অর্থের স্রোতে শব্দ: কেন এবং কীভাবে বদলায় শব্দের মানে ।। Shifting Semantics: The Why and How of Word Evolution
অর্থের স্রোতে শব্দ: কেন এবং কীভাবে বদলায় শব্দের মানে
ভাষাতত্ত্বে শব্দার্থ পরিবর্তন (semantic change) একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সময়ের সাথে সাথে সমাজের পরিবর্তন, সংস্কৃতির বিকাশ এবং মানুষের মানসিকতার বিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শব্দের অর্থেরও পরিবর্তন ঘটে। পৃথিবীর কোনো ভাষাতেই শব্দের অর্থ চিরকাল অপরিবর্তিত থাকে না। জীবন্ত ভাষার ধর্মই হলো ধ্বনিগত ও অর্থগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলা। ভাষাবিজ্ঞানীরা শব্দের অর্থের পরিবর্তনের কারণগুলিকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেছেন। নিচে সেই কারণগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত কারণ (Geographical and Climatic Factors)
ভৌগোলিক
পরিবেশ এবং
জলবায়ুর পার্থক্যের
কারণে শব্দের
অর্থ পরিবর্তিত
হতে পারে।
একই শব্দ
ভিন্ন ভিন্ন
অঞ্চলে ভিন্ন
অর্থ বহন
করে। যেমন,
বাংলাদেশের স্নিগ্ধ
ও কোমল
জলবায়ুতে 'অভিমান' শব্দটির
অর্থ হলো
'স্নেহমিশ্রিত অনুযোগ'
বা 'ভালোবাসার দাবি
থেকে আসা
ক্ষোভ'।
কিন্তু পশ্চিম
ভারতের শুষ্ক
ও কঠিন
পরিবেশে এই
একই শব্দের
অর্থ 'অহংকার' বা 'গর্ব'।
এখানে জলবায়ু
ও সংস্কৃতির
পার্থক্য শব্দের
অর্থের মধ্যে
এই ভিন্নতা
এনেছে।
ঐতিহাসিক কারণ (Historical Factors)
ঐতিহাসিক
বিবর্তনের ফলে
শব্দের অর্থ
পরিবর্তন হয়।
প্রাচীন আর্যরা
ছিল যাযাবর
জাতি। তখন
'আর্য' শব্দের
অর্থ ছিল
'গমনশীল'।
কিন্তু যখন
তারা ভারতবর্ষে
প্রবেশ করে
এবং কৃষিনির্ভর
জীবন গ্রহণ
করে, তখন তারা
আর যাযাবর
থাকে না।
তা সত্ত্বেও
তাদের 'আর্য' নামটি
রয়ে যায়।
বর্তমানে 'আর্য' বলতে বোঝায়
ইন্দো-ইউরোপীয়
বংশের নরগোষ্ঠী।
উপাদানগত বা উপকরণগত কারণ (Material or Instrumental Factors)
কোনো
বস্তুর উপাদান
বা উপকরণ
পরিবর্তিত হলেও
অনেক সময়
তার পুরাতন
নামটি অপরিবর্তিত
থেকে যায়,
যা শব্দার্থের
পরিবর্তন ঘটায়।
প্রাচীনকালে পেপিরাস
গাছের মজ্জা
দিয়ে এক
ধরনের কাগজ
তৈরি হতো।
এই পেপিরাস
থেকেই ইংরেজি
'Paper' শব্দটির উৎপত্তি।
বর্তমানে কাগজ
বিভিন্ন ধরনের
উপাদান থেকে
তৈরি হলেও,
আমরা সেগুলোকে
'পেপার' নামেই
ডাকি। তাই পেপার বলতে শুধু আর পেপিরাস গাছের উপাদান নয়, এখন লেখার
উপাদানকে বোঝায়।
সাদৃশ্যজনিত কারণ (Analogical Factors)
অনেক সময় একটি শব্দের সঙ্গে অন্য একটি শব্দের অর্থগত বা ধ্বনিগত সাদৃশ্যের কারণে অর্থ পরিবর্তিত হয়। বৈদিক ভাষায় 'রোদসী' শব্দের অর্থ ছিল স্বর্গ ও পৃথিবী। অন্যদিকে, 'ক্রন্দসী' শব্দের অর্থ ছিল গর্জনকারী প্রতিদ্বন্দ্বী সৈন্যদল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'ঊর্বশী' কবিতায় 'রোদসী'-র সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে 'ক্রন্দসী' শব্দটিকে 'অন্তরীক্ষ' অর্থে ব্যবহার করেছেন। এখানে সাদৃশজনিত কারণে মূলত poetic license এর প্রয়োগ ঘটেছে।
মানসিক সংস্কার ও কুসংস্কার (Psychological and Superstitious
Factors)
মানুষের
মানসিক সংস্কার,
কুসংস্কার বা
অন্ধবিশ্বাসের কারণেও
শব্দের অর্থ
পরিবর্তিত হয়।
গ্রামীণ সমাজে
মানুষ অশুভ
বা বিপদজনক
কোনো কিছুর
নাম সরাসরি
উচ্চারণ করতে
ভয় পায়।
তাই তারা
সাপকে সরাসরি
'সাপ' না
বলে 'লতা' বা
'পোকা' বলে।
similarly, চালের অভাবকে
'চাল বাড়ন্ত' বলা
হয়। যখন
কারো মৃত্যু
হয়, তখন বলা
হয় 'তিনি স্বর্গলোক করেছেন'। এসব ক্ষেত্রে
মানুষ বিপদ
এড়ানোর জন্য
শব্দের রূপান্তর
ঘটায়।
শৈথিল্য ও আরামপ্রিয়তা (Linguistic Laziness and
Convenience)
মানুষের
অলসতা বা
আরামপ্রিয়তার কারণে
অনেক সময়
দীর্ঘ বাক্য
বা শব্দগুচ্ছ
সংক্ষেপ করা
হয়, যা নতুন
অর্থের সৃষ্টি
করে। উদাহরণস্বরূপ,
'চা ও
জলখাবার' না বলে
সংক্ষেপে 'চা-টা' বলা
হয়। সন্ধ্যায়
প্রদীপ জ্বালানোকে
'সন্ধ্যে দেওয়া' বলা
হয়। এই
শৈথিল্যের কারণে
মূল শব্দ
বা বাক্যটির
অর্থ পরিবর্তিত
হয়ে একটি
নতুন এবং
সংক্ষিপ্ত রূপ
নেয়।
আলংকারিক প্রয়োগ (Metaphorical Usage)
আলংকারিক প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো বস্তুর নামকরণ করা হয়। সময়ের সাথে সাথে এই আলংকারিক রূপটি গৌণ হয়ে যায় এবং শব্দটি একটি সাধারণ বিশেষ্য হিসেবে প্রচলিত হয়। যেমন, চোখের তারার মতো দেখতে একটি ফুলের নাম 'নয়নতারা'। লাউয়ের ডগার মতো দেখতে একটি সাপের নাম 'লাউডগা'। যে রঙিন পাখি মাছ শিকার করে তার নাম 'মাছরাঙা'। এখানে আলংকারিক উপমা ব্যবহারের ফলে শব্দগুলো সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা শব্দার্থের পরিবর্তনের অন্যতম কারণ।
এই
সব কারণ
ছাড়াও, শিক্ষাগত প্রভাব,
ভাষার সংস্পর্শে
আসা, এবং সাহিত্যিক
প্রয়োগের মতো
আরও কিছু
বিষয় শব্দার্থ
পরিবর্তনের পেছনে
কাজ করে।
এই প্রক্রিয়া
ভাষার গতিশীলতাকে
বজায় রাখে
এবং একে
আরও সমৃদ্ধ
করে তোলে।
No comments