ads

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গোরা': রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক মহাকাব্যিক আখ্যান

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ উপন্যাসে রাজনীতি ছাড়া আর কোন কোন বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) 'গোরা' (১৯১০) কেবল একটি রাজনৈতিক উপন্যাস নয়, বরং এটি তৎকালীন ভারতবর্ষের ধর্মীয়, সামাজিক এবং দার্শনিক সংকটের এক বিশাল মহাকাব্যিক দলিল। এই উপন্যাসে রাজনীতি একটি প্রধান চালিকাশক্তি হলেও এর সমান্তরালে ধর্মীয় আদর্শের দ্বন্দ্ব, সমাজ সংস্কার, নারীমুক্তি, আত্মপরিচয়ের সংকট এবং বিশ্বমানবতাবোধের মতো অত্যন্ত গভীর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে।


ধর্মীয় আদর্শ ব্রাহ্ম-হিন্দু সমাজের দ্বন্দ্ব:

উপন্যাসের অন্যতম প্রধান উপজীব্য হলো উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের প্রচলিত ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলন এবং সনাতন হিন্দুধর্মের পুনরুত্থানবাদী চেতনার মধ্যে সংঘাত। গোরার চরিত্রে হিন্দুধর্মের শাস্ত্রীয় আচার-নিষ্ঠা এবং রক্ষণশীলতাকে অত্যন্ত তীব্রভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সে মনে করত, ভারতবর্ষের প্রকৃত শক্তি তার প্রাচীন ঐতিহ্য আচারের মধ্যে নিহিত অন্যদিকে, পরেশবাবুর চরিত্রের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্মসমাজের উদারপন্থী আধ্যাত্মিক রূপটি তুলে ধরেছেন। উপন্যাসে হারানবাবুর মতো সংকীর্ণমনা ব্রাহ্ম এবং গোরার মতো উগ্র হিন্দুত্ববাদীর তর্কের মধ্য দিয়ে ধর্মের বাহ্যিক আচার অন্তরের সত্যের লড়াইটি স্পষ্ট হয়েছে। শেষ পর্যন্ত গোরা বুঝতে পারে যে, প্রকৃত ধর্ম কোনো সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মানুষের কল্যাণে নিহিত।

জাতিভেদ প্রথা অস্পৃশ্যতা:

'গোরা' উপন্যাসে জাতিভেদ প্রথা অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের তীব্র সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে। গোরা শুরুতে জাত-পাতের কড়াকড়িকে দেশের সংহতির জন্য প্রয়োজনীয় মনে করলেও, তার পল্লী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাকে এক নতুন সত্যের মুখোমুখি করে। সে দেখেছে কীভাবে ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষ মানুষকে ঘৃণা করে এবং অস্পৃশ্যতার দোহাই দিয়ে সামাজিক ঐক্য নষ্ট করা হয়। বিশেষ করে লছমিয়া নামে এক নিম্নবর্ণের খ্রিস্টান নারীর হাতে গোরার লালন-পালন হওয়া এবং উপন্যাসের শেষে গোরার নিজের জন্মপরিচয় জানার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ জাত-পাতের কৃত্রিমতাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন।

নারীমুক্তি নারীর সামাজিক অবস্থান:

'গোরা' উপন্যাসে নারীমুক্তির বিষয়টি অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলোবিশেষ করে আনন্দময়ী, সুচরিতা এবং ললিতাপ্রত্যেকেই নারী স্বাধীনতার ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার প্রতীক।

আনন্দময়ী: তিনি উপন্যাসের সবচেয়ে সংস্কারমুক্ত নারী চরিত্র। তিনি তাঁর সামাজিক ধর্মীয় সংস্কার ত্যাগ করে আইরিশ শিশু গোরাকে আপন করে নিয়েছেন। তিনি কোনো বিশেষ ধর্মের গণ্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে 'মা' হিসেবে বিশ্বজনীন হয়ে উঠেছেন।

ললিতা: সে তেজস্বিনী এবং স্বাধীনচেতা নারীর প্রতীক। সামাজিক লোকলজ্জা উপেক্ষা করে বিনয়ের সাথে স্টীমারে করে ফিরে আসা এবং ম্যাজিস্ট্রেটের বাড়ির অনুষ্ঠান বর্জন করার মাধ্যমে সে সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।

সুচরিতা: সুচরিতা শিক্ষিত রুচিশীল তরুণী, যে পরেশবাবুর আদর্শে বড় হয়েছে। সে গোরার আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হলেও নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে সত্যকে গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে।

 আত্মপরিচয়ের সংকট বিশ্বমানবতা:

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় মোড় ঘোরে গোরার জন্মপরিচয় প্রকাশের মাধ্যমে। গোরা সারা জীবন যাকে নিজের ধর্ম পরিচয় বলে আঁকড়ে ধরেছিল, শেষে সে জানতে পারে সে আসলে একজন আইরিশ দম্পতির সন্তান। এই সত্য তাকে এক গভীর সংকটে ফেললেও শেষ পর্যন্ত তা তাকে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ থেকে বিশ্বমানবতাবোধে উত্তরণ ঘটায়। সে অনুভব করে, সে কোনো বিশেষ জাত বা ধর্মের নয়, সে একজন 'ভারতবর্ষীয়', যার কাছে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান সবারই সমান অধিকার। এটি কেবল গোরার রূপান্তর নয়, বরং রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব দার্শনিক উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ।

পল্লী জীবনের বাস্তবতা সামাজিক অধিকার:

গোরা উপন্যাসে তৎকালীন বাংলার গ্রামীণ জীবন কৃষকদের ওপর অত্যাচারের চিত্র নিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে। গোরা যখন গ্রামে যায়, সে তখন নীলকর সাহেবদের অত্যাচার এবং পুলিশের অবিচার স্বচক্ষে দেখে। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে সে রুখে দাঁড়ায় এবং এর ফলে তাকে কারাবরণও করতে হয়। গ্রামের সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং তাদের ওপর ব্রিটিশ শাসনের স্টিমরোলার কীভাবে চলছে, তা গোরার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়েছে।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বন্ধুত্বের রসায়ন:

গোরা বিনয়ের বন্ধুত্ব উপন্যাসের এক অনন্য দিক। গোরার প্রবল ব্যক্তিত্বের ছায়াতলে থেকেও বিনয় কীভাবে ধীরে ধীরে নিজের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য স্বাধীন চিন্তা গড়ে তোলে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনয়ের এই বিবর্তন মূলত অন্ধ আনুগত্য থেকে যুক্তিবাদী চিন্তায় উত্তরণের গল্প। বন্ধুত্বের খাতিরে বিনয় গোরার অনেক গোঁড়ামি সহ্য করলেও শেষ পর্যন্ত সে নিজের ভালোবাসার মানুষের (ললিতা) মযাদা রক্ষায় অটল থাকে।

আদর্শগত শিক্ষা মেধার বিকাশ:

উপন্যাসে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রাচ্য সংস্কৃতির মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং মিলনের বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে। পরেশবাবু তাঁর সন্তানদের যেভাবে উদার শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন এবং সুচরিতা-ললিতার যে বৌদ্ধিক বিকাশ দেখানো হয়েছে, তা তৎকালীন সমাজের তুলনায় অত্যন্ত অগ্রসর ছিল। রবীন্দ্রনাথ এখানে দেখাতে চেয়েছেন যে, প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি দেয়।

উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায়, 'গোরা' উপন্যাসটি রাজনীতি ছাপিয়েও একটি বিশাল সামাজিক দার্শনিক ক্যানভাস। এটি যেমন একদিকে ধর্মের নামে ভণ্ডামি আচারের বিরোধিতা করে, তেমনি অন্যদিকে মানুষের অন্তরের সত্য মানবিক অধিকারকে বড় করে দেখায়। আনন্দময়ীর মাতৃত্ব, পরেশবাবুর উদারতা, ললিতার সাহস এবং গোরার রূপান্তরের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ এমন এক মঙ্গলময় পৃথিবীর স্বপ্ন দেখিয়েছেন, যেখানে কোনো ধর্মের প্রাচীর নেই, যেখানে মানুষই বড় সত্য। এই উপন্যাসে আলোচিত প্রতিটি বিষয়ই ভারতবর্ষের সমাজ কাঠামোকে গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে।

S M A Hanif

BA (Hon's) Bangla, MA

Banglsdesh Open Univesity

 

No comments

Theme images by Maliketh. Powered by Blogger.