সধীন্দ্রনাথ দত্তের 'অর্কেস্ট্রা' কাব্যের বিষয় ভাবনা বিশ্লেষণ করো/ সধীন্দ্রনাথ দত্তের কবি মানস বিশ্লেষণ করো ।। Romanticism, Feminism in Orchestra
অর্কেস্ট্রা অবলম্বনে কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের রোমান্টিকতা ও নারীভাবনা
"মোদের ক্ষণিক প্রেম স্থান পাবে ক্ষণিকের গানে,
স্থান পাবে, হে ক্ষণিকা, শ্লথনীবি যৌবন তোমার:
বক্ষের যুগল স্বর্গে ক্ষণতরে দিলে অধিকার,
আজি আর ফিরিব না শাশ্বত নিষ্ফল সন্ধানে ।।" [হৈমন্তী]
'অর্কেস্ট্রা' কাব্যগ্রন্থেই প্রথম দেখা গেল আধুনিক প্রেম ও তার বহুস্তর দ্বন্দ্বপীড়িত আত্মা। ক্ষণিক তা প্রেমের অপ্রিয় সত্য সম্বন্ধে জ্ঞান ও স্পষ্ট কথন:
"অসম্ভব, প্রিয়তমে, অসম্ভব শাশ্বত স্মরণ;
অসংগত চির প্রেম, সংবরণ অসাধ্য, অন্যায়; " [মহাসত্য]
কবির প্রেমিকও একদিন চলে যাবে অপরের কাছে কিন্তু সে আজ কারে ভালোবাসে। মর্মান্তিক এ সত্য কবি জানেন, এজন্য কবির মতো দুঃখী আর কেউ নেই। কবির প্রেয়সী তো আধুনিকা; যে পূর্বে ছিল অন্য কারোর প্রেমিক, ভবিষ্যতে সে অপরের হৃদয়াসনে বিরাজ করবে, শুধু মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে সে ও কবি ভরে উঠেছিল ভালোবাসায়-
"ভেবো না, ভেবো না, সখী; স্বপ্নদু:স্থ দীর্ঘ রাত্রি শেষে
বসন্ত অন্তরে তব আরম্ভিবে পুন চকুরালি:
নবীন ফাল্গুনী আসি হানা দিবে রুদ্ধ দ্বারদেশে;
ফলিবে মানসক্ষেত্রে বর্ষে বর্ষে সোনার চৈতালি।।
ক্ষণিক ইন্দ্রত্ব লভি অনায়াস তপস্যার ফলে,
তোমার উরসস্বর্গে বিরজিবে বহু মর্ত্যচর।
'অর্কেস্ট্রা' কাব্যের সঞ্চয়, সর্বনাশ কবিতায় ব্যক্ত প্রিয়তমার অতীতের কথা; ভবিতর্ব , শাশ্বতী ইত্যাদিতে তার ভবিষ্যতের চিত্র। কবির কাছে অতীত অন্ধকার, ভবিষ্যৎ মৃত। তার অর্কেস্ট্রা কাব্যে প্রেমের বহুস্তর মনোভাবের ফলেই প্রিয়াকে কবির কখনো মনে হয় ছলনাময়ী, কখনো প্রলুদ্ধ ছায়াময়ী, কবি প্রেমিকার অতীত ও ভবিষ্যৎ জীবন কোনটাই কবির পক্ষে সুখের নয়, আবার একমাত্র বর্তমানও অপাপবিদ্ধ নয়;
"জানি অলজ্জিত রাতে, শ্লথনীবি কম্প্র আত্মদানে,
দেয়নি সে মোরে অর্ঘ্য, খুঁজেছিল বসন্তসখাকে।।" [জিজ্ঞাসা]
অর্কেস্ট্রা স্মৃতির ভেতর বর্তমানও অকপট ভালোবাস ভরা নয়। এ মর্মান্তিক সত্যকে যিনি জানেন তিনি দার্শনিক বটে; কিন্তু তার পক্ষে শান্তি দুরাশারই নামান্তর।
অর্কেস্ট্রা কাব্যটি সুধীন্দ্রনাথের বহুলাঙ্গে পরিণত কাব্য। অর্কেস্ট্রা কাব্যের মূলসূর বা বিষয়-ভাবনা হচ্ছে অর্কেস্ট্রা প্রেম-বিরহের কাব্য। এ কাব্যে কবি নারীর প্রেমে পড়েছেন। প্রেমের দ্বিধারহিত আনন্দ কবি একেবারে পাননি তা নয়; মূর্তিপূজা, পূনর্জন্ম, অনুষঙ্গ, মহাশ্বেতা ইত্যাদি কবিতায় তা মূর্তমান। তার ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ ফসল শাশ্বতী কবিতা:
"সে ভুলে ভুলুক, কোটি মম্বন্তরে
আমি ভুলিব না, আমি কভু ভুলিব না।"
কবির অর্কেস্ট্রা কাব্যের বিষয়-ভাবনা উল্লেখ করলে বলা চলে প্রেমের বিজয়স্তম্ভ আকাশ স্পর্শ করেছে। এককথায় কবিতাটি অনির্বচনীয়। এট বাংলা সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ কবিতা।
সুধীন্দ্রনাথের কবিদৃষ্টির রঞ্জনরশ্মি এক নিরুত্তর সত্যের মর্মে গিয়ে বিঁধে। তবু বর্তমানতায় মগ্ন ক্ষণিককে উদ্দেশ্য করে বলেন-
"চাই। চাই, আজও চাই তোমারে কেবলই
আজও বলি,
জনশূন্যতার কানে রুদ্ধ কন্ঠে বলি, আজও বলি-
অভাবে তোমার
অসহস্য অধুনা মোর, ভবিস্যৎ বদ্ধ অন্ধকার,
কাম্য শুধু স্থবির মরণ।
.....................
আমার জাগর স্বপ্নালোকে
একমাত্র সত্ত্বা তুমি, সত্য শুধু তোমারই স্মরণ।" [নাম]
অর্কেস্ট্রা আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কাবিতা। এ কাব্যে রোমান্টিক অবজ্ঞার অন্তরালে রোমান্টিক আকর্ষণই প্রকাশিত।
"একটি কথার দ্বিধাথরথর চূড়ে
ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী;
একটি নিমেষ দাঁড়াল সরণী জুড়ে,
থামিল কালের চিরচঞ্চল গতি;" [শাশ্বতী]
সুধীন্দ্রনাথ দত্তের যেসব কবিতায় দার্শনিক চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- হৈমন্তী, অনুষঙ্গ, মহাশ্বেতা, মহাসত্য, চপলা, কস্মৈ দেবায়, অর্কেস্ট্রা, ধিক্কার, সর্বনাশ ও বিস্মরণী- তার দার্শনিক চিন্তার পরিচয়। যেমন-
"মৃত্যুর পাথেয় দিতে কানা কড়ি মিলিবে না যবে,
রূপান্ধ যুবার ভ্রান্তি সেই দিন মহাসত্য হবে।" [মহাসত্য]
উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় "অর্কেস্ট্রা" কাব্যের মূল বা বিষয় ভাবনা হচ্ছে প্রেম-প্রকৃতি, নৈরাশ্য, ঐতিহ্য, মৃত্যু চেতনা, ঈশ্বরভাবনা ও দার্শনিক চিন্তার বহি:প্রকাশ।


No comments