Header ads

'মন্ত্রিসভা' বনাম 'ছায়া মন্ত্রিসভা': বাংলাদেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের রোডম্যাপ । Shadow Cabinet in Bangladesh

আজ (১৭.০২.২০২৬ খ্রি.) এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শপথ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশের নতুন মন্ত্রিসভা। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি নতুন মন্ত্রীদের শপথ পাঠ করাবেন, যার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করবে নতুন সরকার। রাষ্ট্র পরিচালনার এই মাহেন্দ্রক্ষণে দেশবাসীর দৃষ্টি যখন নবগঠিত মন্ত্রিসভার দিকে, তখন পর্দার আড়ালে এক অপরিহার্য গণতান্ত্রিক প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে—শাসক দল যদি সরকার গঠন করে, তবে জনস্বার্থে সেই সরকারের প্রতিটি কাজের চুলচেরা বিশ্লেষণ করবে কে?
সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে সরকারের সাফল্যের সমান্তরালে একটি শক্তিশালী ও কাঠামোগত বিরোধী দলের উপস্থিতি অপরিহার্য। আর এই উপস্থিতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বৈশ্বিক হাতিয়ার হলো 'ছায়া মন্ত্রিসভা' (Shadow Cabinet)। আগামীকালকের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান কেবল নতুন সরকারের যাত্রা নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি 'অপেক্ষমাণ সরকার' বা ছায়া মন্ত্রিসভার প্রয়োজনীয়তাকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করব, ছায়া মন্ত্রিসভা আসলে কী এবং কেন এটি বাংলাদেশের আগামী দিনের সুশাসনের জন্য একটি মাইলফলক হতে পারে।
মন্ত্রিসভার শপথ আজ: বাংলাদেশে কি ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ হতে পারে সুশাসনের নতুন মোড়? Shadow Cabinet in Bangladesh
Image: Gemini AI
ছায়া মন্ত্রিসভা (Shadow Cabinet): গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা সুশাসনের নতুন দিগন্ত

গণতন্ত্র কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়, বরং এটি হলো চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সের (Checks and Balances) একটি সুষম ব্যবস্থা। একটি রাষ্ট্র যখন সংসদীয় পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, তখন সেখানে কেবল সরকারি দলের উপস্থিতিই যথেষ্ট নয়, বরং একটি কার্যকর এবং শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার পরিচালনা করা যেমন ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্ব, তেমনি সরকারের কাজের গঠনমূলক সমালোচনা করা এবং বিকল্প নীতিনির্ধারণ করা বিরোধী দলের পবিত্র দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে কার্যকর এবং কাঠামোগত পদ্ধতি হলো 'ছায়া মন্ত্রিসভা' (Shadow Cabinet) সংসদীয় গণতন্ত্রে 'ছায়া মন্ত্রিসভা' এমনই একটি ধারণা, যা সরকারকে প্রতিনিয়ত নজরদারিতে রাখে এবং রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে বিকল্প পথ দেখায়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একে সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার অন্যতম হাতিয়ার এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি সিস্টেমে (Westminster System) একে 'Government-in-waiting' বা 'অপেক্ষমাণ সরকার' হিসেবে অভিহিত করা হয়।

ছায়া মন্ত্রিসভা আসলে কী?

ছায়া মন্ত্রিসভা হলো সংসদীয় গণতন্ত্রের এমন একটি কাঠামো যেখানে প্রধান বিরোধী দল বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভার আদলে একটি নিজস্ব 'বিকল্প মন্ত্রিসভা' গঠন করে।

অর্থাৎ এটি বিরোধী দলের নির্বাচিত সিনিয়র/দক্ষ সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি প্যানেল বা পরিষদ, যারা সরকারের মন্ত্রীদের কর্মকান্ডের ওপর নজরদারি করে। সহজ কথায়, প্রধান বিরোধী দল যখন বর্তমান সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে তাদের নিজস্ব একজন করে সদস্যকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে একটি বিকল্প মন্ত্রিসভা গঠন করে, তখন তাকে ছায়া মন্ত্রিসভা বলা হয়।

এখানে 'ছায়া' শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। ঠিক যেমন একটি বস্তুর সাথে তার ছায়া লেগে থাকে, তেমনি সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে বিরোধী দলের একজন করে নির্দিষ্ট মুখপাত্র থাকেন। ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা তাদের নির্ধারিত মন্ত্রণালয়ের সরকারি মন্ত্রীর কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, নীতিগত ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেন এবং পার্লামেন্টে যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক উপস্থাপন করেন।

উদাহরণস্বরূপ, সরকারের একজন 'অর্থমন্ত্রী' থাকলে, বিরোধী দলের একজন 'ছায়া অর্থমন্ত্রী' থাকেন। সরকারের অর্থমন্ত্রী যখন বাজেট পেশ করেন, ছায়া অর্থমন্ত্রী তখন সেই বাজেটের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন এবং প্রয়োজনে বিকল্প বাজেট প্রস্তাব করেন। একইভাবে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে বিরোধী দলের একজন নির্দিষ্ট সংসদ সদস্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এর মূল দর্শন হলো—'সরকার পরিচালনার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকা' যদি কোনো কারণে বর্তমান সরকার পদত্যাগ করে বা ভেঙে যায়, তবে এই ছায়া মন্ত্রিসভা কালক্ষেপণ না করেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব বুঝে নিতে পারে। এর মূল লক্ষ্য হলো সরকারকে সবসময় চাপে রাখা এবং প্রমাণ করা যে, বিরোধী দল যেকোনো মুহূর্তে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কারিগরি নীতিগতভাবে প্রস্তুত।

 কেন একে 'সংসদীয় গণতন্ত্রের ওয়াচডগ' বলা হয়?

. সরাসরি নজরদারি: প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্দিষ্ট একজন ছায়া মন্ত্রী থাকায় সরকারের কোনো ভুল নজর এড়ানো কঠিন হয়।

. বিকল্প সরকার: এটি জনগণকে বার্তা দেয় যে, বর্তমান সরকার ব্যর্থ হলে দেশ চালানোর জন্য একটি প্রস্তুত বিকল্প দল রয়েছে।

. তথ্যভিত্তিক সমালোচনা: কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়, বরং পলিসি বা নীতিমালার ভিত্তিতে তর্ক করাই এর মূল লক্ষ্য।

গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণে ছায়া মন্ত্রিসভার ভূমিকা:

একটি শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র অচল, আর ছায়া মন্ত্রিসভা সেই বিরোধিতাকে করে তোলে গঠনমূলক সুশৃঙ্খল।

জবাবদিহিতা স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ: সরকারি মন্ত্রীরা যখন জানেন যে তাদের প্রতিটি ফাইলের ওপর বিরোধী দলের একজন বিশেষজ্ঞ নজর রাখছেন, তখন দুর্নীতি বা স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ অনেক কমে যায়। সরকারের মন্ত্রীদের প্রতিটি পদক্ষেপ, বিল বা সিদ্ধান্তের ওপর ছায়া মন্ত্রীরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন। সংসদে যখন কোনো বিল উত্থাপিত হয়, ছায়া মন্ত্রী সেটির দুর্বলতাগুলো তুলে ধরেন। এর ফলে সরকার চাইলেই যা খুশি তাই করতে পারে না। এটি স্বৈরাচারী প্রবণতা রোধে একটি শক্তিশালী ঢাল।

নীতি নির্ধারণে বিকল্প প্রস্তাব: ছায়া মন্ত্রিসভা কেবল সমালোচনাই করে না, তারা 'পলিসি অল্টারনেটিভ' বা বিকল্প নীতিও প্রদান করে। যেমনসরকার হয়তো শিক্ষা খাতে ভ্যাট আরোপ করল। তখন ছায়া শিক্ষামন্ত্রী ব্যাখ্যা করবেন কেন এটি ভুল এবং তারা ক্ষমতায় থাকলে কীভাবে অর্থায়ন করতেন। এতে নাগরিকরা দুটি দলের সক্ষমতা ভিশনের মধ্যে তুলনা করার সুযোগ পান যে, বর্তমান সরকারের চেয়ে বিরোধী দলের পরিকল্পনা ভালো কি না।

ক্ষমতার পালাবদলে স্থিতিশীলতা (Smooth Transition): গণতন্ত্রে ক্ষমতার পালাবদল স্বাভাবিক ঘটনা। যদি বিরোধী দল আগে থেকেই ছায়া মন্ত্রিসভার মাধ্যমে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকে, তবে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর সরকার গঠন করতে এবং কাজ শুরু করতে তাদের কোনো সময় নষ্ট হয় না। তারা 'Ready-to-GO' মোডে থাকে।

ভবিষ্যতের নেতা তৈরি: ছায়া মন্ত্রিসভা হলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য একটি প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র। একজন ছায়া মন্ত্রী যখন বছর ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ছায়া হিসেবে কাজ করেন, তখন তিনি স্বাস্থ্য খাতের খুঁটিনাটি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে তিনি মন্ত্রী হলে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন এবং এটি তাকে দক্ষ মন্ত্রী হিসেবে গড়ে তোলে।

 বিশেষায়িত জ্ঞান দক্ষতা বৃদ্ধি: সাধারণত একজন সংসদ সদস্য সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হন না। কিন্তু যখন কাউকে 'ছায়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী' দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন তিনি ওই খাতের খুঁটিনাটি নিয়ে পড়াশোনা করেন। এর ফলে সংসদে যখন বিতর্ক হয়, তখন তা কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তথ্য উপাত্তভিত্তিক হয়।

 সরকারের ওপর নিরবচ্ছিন্ন চাপ: প্রতিটি সরকারি সিদ্ধান্তের বিপরীতে যখন একজন দক্ষ 'ছায়া মন্ত্রী' প্রশ্ন তোলেন, তখন সরকার হুট করে কোনো জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এটি সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।

বিকল্প নীতি প্রস্তাব: ছায়া মন্ত্রিসভা কেবল সমালোচনা করে না, বরং 'বিকল্প বাজেট' বা 'বিকল্প উন্নয়ন পরিকল্পনা' পেশ করে। এতে নাগরিকরা বুঝতে পারেন যে, বিরোধী দল ক্ষমতায় গেলে দেশ কীভাবে পরিচালিত হবে।

সংসদীয় বিতর্কের মান উন্নয়ন: যখন উভয় পক্ষে নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ ব্যক্তিরা বিতর্ক করেন, তখন সংসদীয় আলোচনা ব্যক্তিগত কাদা ছোঁড়াছুড়ি থেকে বেরিয়ে জাতীয় স্বার্থের আলোচনায় পরিণত হয়।

স্থিতিশীল ক্ষমতা হস্তান্তর: হঠাৎ সরকার পরিবর্তন হলেও নতুন মন্ত্রীদের মন্ত্রণালয় বুঝতে মাসখানেক সময় নষ্ট করতে হয় না, কারণ তারা 'ছায়া মন্ত্রী' হিসেবে আগে থেকেই সব কার্যপ্রণালী জানতেন।

ছায়া মন্ত্রিসভার কিছু সীমাবদ্ধতা:

যদিও ধারণাটি তাত্ত্বিকভাবে চমৎকার, বাস্তবে ছায়া মন্ত্রিসভার কিছু সীমাবদ্ধতা সমালোচনার দিকও রয়েছে:

Resources-এর অভাব: সরকারি মন্ত্রীদের সহায়তার জন্য বিশাল আমলাতন্ত্র (Civil Service) থাকে, কিন্তু ছায়া মন্ত্রীদের গবেষণা বা তথ্যের জন্য নিজস্ব দলের বা ব্যক্তিগত সোর্সের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে অনেক সময় তাদের সমালোচনা তথ্যের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ছোট বিরোধী দলের পক্ষে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে দক্ষ সদস্য নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয় না। এতে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অহেতুক বিরোধিতা (Obstructionism): অনেক সময় ছায়া মন্ত্রীরা সরকারের ভালো উদ্যোগকেও কেবল রাজনৈতিক কারণে বিরোধিতা করেন। একে 'Oppose for the sake of opposition' বলা হয়, যা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে। এতে রাষ্ট্রীয় কাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং সরকারের ভালো উদ্যোগগুলোও রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে আটকে যেতে পারে।

অভ্যন্তরীণ কোন্দল: কে কোন দপ্তরের ছায়া মন্ত্রী হবেন, তা নিয়ে বিরোধী দলের ভেতরে গ্রুপিং বা দ্বন্দ তৈরি হতে পারে।

বিভ্রান্তি সৃষ্টি: অনেক সময় ছায়া মন্ত্রিসভার পলিসি এবং মূল দলের পলিসির মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা যায়, যা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। আবার জাতীয় সংকটের সময় যদি সরকার এবং ছায়া মন্ত্রিসভা সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানের কারণেও সাধারণ জনগণের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

 

ব্যক্তিগত লড়াই: নীতিগত বিতর্কের চেয়ে অনেক সময় এটি সরকারি মন্ত্রী বনাম ছায়া মন্ত্রীর মধ্যে ব্যক্তিগত কাদা ছোঁড়াছুড়ি বা ব্যক্তিগত ইগোর লড়াইয়ে পরিণত হয়, যা সংসদীয় পরিবেশকে নষ্ট করে।

সমান্তরাল প্রশাসন তৈরির ভয়: অনেক ক্ষেত্রে ছায়া মন্ত্রিসভাকে সরকারের ভেতর সরকার বা 'প্যারালাল গভর্নমেন্ট' হিসেবে দেখা হয়, যা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি করতে পারে।

বিশ্ব প্রেক্ষাপট সাফল্য: আন্তর্জাতিক অনুশীলন

বিশ্বের উন্নত গণতন্ত্রগুলোতে ছায়া মন্ত্রিসভা একটি প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতি।

যুক্তরাজ্য (United Kingdom): ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটি মূলত ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি সিস্টেম বা Westminster System থেকে এসেছে। অর্থাৎ ছায়া মন্ত্রিসভার জন্মভূমি হলো ব্রিটেন। সেখানে এটি সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। ব্রিটেনের বিরোধী দলীয় নেতা এবং ছায়া মন্ত্রীরা সরকারি মর্যাদা পান। বিরোধী দলের সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রাষ্ট্র থেকে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়, যাকে 'Short Money' বলা হয়। ব্রিটেনের সংসদীয় ইতিহাসে দেখা গেছে, শক্তিশালী ছায়া মন্ত্রিসভার কারণেই বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি বা নীতিগত ভুল রোধ করা সম্ভব হয়েছে।

কানাডা: এখানে ছায়া মন্ত্রিসভাকে 'Critic' বলা হয়। প্রতিটি দপ্তরের জন্য একজন করে ক্রিটিক থাকেন।

অস্ট্রেলিয়া: অস্ট্রেলিয়ার ছায়া মন্ত্রিসভা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নির্বাচনের আগে তারা তাদের পূর্ণাঙ্গ ছায়া বাজেট পেশ করে। এখানে রাজনীতিতে ছায়া মন্ত্রিসভার বিতর্কগুলো জাতীয় গণমাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রচার করা হয়, যা জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করে।

নিউজিল্যান্ড: নিউজিল্যান্ডের ছোট ছিমছাম শাসনব্যবস্থায় ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী 'ওয়াচডগ' হিসেবে কাজ করে।

এসব দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা এতটাই সফল যে, জনগণ নির্বাচনের আগেই জেনে যায় কোন দল জিতলে কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন। এটি ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও স্বচ্ছতা আনে।

ভারত: কংগ্রেস এবং অন্যান্য দল বিভিন্ন সময় করার চেষ্টা করলেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এটি এখনো পশ্চিমের দেশগুলোর মতো শক্ত নয়। আংশিক সফল।

যেসব দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা সফল, সেসব দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বেশি। সেখানে সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিগুলো (যেমন- পররাষ্ট্রনীতি বা প্রতিরক্ষা) বড় ধরনের ধাক্কা খায় না।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: সম্ভাবনা, সংকট বাস্তবতা

বাংলাদেশের সংবিধানে বা সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধিতে 'ছায়া মন্ত্রিসভা' গঠনের কোনো সুস্পষ্ট বাধা নেই, আবার বাধ্যতামূলক কোনো নির্দেশনাও নেই। তবে স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ছায়া মন্ত্রিসভা আমরা দেখিনি।

 কেন বাংলাদেশে ছায়া মন্ত্রিসভা নেই?

'Winner-takes-all' মানসিকতা: আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিজয়ী দল সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এবং পরাজিত দলকে বা বিরোধী দলকে কোনো স্পেস দিতে চায় না। বিরোধী দলকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা এখানে প্রবল।

সংসদ বর্জন সংস্কৃতি: ছায়া মন্ত্রিসভার মূল কাজ সংসদে বসে সরকারকে জবাবদিহি করা। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, বিরোধী দলগুলো অধিকাংশ সময় সংসদ বর্জন করে রাজপথে আন্দোলন করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

দলীয় গণতন্ত্রের অভাব: রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরেই যেখানে গণতন্ত্রের চর্চা কম, সেখানে মেধার ভিত্তিতে ছায়া মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া কঠিন। জ্যেষ্ঠতা তোষামোদির সংস্কৃতি এখানে বড় বাধা।

প্রাতিষ্ঠানিক অসহিষ্ণুতা: সরকার পক্ষ থেকে বিরোধী দলকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করার নজির খুব কম। তথ্য অধিকার আইন থাকলেও সংবেদনশীল বিষয়ে বিরোধী দলকে তথ্য না দেওয়ার প্রবণতা ছায়া মন্ত্রিসভার কার্যকারিতা নষ্ট করে দিতে পারে।

আর্টিকেল ৭০: সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কথা বলতে পারেন না। এটি ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যদের স্বাধীন মত এবং ব্যক্তিগত সৃজনশীলতা প্রকাশে বড় বাধা।

বাংলাদেশে এর সম্ভাবনা কতটুকু?

বাংলাদেশে ছায়া মন্ত্রিসভা প্রবর্তনের সম্ভাবনা এখন আগের চেয়ে বেশি। এর কারণগুলো হলো:

সংসদকে কার্যকর করা: বাংলাদেশে সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। ছায়া মন্ত্রিসভা থাকলে সংসদীয় বিতর্ক প্রাণবন্ত হবে এবং সাংসদরা কেবল হাজিরা দেওয়ার জন্য সংসদে যাবেন না।

রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন: বাংলাদেশে রাজপথের আন্দোলনের চেয়ে সংসদীয় বিতর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হবে।

নেতৃত্বের বিকাশ: নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। তারা ছাত্র রাজনীতি থেকেই একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রেরণা পাবে।

শিক্ষিত যুবকদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ: তরুণ প্রজন্ম এখন অনেক বেশি তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর এবং তারা গঠনমূলক রাজনীতি দেখতে চায়।

সুশাসনের দাবি: সাধারণ মানুষ এখন কেবল ভোট দিতে চায় না, বরং প্রতিটি পয়সার হিসাব চায়। একটি ছায়া মন্ত্রিসভা এই জনদাবি পূরণে সহায়ক হতে পারে।

উন্নয়ন টেকসই করা: সরকার যে মেগা প্রকল্পগুলো নিচ্ছে, তার কারিগরি আর্থিক স্বচ্ছতা যাচাই করার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ ছায়া মন্ত্রিসভা খুব জরুরি।

 বাংলাদেশে ছায়া মন্ত্রিসভার সফল প্রয়োগের উপায়:

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু রাজনৈতিক দল থিংক-ট্যাংক ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণা নিয়ে আলোচনা করছে। বিএনপি একবার অনানুষ্ঠানিকভাবে ছায়া মন্ত্রিসভার আদলে কিছু কমিটি গঠন করেছিল, তবে তা সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বর্তমান বা ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপটে এটি চালু করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সংসদীয় বিধিতে সংস্কার আনা প্রয়োজন।

যদি বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো একটি 'জাতীয় সনদ' স্বাক্ষর করে যেখানে ছায়া মন্ত্রিসভাকে সাংবিধানিক বা আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হবে, তবে এটি সম্ভব। এক্ষেত্রে বিরোধী দলীয় নেতাকে পর্যাপ্ত জনবল তথ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

শেষ কথা:

আধুনিক গণতন্ত্রে ছায়া মন্ত্রিসভা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি একটি সুস্থ গতিশীল গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিপক্কতার পরিচয়। এটি সরকারকে যেমন সতর্ক রাখে, ভুল পথে যেতে বাধা দেয় তেমনি বিরোধী দলকে গঠনমূলক দায়িত্বশীল করে তোলে। 'সরকার গঠন করলেই সব ক্ষমতার মালিক, আর বিরোধী দলে গেলেই ক্ষমতাহীন'—এই ধারণার পরিবর্তন ঘটাতে ছায়া মন্ত্রিসভার জুড়ি নেই।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল গণতন্ত্রের দেশে, যেখানে দুর্নীতি এবং সুশাসনের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে ছায়া মন্ত্রিসভা 'গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার নতুন দিগন্ত' উন্মোচন করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং দেশপ্রেমের ভিত্তিতে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত (Political Settlement) একটি উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সংসদীয় গণতন্ত্রের এই আধুনিক চর্চা আজ সময়ের দাবি।

No comments

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.