্দোবদ্ধ এই চরণগুলো নাটকের নাট্যগুণকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং দর্শকের মনে এক অপূর্ব রোমাঞ্চের সৃষ্টি করে।

 নাট্যগুণ কাব্যগুণের মেলবন্ধন

একটি সফল কাব্যনাটকের বড় পরীক্ষা হলো তার নাট্যগুণ কাব্যগুণের ভারসাম্য বজায় রাখা। 'তপস্বী তরঙ্গিণী' এই পরীক্ষায় পূর্ণ নম্বরে উত্তীর্ণ। নাটকের শেষ অঙ্কে যখন ঋষ্যশৃঙ্গ চম্পানগরের রাজপ্রাসাদে রাজজামাতা হিসেবে অবস্থান করছে, তখন তার অন্তরে চলছে এক চরম শূন্যতাবোধ। রাজকীয় ভোগবিলাস তাকে তৃপ্তি দিতে পারে না। সে পুনরায় সেই অরণ্যের আদিম ঊষা তরঙ্গিণীর প্রথম স্পর্শের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে:

"সেই আবির্ভাবসেই ঊষাসেই উন্মোচন তার বাহুর হিল্লোল, আর্দ্র উজ্জ্বল দৃষ্টিপাত! সূর্যের হৃদয়স্রাবী তমিস্রা তার স্পর্শে, আমার রক্তে আগুন, রোমকূপে বিদ্যুৎ, শ্রবণে উতরোল সমুদ্র।" (উৎস: তপস্বী তরঙ্গিণী)

ঋষ্যশৃঙ্গের এই স্বগতোক্তিটি বাংলা কাব্যনাটকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক আধ্যাত্মিক কবিতা হিসেবে গণ্য হতে পারে। এখানে ভাষা, ভাব অলঙ্কারের এমন এক চরম শিখর স্পর্শ করা হয়েছে, যা দর্শকের হৃদয়ে এক অপার্থিব বেদনার জন্ম দেয়। এটি নাটকের অন্তিম ট্র্যাজেডি শূন্যতাকে আরও তীব্রভাবে ফুটিয়ে তোলে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, কাব্যনাটক হিসেবে 'তপস্বী তরঙ্গিণী' সার্থকতা এখানেই যে, তা কেবল এক পৌরাণিক কাহিনীর পুনর্লিখন নয়, বরং মানুষের চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক সত্যের এক অপূর্ব রূপায়ণ। বুদ্ধদেব বসু প্রমাণ করেছেন যে, মানুষের ভেতরের কাম প্রেম, ভোগ ত্যাগ আসলে আলাদা কোনো সত্তা নয়, তারা একে অপরের পরিপূরক। তপস্যার স্বার্থকতা যেমন কামনার স্পর্শ ছাড়া অপূর্ণ, তেমনই কামনার চরম সার্থকতাও ত্যাগের অতল গভীরে নিমজ্জিত। কাব্যাত্মক সংলাপ, নিখুঁত চরিত্র সৃষ্টি, ছন্দের সাবলীল দোলা এবং নাট্যগুণের অনন্য সমন্বয়ে 'তপস্বী তরঙ্গিণী' নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক সার্থক কালজয়ী কাব্যনাটক।

S M A Hanif
BA (Hon's), MA
Bengali Language and Literature

বই: তপস্বী ও তরঙ্গিনী


No comments

"আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখে জানান। আপনার যেকোনো পরামর্শ সাদরে গৃহীত।"

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.