' যোগাযোগ '
উপন্যাসের নামকরণের
সার্থকতা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের(১৮৬১-১৯৪১) ' যোগাযোগ ' (১৯২৯) উপন্যাসটি কেবল
বাংলা
সাহিত্যের একটি
শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিই নয় ,
বরং
এটি
নামকরণের দিক
থেকেও
এক
অনন্য
সার্থকতার দাবি
রাখে।
উপন্যাসের মূল
ভাববস্তু , চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং
সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে
দেখা
যায়
যে ,
' যোগাযোগ ' নামটি
এর
প্রতিটি স্তরে
ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে
আছে।
শুরুতে
এই
উপন্যাসটির নাম
ছিল
' তিন পুরুষ ' , কিন্তু রবীন্দ্রনাথ পরে
তা
পরিবর্তন করে
' যোগাযোগ ' রাখেন ,
যা
উপন্যাসটিকে এক
গভীর
ব্যঞ্জনময়তা দান
করেছে।
উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ' বিচিত্রা ' পত্রিকায় যখন
এই
উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে
শুরু
করে ,
তখন
প্রথম
দুই
সংখ্যায় এর
নাম
ছিল
' তিন পুরুষ ' ।
রবীন্দ্রনাথ নিজেই
এই
নাম
পরিবর্তনের একটি
কৈফিয়ত
দিয়েছিলেন। তাঁর
মতে ,
' তিন
পুরুষ '
নামটি
ছিল
একটি
খেয়াল
মাত্র ,
যা
গল্পের
সত্যের
দলিল
হিসেবে
যথেষ্ট
ছিল
না।
তিনি
চেয়েছিলেন এমন
একটি
নাম
যা
গল্পের
বস্তু
বা
সংজ্ঞার চেয়ে
তাঁর
রূপ
বা
ভাবকে
বেশি
প্রকাশ
করবে।
তিনি
অনুভব
করেছিলেন যে ,
উপন্যাসের কাহিনিটি যে
তিনটি
প্রজন্মের ওপর
ভিত্তি
করে
গড়ে
ওঠার
কথা
ছিল ,
তা
শেষ
পর্যন্ত আর
বজায়
থাকেনি ;
বরং
তা
কুমু
ও
মধুসূদনের দাম্পত্য সংকটের
আবর্তে
ঘূর্ণিত হয়েছে।
তাই
' যোগাযোগ ' নামটি
তাঁর
কাছে
অনেক
বেশি
' নির্বিশেষ ' এবং
গল্পের
রসের
সঙ্গে
সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে
হয়েছিল।
সহজ কথায়
' যোগাযোগ ' বলতে
কোনো
দুই
পক্ষের
মধ্যে
সম্পর্ক বা
সংযোগ
তৈরি
হওয়াকে
বোঝায়।
এটি
একটি
স্বয়ম্ভূ প্রক্রিয়া যা
একপক্ষকে উদ্যাপনকারী এবং
অন্যপক্ষকে গ্রাহক
হিসেবে
দাঁড়
করায়।
উপন্যাসে এই
যোগাযোগ কেবল
দুটি
মানুষের মধ্যে
সীমাবদ্ধ নয় ,
বরং
তা
দুই
ভিন্ন
সংস্কৃতি , দুই
ভিন্ন
বংশ
এবং
দুই
বিপরীতধর্মী আদর্শের সংঘাত
ও
সংযোগকে ফুটিয়ে
তোলে।
রবীন্দ্রনাথ এই
শব্দটিকে এক
যান্ত্রিক নিয়ম
হিসেবে
না
দেখে
একে
এক
গভীর
মনস্তাত্ত্বিক ও
আধ্যাত্মিক পর্যায়
হিসেবে
দেখেছেন।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় বিষয়
হলো
মধুসূদন ও
কুমুদিনীর দাম্পত্য জীবন।
এখানে
' যোগাযোগ ' শব্দটি
এক
ধরণের
বিদ্রূপাত্মক সার্থকতায় ফুটে
উঠেছে।
মধুসূদন তাঁর
বিপুল
ধন - সম্পদ এবং প্রতিপত্তির জোরে
নূরনগরের আভিজাত্যমণ্ডিত চাটুজ্যে পরিবারের মেয়ে
কুমুদিনীকে বিয়ে
করেন।
তাঁর
লক্ষ্য
ছিল
চাটুজ্যে বংশের
পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়া
এবং
নিজের
আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
মধুসূদন কুমুকে
তাঁর
অর্জিত
সম্পদের মতো
একটি
' ভোগের সামগ্রী ' হিসেবে জয়
করতে
চেয়েছিলেন। কিন্তু
কুমুদিনীর সূক্ষ্ম রুচিবোধ , আধ্যাত্মিক গভীরতা
এবং
উন্নত
আভিজাত্যের সঙ্গে
মধুসূদনের স্থূল
ও
বস্তুবাদী মানসিকতার কোনো
প্রকৃত
' যোগাযোগ ' বা
মানসিক
সংযোগ
ঘটেনি।
শারীরিক মিলন
ঘটলেও
তাঁদের
মনের
মিল
ছিল
যোজন
যোজন
দূরে।
এই
অতৃপ্ত
ও
অসম্পূর্ণ যোগাযোগই উপন্যাসের মূল
দ্বন্দ্বের ভিত্তি।
' যোগাযোগ ' উপন্যাসে নূরনগরের ক্ষয়িষ্ণু চাটুজ্যে বংশ
এবং
নতুন
গড়ে
ওঠা
ধনী
ঘোষাল
বংশের
মধ্যকার দীর্ঘদিনের শত্রুতা ও
রেষারেষি ফুটে
উঠেছে।
মধুসূদন তাঁর
বংশের
অপমানের প্রতিশোধ নিতে
কুমুদিনীকে একটি
মাধ্যম
হিসেবে
ব্যবহার করতে
চেয়েছিলেন। চাটুজ্যেরা আভিজাত্যে ও
রুচিতে
শ্রেষ্ঠ ছিল ,
কিন্তু
তাঁদের
ঐশ্বর্য কমে
গিয়েছিল। অন্যদিকে , মধুসূদন নিজের
চেষ্টায় সফল
এক
ব্যবসায়ী , যার
কাছে
টাকা
ও
ক্ষমতা
ছাড়া
আর
কোনো
মূল্যবোধ নেই।
এই
দুই
ভিন্ন
মেরুর
বংশের
মধ্যে
বৈবাহিক যোগাযোগ স্থাপিত হলেও
তাঁদের
মূল্যবোধের কোনো
মিলন
ঘটেনি।
এই
অসম
ও
বৈষম্যমূলক যোগাযোগই উপন্যাসের ট্র্যাজেডিকে গভীরতর
করেছে।
উপন্যাসের এক
উজ্জ্বল দিক
হলো
কুমু
ও
তাঁর
বড়দাদা
বিপ্রদাসের মধ্যকার সম্পর্ক। মধুসূদনের সঙ্গে
কুমুর
যেখানে
কোনো
মানসিক
যোগাযোগ ছিল
না ,
সেখানে
বিপ্রদাসের সঙ্গে
কুমুর
ছিল
এক
গভীর
ও
নিবিড়
আত্মিক
টান।
বিপ্রদাস কুমুর
শিক্ষক ,
বন্ধু
ও
আশ্রয়স্থল। বিপ্রদাসের কাছে
শেখা
সংগীত ,
সাহিত্য এবং
তাঁর
উন্নত
রুচি
কুমুর
অন্তরে
এমনভাবে সঞ্চারিত হয়েছিল
যে ,
তা
তাকে
মধুসূদনের জগৎ
থেকে
আলাদা
করে
রাখে।
দাম্পত্য জীবনের
চরম
সংকটে
কুমু
যখনই
ভেঙে
পড়েছেন ,
বিপ্রদাসের আদর্শ
ও
স্মৃতিই তাঁকে
আধ্যাত্মিক বল
জুগিয়েছে। এই
ভাই - বোনের সার্থক ' যোগাযোগ ' মধুসূদনের দাম্পত্য জীবনের
ব্যর্থতাকে আরও
বেশি
প্রকট
করে
তোলে।
কুমুদিনী চরিত্রটি অত্যন্ত ঈশ্বরমুখী ও
আধ্যাত্মিক। মধুসূদনের প্রভুত্বকামী আচরণ
থেকে
মুক্তি
পেতে
তিনি
তাঁর
গভীর
ঈশ্বরভক্তিকে আশ্রয়
হিসেবে
ব্যবহার করেছেন। স্বামীর সঙ্গে
মানসিক
যোগাযোগ স্থাপনে ব্যর্থ
হয়ে
তিনি
মীরার
ভজন
এবং
শিবের
আরাধনার মধ্য
দিয়ে
এক
অলৌকিক
বা
পরম
সত্তার
সঙ্গে
' যোগাযোগ ' স্থাপনের চেষ্টা
করেছেন। তাঁর
এই
আধ্যাত্মিক সংযোগ
তাঁকে
জাগতিক
অসম্মোন ও
অপমানের ঊর্ধ্বে থাকতে
সাহায্য করেছে।
এই
আধ্যাত্মিক যোগই
তাঁর
ব্যক্তিত্বের ব্যাপ্তীকে এক
অসাধারণ রূপ
দান
করেছে।
উপন্যাসের পরিণতির দিকে
তাকালে
নামকরণের সার্থকতা আরও
স্পষ্ট
হয়।
কুমুদিনী যখন
মধুসূদনের ঘর
ত্যাগ
করে
দাদার
কাছে
চলে
আসেন ,
তখন
মনে
হয়েছিল
এই
দাম্পত্য সম্পর্কের চিরতরে
অবসান
ঘটবে।
কিন্তু
শেষ
পর্যন্ত সন্তানের সম্ভাবনা তাঁদের
সম্পর্কের মধ্যে
এক
নতুন
ও
অমোঘ
' যোগাযোগ ' তৈরি
করে।
এই
অনাগত
সন্তানই কুমুকে
পুনরায়
মধুসূদনের সংসারে
ফিরে
যেতে
বাধ্য
করে।
এটি
কেবল
একটি
বৈষয়িক
বা
সামাজিক যোগাযোগ নয় ,
বরং
এটি
প্রকৃতির এক
অমোঘ
নিয়ম
যা
মানুষকে বন্ধনের দিকে
ঠেলে
দেয়।
কুমু
যাওয়ার
আগে
জানিয়েছিলেন যে ,
এমন
কিছু
মর্যাদা আছে
যা
সন্তানের জন্যেও
বিসর্জন দেওয়া
যায়
না ,
যা
থেকে
বোঝা
যায়
যে
তাঁর
এই
ফিরে
যাওয়া
আত্মসমর্পণ নয়
বরং
এটি
এক
বৃহত্তর জীবনবোধের সঙ্গে
যোগাযোগ স্থাপন।
রবীন্দ্রনাথ এই
উপন্যাসে মানুষের মনের
বিচিত্র অলিগলি
এবং
সম্পর্কের জটিল
সমীকরণগুলোকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে
তুলেছেন। ' যোগাযোগ ' নামটি এখানে কেবল
বাহ্যিক ঘটনার
সংযোগ
নয় ,
বরং
মানুষের অন্তরের গূঢ়
রহস্যের সঙ্গে
জীবনের
বাস্তব
সত্যের
যে
ঘাত - প্রতিঘাত , তার এক সার্থক
প্রতিফলন। উপন্যাসের প্রতিটি পরিচ্ছেদ ও
চরিত্রচিত্রণের মধ্য
দিয়ে
এই
যোগাযোগের অভাব
এবং
সংযোগ
স্থাপনের ব্যর্থ
প্রচেষ্টাই মূর্ত
হয়ে
উঠেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই বলেছেন, 'নামকে যারা নামমাত্র মনে করে, আমি তাদের দলে নই'। ' সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে
বলা
যায় ,
' যোগাযোগ ' নামটি উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও
মনস্তত্ত্বের সঙ্গে
অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। এখানে
যোগাযোগ কখনো
ধনিক
ও
অভিজাত
শ্রেণীর মধ্যে ,
কখনো
স্বামী
ও
স্ত্রীর মধ্যে ,
কখনো
বা
মানুষের অন্তরের স্বাধীন সত্তার
সঙ্গে
সামাজিক রীতিনীতির সংঘাতের রূপ
নিয়ে
আবির্ভূত হয়েছে।
উপন্যাসের শেষে
একটি
অনাগত
প্রাণের মাধ্যমে যে
চূড়ান্ত যোগসূত্র তৈরি
হয় ,
তা
নামকরণের সার্থকতাকে আরও
জোরালো
করে।
রবীন্দ্রনাথের এই
নামকরণ
কেবল
কাহিনীনির্ভর নয় ,
বরং
তা
গভীর
জীবনদর্শনের এক
শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। তাই ' যোগাযোগ ' নামটি
এই
কালজয়ী
উপন্যাসের জন্য
সর্বাংশে সার্থক
ও
কালজয়ী
একটি
শিরোনাম।
VIDEO
No comments