ads

আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘জেগে আছি’ গল্পগ্রন্থের বিষয়ভাবনার পরিচয় ও বৈচিত্র্য

আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘জেগে আছি’ গল্পগ্রন্থের বিষয়ভাবনার পরিচয় ও বৈচিত্র্য

    আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯) বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান প্রগতিশীল প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও মননশীল গবেষক। গ্রামীণ জীবনের ধূলিমলিন ক্যানভাস থেকে শুরু করে মহানগরের কৃত্রিম অলিগলি—সবখানেই তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও শৈল্পিক কলম চিরকাল মেহনতি মানুষের জয়গান গেয়েছে। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় সফল বিচরণকারী এই কথাশিল্পী আজীবন শোষিত ও শোষকের মধ্যকার শ্রেণি-দ্বন্দ্বে শোষিত মানুষের সপক্ষে এক অপরাজেয় শক্তির প্রতীক হিসেবে নিজেকে ধরে রেখেছেন। মাত্র সতেরো-আঠারো বছর বয়সের তরুণ ছাত্রাবস্থায় রচিত তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘জেগে আছি’ (১৯৫০) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। দেশভাগের পূর্বাপর সময়ে পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ ও নাগরিক পটভূমিতে শোষিত নিম্নবর্গের মানুষের মনস্তত্ত্ব, রাজনৈতিক দীক্ষা এবং অধিকার আদায়ের লড়াইকে তিনি যেভাবে শৈল্পিক রূপ দিয়েছেন, তা চিরকালীন প্রাসঙ্গিকতায় ভাস্বর।

বিষয়ভাবনার রাজনৈতিক অভিমুখ ও সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতা:

    আলাউদ্দিন আল আজাদের গল্পে বিষয়ভাবনার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক চেতনা ও শ্রেণি-সংগ্রামের নিবিড় রূপায়ণ। তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক প্রভাবে দীক্ষিত লেখক প্রথাগত ভাববাদ বা নিয়তিবাদের বাইরে গিয়ে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের আলোকে সমাজের শ্রেণিবিন্যাসকে উন্মোচন করেছেন। এই সমাজভাবনার প্রথম পরিচয় মেলে শোষক ও শোষিত শ্রেণির চিরন্তন দ্বন্দ্বে। জোতদার ও বুর্জোয়া শ্রেণি সাধারণ মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমকে কীভাবে আত্মসাৎ করে নিজেদের পুঁজির পাহাড় গড়ে তোলে, আজাদের গল্পে তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে চিত্রিত হয়েছে।

গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থার অবক্ষয় ও চরম আর্থিক টানাপোড়েন উঠে এসেছে ‘সৃষ্টি’ গল্পে। সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে শিক্ষার প্রসারে বড় বড় পরিকল্পনা থাকলেও মফস্বলের প্রাথমিক শিক্ষকের বেতন যে মাসের পর মাস বন্ধ থাকে, তা রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার এক নির্মম প্রহসন। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মাহমুদ পণ্ডিতের যন্ত্রণাদগ্ধ জীবনকে লেখক দেখিয়েছেন অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে:

“নয় মাস ধরে বেতন না পেয়ে সে তারপরেও সে পড়াচ্ছে গ্রামের ছেলেদের। কিন্তু সেই সঙ্গে তার মেজাজও কিন্তু তিরক্ষী হয়ে উঠেছে।” (গল্প: সৃষ্টি)

এই উক্তিটি কেবল একজন শিক্ষকের মেজাজের কথাই প্রকাশ করে না, বরং দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা ও অবহেলা কীভাবে একজন আদর্শবাদী মানুষের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলে, তা নিরূপণ করে। লেখক দেখিয়েছেন যে, পুঁজিপতি কাসেম আলীরা চায় না গরিবের সন্তানরা পড়াশোনা করে সচেতন হোক, বরং তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে শিশুদের কারখানায় সস্তা শ্রমে নিয়োগ করতে উদ্যত হয়। পণ্ডিতের এই তিরক্ষী মেজাজ আসলে সেই পুঁজিবাদী শোষণ ও সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁর পুঞ্জীভূত বিক্ষোভের মানসিক স্ফুলিঙ্গ।

রাষ্ট্রযন্ত্র ও শোষকের চক্রান্তের স্বরূপ:

    আজাদের সমাজ ভাবনায় শোষক শ্রেণি কখনই একা অত্যাচার চালায় না, বরং তারা সর্বদাই রাষ্ট্রযন্ত্রের লাঠিয়াল বাহিনী ও পুলিশকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করে। ‘মুখোমুখি’ গল্পে এই নির্মম সামাজিক চিত্রটি অত্যন্ত স্পষ্ট। কৃষকেরা যখন নিজেদের ঘাম ঝরানো ধানের ন্যায্য হিস্যা দাবি করে, তখন জোতদারেরা তাদের দমন করতে মোটা টাকা খরচ করে পুলিশের সাহায্য নেয়। শোষকের সেই ষড়যন্ত্র ও অমানবিক মানসিকতার চিত্র ফুটে উঠেছে এই সংলাপে:

“মোটাশোটা লোকটার হাতে হারিকেন সলতে কমানো। নোটের তারাটি দিয়ে ছোট সাহেব বলেন, আরো চাইলে আরো অবস্থাটা দারগার কাছে বুঝাইয়া কইও রাতের জন্যই ভয় বেশি। আরে হ্যাঁ কইও রাইফেল ওয়ালা পুলিশ আনে যেন।” (গল্প: মুখোমুখি)

এখানে ছোট সাহেবের এই হিসাব কষার ভঙ্গির মধ্য দিয়ে লেখক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন যে, পুঁজিপতি ও ভূস্বামীরা সাধারণ মজুরদের ন্যায্য পাওনা দিতে কার্পণ্য করলেও তাদের কণ্ঠরোধ করতে এবং নিজেদের ক্ষমতাকে রক্ষা করতে পুলিশ ও রাইফেল কিনতে একটুও দ্বিধাবোধ করে না। এই অশুভ আঁতাত মেহনতি মানুষের জীবনকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে, যা আজাদের রাজনৈতিক চেতনার এক গভীর পর্যবেক্ষণ।

দেশভাগের ট্র্যাজেডি ও অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ:

    দেশভাগের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে যে গভীর ট্র্যাজেডি নেমে এসেছিল, আজাদের বিষয়ভাবনায় তার এক অসাধারণ মানবতাবাদী রূপায়ণ ঘটেছে ‘শিকড়’ ও ‘ছুরি’ গল্পে। দেশবিভাগ সাধারণ গ্রামীণ মানুষের মনে কী ধরনের সীমাহীন বিভ্রান্তি তৈরি করেছে, তা তিনি খুব গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী, বন্ধু যখন ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যাওয়া সীমানার কারণে দেশত্যাগে বাধ্য হয়, তখন সাধারণ মানুষ তার কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পায় না। ‘শিকড়’ গল্পে হাফিজ ও কানাইয়ের সম্পর্কের সূত্রে সাধারণ মানুষের সেই অস্ফুট আকুলতা এভাবেই বর্ণিত হয়েছে:

“চইলা যাইবো কেন তারা— কেন যাবে সেটি তারা বুঝতে পারে না।” (গল্প: শিকড়)

এই হাহাকার কেবল এক বন্ধুর জন্য অন্য বন্ধুর নয়, বরং হাজার বছর ধরে একই মাটিতে বাস করা মানুষের শিকড় ছিঁড়ে ফেলার রাজনৈতিক চক্রান্তের বিরুদ্ধে এক গভীর প্রশ্ন। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের আড়ালে যে মূলত পুঁজিপতি ও সুবিধাবাদী বড় মিয়ারা অন্যের সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে বা গায়ের জোরে দখল করার হীন চক্রান্তে মেতে ওঠে, হাফিজ একসময় তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে। সাধারণ নিম্নবর্গের মানুষের কাছে ধর্মের কোনো ভিন্নতা নেই, তাদের প্রধান পরিচয় একটাই—তারা সবাই দরিদ্র ও শোষিত। সেই শাশ্বত সত্যটি হাফিজের গভীর উপলব্ধিতে প্রকাশ পেয়েছে:

“আরে হিন্দু কও আর মুসলমানই কও গরিবের সবখানে একই হাল। ওরা যাইতেছে কোলকাতা আর আমরা আসাম। দুয়ের মধ্যে ফারাকটা কি শুনি? কিছুই নাই।” (গল্প: শিকড়)

আজাদের সমাজ ভাবনায় মানুষের এই শ্রেণিগত ঐক্যই আসল সত্য। তিনি দেখিয়েছেন যে, হিন্দু হোক বা মুসলিম—শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট সর্বত্র সমান এবং এই সত্যকে অনুধাবন করতে পারাই হলো শোষিত মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের পথে প্রথম পদক্ষেপ।

রাজনৈতিক সংকল্প ও আদর্শিক আত্মত্যাগ:

    আজাদের গল্পে সমাজ রূপান্তরের আন্দোলন কেবল তত্ত্বে আটকে না থেকে মানুষের জীবন উৎসর্গ করার মতো বাস্তব প্রতিশ্রুতিতে রূপ নেয়। ‘ফেরার’ গল্পে কিশোর বিপ্লবী হারুনের মৃত্যু যেন সেই আদর্শিক সংকল্পেরই রক্তিম প্রতীক। নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হারুনকে রাষ্ট্রযন্ত্র ও পুলিশ সর্বদাই ফেরারী আসামি বা অপরাধী হিসেবে গণ্য করে। কিন্তু এই নিপীড়ক শক্তির চোখে একজন মানুষের মৃত্যুর চেয়ে তাদের দাপ্তরিক কাগজের বাধ্যবাধকতাই প্রধান হয়ে ওঠে। হারুনের মৃত্যুর পর পুলিশের ইনস্পেক্টরের বিরক্তি ও অমানবিক মন্তব্য ছিল অত্যন্ত শ্লেষাত্মক:

“তবুতো ছাই রিপোর্ট লিখতে হবে ফেরার হওয়ার নতুন কায়দা দেখছি যত্তোসব ফেরার।” (গল্প: ফেরার)

পুলিশের কাছে একজন তরুণের বৈপ্লবিক স্বপ্ন ও অকাল মৃত্যুর মূল্য কেবল একটি রিপোর্ট লেখার বাড়তি ঝামেলা বৈ কিছু নয়। কিন্তু লেখক দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় শক্তির এই তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বিপরীতে হারুনের এই আত্মত্যাগ বৃথা যায় না। তার শেষ উক্তি—“স্ট্রাইক শেষ নয় এ হলো সবে মাত্র লড়াইয়ের শুরু”—প্রান্তিক মেথর, মুচি, ঝাড়ুদার ও রিকশাচালকদের মনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক দীর্ঘস্থায়ী অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে দিয়ে যায়।

প্রান্তিক মানুষের অধিকার সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রতিবাদ:

    আলাউদ্দিন আল আজাদের বিষয়ভাবনার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁর চরিত্ররা নিপীড়নের সামনে কখনো অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করে না। তারা ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে হলেও সমষ্টির মঙ্গল কামনা করে। ‘সুন্দরী, সুন্দরী’ গল্পে সুন্দরী নামক বৃদ্ধা নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে গ্রামকে পুলিশের চরম নিপীড়ন ও অত্যাচার থেকে বাঁচাতে নিজেই একটি মিথ্যা অপরাধ নিজের কাঁধে তুলে নেয়। দারোগার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁর বলিষ্ঠ শিকারোক্তি:

“আগুন আমি লাগাইছিলাম।” (গল্প: সুন্দরী, সুন্দরী)

সুন্দরীর এই একক আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে লেখক নিম্নবর্গের মানুষের সেই অসীম সাহসিকতা ও রণকৌশলকে প্রকাশ করেছেন, যা সমষ্টির স্বার্থে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিতেও প্রস্তুত।

একইভাবে, ‘একটি কথার জন্ম’ গল্পে রেলস্টেশনের সাধারণ চা-বিক্রেতা কালু মিয়ার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে যে রুখে দাঁড়ানোর চিত্র লেখক এঁকেছেন, তা প্রমাণ করে যে শোষিতের লড়াই কোনো নির্দিষ্ট সীমায় আটকে রাখা সম্ভব নয়। কালু মিয়ার অকুতোভয় ঘোষণা:

“ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েই মনে করো না আপদ চুকে গেল। যেখান থেকেই তাড়াও না কেন জেনে রাখো জেনে রাখো জায়গা আমাদের ফুরাবে না।” (গল্প: একটি কথার জন্ম)

কালু মিয়ার এই বলিষ্ঠ উক্তির মধ্য দিয়ে লেখক শোষিত মেহনতি মানুষের অপরাজেয় সত্তাকে চিহ্নিত করেছেন। পুঁজি ও ক্ষমতার জোর দিয়ে সাময়িকভাবে গরিবকে উৎখাত করা গেলেও তাদের অধিকার সচেতনতার কণ্ঠস্বরকে কখনো নিশ্চিহ্ন করা যায় না, এটাই আজাদের সমাজ ভাবনার মূল বাণী।

        সামগ্রিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘জেগে আছি’ গল্পগ্রন্থের বিষয়ভাবনা ও তার বৈচিত্র্য বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে এক প্রগতিশীল বিপ্লবের সূচনা করেছিল। তিনি কেবল মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের সামাজিক বঞ্চনার চিত্রই আঁকেননি, বরং শোষণের প্রতিটি স্তরকে মার্কসবাদী দর্শনের আলোয় ব্যবচ্ছেদ করেছেন। দেশভাগের ট্র্যাজেডি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে অখণ্ড মানবতাবোধ, আদর্শবাদী শিক্ষকের নৈতিক লড়াই এবং প্রান্তিক কিশোরদের বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুই অত্যন্ত সুনিপুণভাবে এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। আজাদের গল্পে প্রকৃতি ও মানুষের মনস্তত্ত্ব একই সুরে বাঁধা, যা আসন্ন পরিবর্তনের সামাজিক ইঙ্গিত বহন করে। সতেরো বছর বয়সের এক তরুণের কলমে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সমাজ ও রাজনীতির যে গভীর বিশ্লেষণ উঠে এসেছে, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ‘জেগে আছি’ গল্পগ্রন্থটি তাই কেবল বাংলা সাহিত্যের একটি অবিস্মরণীয় দলিল নয়, বরং এটি শোষিত মানুষের আত্মমর্যাদা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে চিরকাল এক অবিনাশী আলোকবর্তিকা হিসেবে পথ দেখাবে।

S M A Hanif
BA (Hon's), MA
Bengali Language and Literature

মূল বইয়ের লিংক: জেগে আছি-আলাউদ্দিন আল আজাদ

No comments

"আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখে জানান। আপনার যেকোনো পরামর্শ সাদরে গৃহীত।"

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.